রাজনৈতিক বন্দোবস্ত না থাকলে শিল্পনীতি কাজ করে না: মুশতাক খান

বেঙ্গল ডেল্টা কনফারেন্সে ‘ইনহ্যানসিং প্রোডাক্টিভিটি, কম্পিটিটিভনেস অ্যান্ড ট্রেড ফর জবস’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় বক্তব্য দেন যুক্তরাজ্যের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক মুশতাক খান। ঢাকা, ২৪ জুলাই ২০২৬ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা হলো কর্মসংস্থান। সে সমস্যা সমাধানে উচ্চ উৎপাদনশীল শিল্পায়ন প্রয়োজন। শিল্পায়নের বিকাশে দরকার শিল্পনীতি। কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশে শিল্পনীতি যেসব সুযোগ তৈরি করে, সেটির অপচয় হয় রাজনৈতিক বন্দোবস্ত না থাকার কারণে। যেসব দেশে রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ছিল না, সেখানে এ শিল্পনীতি কাজ করেনি।

আজ শুক্রবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত বেঙ্গল ডেল্টা কনফারেন্সের প্রথম দিন ‘ইনহ্যানসিং প্রোডাক্টিভিটি, কম্পিটিটিভনেস অ্যান্ড ট্রেড ফর জবস’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় এ কথা বলেন যুক্তরাজ্যের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক মুশতাক খান। ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিকস নামের একটি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলন আয়োজন করে।

অধ্যাপক মুশতাক বলেন, ‘আমাদের লাখ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের প্রধান সমস্যাও এটি—বেকারত্ব। সাধারণত ধারণা করা হয়, উৎপাদনশীলতা কেবল যন্ত্রপাতি এবং শ্রমিকের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু একই যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেও যুক্তরাষ্ট্র ভারতের তুলনায় ছয়-সাত গুণ বেশি সুতা উৎপাদন করে থাকে। এই বিশাল পার্থক্যের মূল কারণ হলো ‘অর্গানাইজেশনাল ক্যাপাবিলিটি’ বা সাংগঠনিক সক্ষমতা।

অর্থনীতির এই অধ্যাপক বলেন, কারখানার নকশা, গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ, পণ্য ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহব্যবস্থা ঠিক না থাকলে সামান্য কারণে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা উৎপাদনশীলতাকে ধসিয়ে দেয়। শুধু ডিগ্রি অর্জন করে এসব সংকট মোকাবিলা করা যায় না, এগুলো করতে করতে শিখতে হয়।

ঠিক এখানে সরকারের শিল্পনীতির প্রয়োজন হয় বলে জানান অধ্যাপক মুশতাক। তিনি বলেন, শিল্পনীতি অধিকাংশ দেশে ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণ হলো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের অভাব। শিল্পনীতির মাধ্যমে যখন কোনো উদ্যোক্তাকে ভর্তুকি, কম সুদে ঋণ বা জমি দেওয়া হয়, তখন তার সঙ্গে একটি শর্ত থাকে যে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

দক্ষিণ কোরিয়ার উদাহরণ দিয়ে অর্থনীতির এই অধ্যাপক বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে যদি কোনো উদ্যোক্তা লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হতো, তবে রাষ্ট্র তার ফ্যাক্টরি কেড়ে নিয়ে অন্য দক্ষ উদ্যোক্তাকে দিয়ে দিত। এই বাধ্যবাধকতা না থাকলে উদ্যোক্তারা উৎপাদনশীলতা বাড়ায় না।

বাংলাদেশের মতো দেশে রাষ্ট্র দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্যোক্তাদের ওপর এমন কোনো ‘ক্রেডিবল থ্রেট’ বা বিশ্বাসযোগ্য হুমকি কাজ করে না জানিয়ে অধ্যাপক মুশতাক বলেন, ফলে উদ্যোক্তারা ভর্তুকি বা ঋণ নিলেও তা ফেরত দেয় না বা উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর কোনো তাগিদ অনুভব করে না।

পরামর্শ দিয়ে অর্থনীতির এই অধ্যাপক বলেন, এ ক্ষেত্রে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়কার পোশাকশিল্পের মতো মডেল অনুসরণ করা উচিত, যেখানে কোনো সরাসরি ভর্তুকি ছাড়াই বিদেশি অংশীদারত্বের মাধ্যমে দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা হয়েছিল।

প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। ঢাকা, ২৪ জুলাই ২০২৬
ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

‘সমতাভিত্তিক আঞ্চলিক উন্নয়ন’

প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘আমাদের একটা দার্শনিক ভিত্তি আছে—সবার আগে বাংলাদেশ, সবাইকে নিয়ে বাংলাদেশ এবং সবার জন্য বাংলাদেশ। তার সাথে সাথে একটা ভিশন (রূপকল্প) আছে, সেটা হচ্ছে গণতান্ত্রিক মানবিক কল্যাণ রাষ্ট্র। এর সাথে একটা লক্ষ্য আছে, ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন (এক লাখ কোটি) ডলারের অর্থনীতি গড়া।’

রাশেদ তিতুমীর বলেন, ‘আমরা একটা ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছি, যার সামষ্টিক অর্থনীতির কোনো ভারসাম্য নেই, বিনিয়োগ যেকোনো সময়ের থেকে সর্বনিম্ন এবং যার রাজস্ব যেকোনো দেশের তুলনায় সবচেয়ে তলানিতে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ হবে কি না, এটাই হচ্ছে মৌলিক প্রশ্ন। জাতি যে আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন করেছে, সেখান থেকে উত্তরণ ঘটানোই আমাদের কাজ।’

বাংলাদেশে কখনো সমতাভিত্তিক আঞ্চলিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা হয়নি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার কোনো রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে সমতাভিত্তিক আঞ্চলিক উন্নয়ন বিষয়টি আলাদা বিষয় হিসেবে পাবেন না। এ ধরনের উন্নয়নে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়।

উত্তরাঞ্চলের উদাহরণ দিয়ে রাশেদ তিতুমীর বলেন, উত্তরাঞ্চলে পাঁচটি ক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত আছে—ফসলে, ফলে, ফুলে, প্রাকৃতিক সম্পদ ও দুগ্ধজাত পণ্যে। ওই অঞ্চলে অনেকগুলো শিল্পকারখানা আছে, যেগুলো বন্ধ অবস্থায় আছে। উত্তরাঞ্চলের ওই পাঁচটি উদ্বৃত্ত বিষয় থেকে কীভাবে মূল্য সংযোজন ঘটানো যায়, সেটিই লক্ষ্য।

পাঁচটি রাষ্ট্রীয় করপোরেশনের জায়গা কোথায় কোথায় আছে, সেটার খোঁজ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, উদ্দেশ্য ওই বন্ধ কারখানাগুলোর জায়গায় যাতে নতুন কারখানা স্থাপন হয় এবং কর্মসংস্থান তৈরি হয়। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চলের শিল্পমালিকদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী কয়েকবার বৈঠক করেছেন।

যোগাযোগব্যবস্থা দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করে রাশেদ তিতুমীর বলেন, ‘আমাদের কানেক্টিভিটি বা যোগাযোগ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের রেলপথের কিছু অংশ ব্রডগেজ এবং কিছু অংশ মিটারগেজ। আমাদের এটাকে ডুয়েল গেজ করতে হবে এবং সেটা পঞ্চগড় থেকে ঢাকা হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে।’

এই রেল সংযোগকে মোংলার (মোংলা বন্দর) সঙ্গেও যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, রেলের পাশাপাশি এক্সপ্রেসওয়ে করতে হবে এবং সেগুলোকে শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী চীনে গিয়ে বলেছেন, ‘আমরা ১৮ মাসের মধ্যে এক্সপোর্ট জোনে (রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল) উৎপাদন দেখতে চাই।’

রাশেদ তিতুমীর আরও বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে আর্থিক ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। মূল্যস্ফীতি থাকা সত্ত্বেও আমরা সুদের হার ৭ শতাংশের মধ্যে রাখার চেষ্টা করছি। এ ছাড়া জ্বালানির স্বনির্ভরতা তৈরিতে বাপেক্সকে (রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড) তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে রিগ কেনার জন্য অর্থায়ন করা হয়েছে।’

প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ইয়ুথ লিডার্স অ্যালায়েন্সের সভাপতি আবরার হোসেন সায়েম বলেন, ‘আমাদের শিল্প উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনা দরকার। গার্মেন্ট সেক্টর এখন পর্যন্ত আমাদের আয়ের প্রধান খাত।’

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নীত হলে পরিস্থিতি একই রকম থাকবে না জানিয়ে আবরার হোসেন বলেন, ‘শিল্পকারখানায় যে ধরনের কাজের চাহিদা, আমাদের কারিগরি প্রশিক্ষণে তার ঘাটতি আছে। দক্ষ শ্রমিক পেতে হলে আমাদের সেটা কাটিয়ে উঠতে হবে।’

সামষ্টিক অর্থনীতিবদ জ্যোতি রহমান সরাসরি ভর্তুকি ছাড়া অন্য কীভাবে শিল্পোদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করা যায়, সেটি খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

প্যানেল আলোচনাটি পরিচালনা করেন ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিকসের গবেষণা পরিচালক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান।