ব্র্যাক ব্যাংকের ‘ডিজিটাল অনবোর্ডিং’ সাড়া ফেলেছে এসএমই ব্যাংকিংয়ে
ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের (এসএমই) অ্যাকাউন্ট খোলা সহজ করতে ব্র্যাক ব্যাংকের ‘ডিজিটাল অনবোর্ডিং’ গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে প্রথমবারের মতো চালু হওয়া এই প্রক্রিয়ার কল্যাণে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারছেন এসএমই উদ্যোক্তারা। ফলে এসএমই গ্রাহকেরা খুব সহজে ও দ্রুত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আসতে পারছেন। যা তাঁদের ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে লেনদেন করতে আরও উৎসাহিত করবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ব্যাংকটি জানিয়েছে, এসএমই ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্ট খোলা সহজ করতে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘পাইলট প্রজেক্ট’ হিসেবে ডিজিটাল অনবোর্ডিং চালু হয়েছিল। যার মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যেই ৫০ হাজার এসএমই অ্যাকাউন্ট খোলার মাইলফলক স্পর্শ করেছে ব্র্যাক ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক অ্যাকাউন্ট খোলার নীতিমালা মেনেই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সমন্বয়ে প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে এসএমই অ্যাকাউন্ট খোলার এই প্রক্রিয়া ব্র্যাক ব্যাংকের এসএমই সেবাকে আরও গতিশীল করেছে। এটি গ্রাহক সন্তুষ্টি অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
আর্টিস্টিক স্টুডিও অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনের প্রতিষ্ঠাতা ও কর্ণধার সৈয়দ আবু রাসেল সম্প্রতি ব্র্যাক ব্যাংকে তাঁর ব্যবসার জন্য এসএমই অ্যাকাউন্ট খুলেছেন। অ্যাকাউন্ট খোলাসহ যেকোনো সেবায় ব্র্যাক ব্যাংকের কর্মকর্তারা দ্রুততম সময়ে সহায়তা করেছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। আবু রাসেল বলেন, ‘আমি আগেও অন্য ব্যাংকে ব্যবসার জন্য এসএমই অ্যাকাউন্ট খুলেছি। সেসব অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে আমার বেশ কয়েক দিন সময় লেগেছে। তবে ব্র্যাক ব্যাংকের ডিজিটাল অনবোর্ডিংয়ের মাধ্যমে আমার নতুন এসএমই অ্যাকাউন্ট খুলতে সময় লেগেছে এক ঘণ্টারও কম, যা আগে ভাবতেও পারিনি। এই সময়ের মধ্যেই নতুন অ্যাকাউন্টের নম্বর পাওয়াসহ লেনদেন শুরু করার প্রক্রিয়ায় যেতে পেরেছি। এ ছাড়া “আস্থা” অ্যাপের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করাও অনেক সহজ। ফলে ব্যবসায়িক কাজে ব্যাংকিং–সংক্রান্ত চাপ অনেক কমে গেছে।’
ব্র্যাক ব্যাংকের অ্যাডিশনাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর অ্যান্ড হেড অব এসএমই ব্যাংকিং সৈয়দ আবদুল মোমেন বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই এসএমই খাতের নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার প্রক্রিয়া ডিজিটাল করার চেষ্টা করছিলাম। কারণ, আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, গ্রাহক পর্যায়ে জটিলতা ও পরিশ্রম যত কমানো যায়, গ্রাহক সন্তুষ্টি তত বাড়ে। সেই চিন্তা থেকেই আমরা এসএমই অ্যাকাউন্ট খোলায় উদ্ভাবনের মাধ্যমে “ডিজিটাল অনবোর্ডিং” সেবা নিয়ে এসেছি।’
সৈয়দ আবদুল মোমেন আরও বলেন, ‘নতুন এই প্রক্রিয়া চালু করায় আমরা একজন গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট খুলেই প্রায় সঙ্গে সঙ্গে অ্যাকাউন্ট নম্বর দিয়ে দিতে পেরেছি। এই অ্যাকাউন্টের চেকবই ও ডেবিট কার্ড দেওয়াসহ সব কাজ সম্পন্ন করতে সময় লাগছে সর্বোচ্চ তিন কার্যদিবস। প্রচলিত পদ্ধতিতে এসএমই গ্রাহকদের এই সেবা দিতে কমপক্ষে সাত থেকে আট দিন প্রয়োজন হতো। অর্থাৎ গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট খুলতে এখন আগের চেয়ে অর্ধেকের কম সময় লাগছে। ফলে ডিজিটাল অনবোর্ডিং চালু হওয়ার পর গ্রাহক সন্তুষ্টিও বেড়েছে। একই সঙ্গে কাগজের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশ সংরক্ষণেও ভূমিকা রাখছে এই নতুন পদ্ধতি।’
ব্র্যাক ব্যাংক সূত্রে জানানো হয়, বর্তমানে প্রায় আড়াই লাখ এসএমই গ্রাহককে সেবা দিচ্ছে ব্যাংকটি। ২০২৫ সাল শেষে এসব গ্রাহককে দেওয়া লোনের পোর্টফোলিও আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। তবে এত ঋণ বিতরণের পরও এসএমই খাতে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ মাত্র ২ শতাংশ, যা দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন।
এ ছাড়া একই সময় শেষে ব্র্যাক ব্যাংকে এসএমই গ্রাহকদের আমানতের পরিমাণ প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা। গত এক বছরে এই আমানতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২২ শতাংশ, যা দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
ব্র্যাক ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর অ্যান্ড সিইও তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, ‘আমাদের ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদের দেখানো পথ অনুসরণ করে আমরা শুরু থেকেই দেশের এসএমই খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আসছি। সেই ধারাবাহিকতায় এসএমই উদ্যোক্তাদের উন্নত ব্যাংকিং সেবা দিতে আমরা ডিজিটাল অনবোর্ডিং চালু করেছি। এটি চালুর পর আমাদের গ্রাহকদের সন্তুষ্টি বাড়ার পাশাপাশি আমরা এসএমই ব্যাংকিং কর্মীদের উৎপাদনশীলতা ও কর্মদক্ষতা বাড়াতে সক্ষম হয়েছি। ফলে আমাদের পরিচালন ব্যয় আগের তুলনায় কমে এসেছে।’
তারেক রেফাত উল্লাহ খান আরও বলেন, ‘এখনো দেশের এসএমই উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশ ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে রয়ে গেছে। অথচ তারাই আমাদের দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি। আমাদের লক্ষ্য, ডিজিটাল অনবোর্ডিংয়ের মাধ্যমে আগামী এক বছরের মধ্যে এক লাখ এসএমই উদ্যোক্তাকে ব্যাংকিং চ্যানেলে নিয়ে আসা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করা।’