কত দামে বাংলাদেশে বিক্রি করেছিল উড়োজাহাজ, প্রকাশ করল না ব্রিটিশ সরকার

লকহিড মার্টিনের তৈরি সি–১৩০ মডেলের এই হারকিউলিস উড়োজাহাজ ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্য থেকে কিনেছে তুরস্ক। বাংলাদেশও একই উড়োজাহাজ কিনেছিল।ফাইল ছবি: রয়টার্স

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর কাছে কত দামে ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ারফোর্সের (আরএএফ) পাঁচটি সি-১৩০ জে সুপার হারকিউলিস সামরিক পরিবহন বিক্রি করেছিল, তা জানাতে নারাজ যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় (এমওডি)।

যুক্তরাজ্যের তথ্য অধিকার আইনে (ফ্রিডম অব ইনফরমেশন অ্যাক্ট) প্রথম আলোর লন্ডন প্রতিনিধির করা আবেদনের জবাবে তারা এর পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছে, আর্থিক বিবরণ প্রকাশ করলে ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যুক্তরাজ্যের বাণিজ্যিক অবস্থান দুর্বল হতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট শিল্প অংশীদারের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তবে কী কী উড়োজাহাজ বাংলাদেশের কাছে বিক্রি করা হয়েছে, সে বিষয়ে তথ্য দিয়েছে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা দপ্তর।

১৮ থেকে ২০ বছর ব্রিটিশ বিমানবাহিনীকে সেবা দেওয়া সামরিক পরিবহন উড়োজাহাজ পাঁচটি বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হয় ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে। তখন বাংলাদেশে ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ সরকার, যারা ২০২৪ সালে ছাত্র–গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হয়।

যুক্তরাজ্য নতুন প্রজন্মের এয়ারবাস এ-৪০০এম অ্যাটলাস পরিবহন বিমান ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ারফোর্সের বহরে অন্তর্ভুক্ত করা শুরু করলে যুক্তরাষ্ট্রের লকহিড মার্টিন কোম্পানির নির্মিত পুরোনো হারকিউলিস উড়োজাহাজগুলো সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে হারকিউলিস উড়োজাহাজগুলো ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে আরএএফের সক্রিয় বহর থেকে প্রত্যাহার করা হয় এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশের কাছে পাঁচটি বিক্রি করা হয় বলে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। আবেদনের জবাবে তারা জানিয়েছে, পাঁচটি উড়োজাহাজের মধ্যে দুটি ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে, একটি ২০১৯ সালের জুনে এবং বাকি দুটি ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশকে হস্তান্তর করা হয়।

উড়োজাহাজগুলোর পূর্ণ আরএএফ সিরিয়াল নম্বরও প্রকাশ করেছে প্রতিরক্ষা দপ্তর। সেগুলো হলো: জেডএইচ-৮৮১, জেডএইচ-৮৮২, জেডএইচ-৮৮৩, জেডএইচ-৮৮৪ এবং জেডএইচ-৮৮৭। উড়োজাহাজগুলো ১৯৯৯ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে রয়্যাল এয়ারফোর্সের বহরে যুক্ত হয়েছিল এবং ১৮ থেকে ২০ বছর ব্রিটিশ বিমানবাহিনীকে সেবা দেয়।

বিক্রির অঙ্কের তথ্য প্রকাশে অপারগতা প্রকাশ করে প্রতিরক্ষা দপ্তর বলেছে, এই চুক্তির আর্থিক মূল্য ও খরচের বিস্তারিত প্রকাশ করলে তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যুক্তরাজ্যের বাণিজ্যিক অবস্থান দুর্বল হতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট শিল্প অংশীদারের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তা ছাড়া এই তথ্যগুলো তথ্য অধিকার আইনের ধারা ৪৩ (২) অর্থাৎ ‘বাণিজ্যিক স্বার্থ’ ধারার আওতায় অব্যাহতিপ্রাপ্ত।

প্রতিরক্ষা দপ্তর আরও বলেছে, ঠিকাদারদের জমা দেওয়া দরপত্র প্রস্তাবের কিছু নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করলে ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতায় অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীরা অন্যায্য সুবিধা পেতে পারে। দীর্ঘদিনের নীতিমালা অনুযায়ী এ ধরনের দরপত্রসংক্রান্ত নথি প্রকাশ করা হয় না।

এর কেনাবেচার বিষয়ে ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্সে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেছিলেন এই প্রতিবেদক। এরপর ৪ নভেম্বর জবাব দেন হাউস অব কমন্স ইনফরমেশন কমপ্লায়েন্স সার্ভিসের ইনফরমেশন রাইটস অফিসার থমাস স্পেন্সার। তিনি বলেন, হাউস অব কমন্সের কাছে এসব তথ্য সংরক্ষিত নেই এবং বিষয়টি মূলত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন।

এরপর প্রতিরক্ষা দপ্তরে আবেদন করা হলে জবাব দেয় মন্ত্রণালয়ের ডিফেন্স ইকুইপমেন্ট অ্যান্ড সাপোর্ট বিভাগের এনএডিজি পলিসি সেক্রেটারিয়েট। তাতেই বলা হয়, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর কাছে বিক্রি করা পাঁচটি উড়োজাহাজের চুক্তিমূল্য, বিক্রয়মূল্য, সংস্কার ব্যয়, প্রশিক্ষণ প্যাকেজ, খুচরা যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তা ও অন্যান্য ব্যয়ের বিস্তারিত তথ্য তাদের কাছে রয়েছে, তবে তা প্রকাশ করা হবে না।

বিক্রয়মূল্য গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ‘জনস্বার্থ পরীক্ষা’ চালানো হয়েছে জানিয়ে চিঠিতে বলা হয়, সেখানে জনস্বার্থে স্বচ্ছতার বিষয়টি স্বীকার করলেও শেষ পর্যন্ত মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা করাই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

চুক্তিতে ইউকে এক্সপোর্ট ফাইন্যান্স (ইউকেইএফ) বা অন্য কোনো সরকারি রপ্তানি সহায়তা ব্যবস্থার সম্পৃক্ততা ছিল কি না—সেই বিষয়ে বলা হয়েছে, তাদের কাছে এ–সংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই।

বাংলাদেশ বিমানবাহিনী সুপার হারকিউলিস উড়োজাহাজগুলো সংগ্রহ করে নিজেদের পরিবহন সক্ষমতা বাড়িয়েছে। কেনার সময় যুক্তরাজ্যের মার্শাল এরোস্পেসের মাধ্যমে এগুলোর সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা হয়।

যুক্তরাজ্য সরকারের তরফে তথ্য পাওয়া না গেলেও বিশ্লেষকদের ধারণা, এ ধরনের সংস্কারকৃত সি-১৩০জে উড়োজাহাজের প্রতিটির দাম হতে পারে আড়াই থেকে সাড়ে তিন কোটি ডলারের মধ্যে।

২০২৫ সালে তুরস্কও যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ার ফোর্স থেকে একই মডেলের হারকিউলিস উড়োজাহাজ কিনেছে। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তুরস্ক মোট ১২টি সাবেক আরএএফ সি-১৩০জে-৩০ উড়োজাহাজ কিনেছে। ‘দ্য অ্যাভিয়েশনিস্ট’-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ১২টি বিমানের হস্তান্তর, কাঠামোগত উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা হস্তান্তর এবং দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা ব্যবস্থাসহ পুরো কর্মসূচির জন্য তুরস্কের ব্যয় হতে পারে প্রায় ৭৪ কোটি মার্কিন ডলার।