নদীর দখল-দূষণে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

কারখানার রাসায়নিক মিশ্রিত পদার্থে নদীর পানির রং বদলে গেছে। গতকাল দুপুরে রাজধানীর ডেমরাসংলগ্ন শীতলক্ষ্যা নদীতেছবি: সাজিদ হোসেন

ধলেশ্বরী নদীর তীরে চরকুন্দনিয়া গ্রাম। রাজধানী ঢাকা থেকে মহাসড়ক ধরে পদ্মা সেতুর দিকে যেতে পার হতে হয় বুড়িগঙ্গা সেতু। এরপর কাছাকাছি আরও দুটি সেতু পরপর: ধলেশ্বরী ১ ও ধলেশ্বরী ২। সেতু দুটির নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে ধলেশ্বরী। ধলেশ্বরীর দুই শাখার মধ্যে চরে গড়ে ওঠা বেশ কয়েকটি গ্রামের একটি চরকুন্দনিয়া।

ধলেশ্বরী আগের মতো নেই বলে মন্তব্য করেন চরকুন্দনিয়া গ্রামের বাসিন্দা দিলবর হোসেন।

বয়স ষাটের ওপর। এক ছেলে কুয়েত থাকেন, দুই ছেলে বাড়িতে মুরগির খামার দেখেন, দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। সংসার চালানোর দায়িত্ব পুরোপুরি নিজের ওপর নেই। তবে মাঝেমধ্যে ধলেশ্বরীতে মাছ ধরতে যান। অগ্রহায়ণ মাসে নদীতে নিয়মিত মাছ ধরার প্রস্তুতি নিতে কিনেছেন নতুন নৌকা। দেখালেন, শ্রীনগর থেকে নতুন তিনটি টেঁটা (মাছ ধরার সরঞ্জাম) বানিয়ে এনেছেন।

গত শুক্রবার সকালে নিজের উঠানে বসে এই প্রতিবেদককে ধলেশ্বরীর গল্প শোনান দিলবর হোসেন। বলেন, ছোটবেলা থেকে ধলেশ্বরীতে নিয়মিত মাছ ধরতে গেছেন। গোসল এই নদীতেই। মাছ বিক্রি করে সংসার চলত। কোনো সময় এক রাতেই ১০-১৫ হাজার টাকার মাছ ধরেছেন।

আগে কী কী মাছ পেতেন, এখন কী কী মাছ নেই? এমন প্রশ্নের উত্তরে দিলবর হোসেন বলেন, বোয়াল, আইড়, শোল, গজার, রুই, কাতলা, বাইন, বেলে, ট্যাংরা, ইঁচা, গলদা, জাটকা, পোয়া, কাজরি। বলেন, ‘আগে জাল দিয়ে মারছি, ঠ্যাডা (টেঁটা) দিয়েও মারছি। এখন মাছ নাই। সব মাছই কমতি।’

ধলেশ্বরীর এই পরিবর্তন কেবল মাছ কমে যাওয়ার গল্প নয়। দেশের বিভিন্ন নদীতে শিল্পবর্জ্য ও অন্য দূষণের কারণে পানি ও মাছের মান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গবেষণায় কোনো কোনো নদীর মাছের নমুনায় ক্ষতিকর ধাতু পাওয়া গেছে। দূষিত নদীর পানির সংস্পর্শে আসা বা দূষণযুক্ত মাছ খাওয়ার মাধ্যমে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বড় হচ্ছে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। এমন পরিস্থিতিতে আজ ২৭ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে বিশ্ব নদী দিবস।

আরও পড়ুন

দিলবরের বক্তব্য সমস্যার ইঙ্গিতমাত্র

দিলবর হোসেনের বয়স বেড়েছে আর নদীর তীরে থেকে ধলেশ্বরীর পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি বলেন, ‘নদী অনেক গভীর আছিল, নদীতে সোত (স্রোত) আছিল। এখন নদী ভরাট হইছে, সোত নেই।’

সবচেয়ে খারাপ অবস্থা হয় শুষ্ক মৌসুমে। তখন ধলেশ্বরীর ধারা ক্ষীণ হয়। আর বুড়িগঙ্গা থেকে ‘পচা’ পানি আসে, নদীতে নামা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন নদীর মাছ মরে ভেসে ওঠে।

চরকুন্দনিয়া গ্রামের নিরক্ষর দিলবর হোসেন ধলেশ্বরীর যে সংকট প্রত্যক্ষ করছেন, তারই সাক্ষ্য পাওয়া যায় জাতীয় নদী কমিশনের প্রতিবেদনে। কমিশনের ২০১৯ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুড়িগঙ্গার মতো ধলেশ্বরীও যেন দূষণে-দখলে পর্যুদস্ত না হয় বা মরণদশায় উপনীত না হয়, সে জন্য কর্তৃপক্ষকে বিশেষ নজর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

দিলবর হোসেনের বক্তব্যে ধলেশ্বরীর সমস্যার যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তা শৈলচূড়া বা ‘টিপ অব আইসবার্গ’ মাত্র। সমস্যার কিছুটি বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদনগুলোতে। নদীর দূষণ যে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠছে, তা বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, দেশে নদ-নদীর দখল ও দূষণ শুধু জলজ প্রাণবৈচিত্র্যের জন্য বিপদ ডেকে আনছে না, এটি এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। গবেষণায় দেখা গেছে, দূষিত পানি ডায়রিয়া, কলেরা, আমাশয়, টাইফয়েড, হেপাটাইটিসসহ নানা পানিবাহিত রোগের কারণ। নদী যত বিপর্যস্ত হচ্ছে, এসবের ঝুঁকি তত বাড়ছে।

নদী কমিশনের হিসাবে দেশে নদীর সংখ্যা ১ হাজার ৮। প্রতিটি জেলার ওপর দিয়ে গড়ে ১৬টি নদী প্রবাহিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি নদী প্রবাহিত হয়েছে সুনামগঞ্জ জেলার ওপর দিয়ে। এই জেলার নদীর সংখ্যা ৯৭।

দূষণ পরিস্থিতি

২০১৯ সালে নদী কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদনে নদীদূষণের কারণ এবং দেশের বড় শহর ও শিল্পাঞ্চলের নদীগুলোর পরিস্থিতি উঠে এসেছে। ঢাকা ও ঢাকার চারপাশে ১১টি শিল্পাঞ্চল রয়েছে: টঙ্গী, মিরপুর, তেজগাঁও, শ্যামপুর/কদমতলী, ডেমরা, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, ঘোড়াশাল ও তারাব। এ ছাড়া আছে বাড্ডা/সাঁতারকুল, কালিয়াকৈর ও রূপগঞ্জের কিছু এলাকা।

কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৭ হাজার শিল্পকারখানার বর্জ্য পরিশোধনের কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। প্রতিদিন প্রায় ৬০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য (টেক্সটাইল, ডাইং, প্রিন্টিং ও ওষুধ) ঢাকার খাল ও নদীগুলোতে পড়ে।

বিভিন্ন কারখানা থেকে আসা রাসায়নিক মিশ্রিত বিষাক্ত পানি সরাসরি ফেলা হচ্ছে বুড়িগঙ্গা নদীতে। এতে দূষিত হচ্ছে নদীর পানি। বিনষ্ট হচ্ছে জলজ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। গতকাল রাজধানীর শ্যামপুরসংলগ্ন বুড়িগঙ্গা নদীতে
ছবি: সাজিদ হোসেন

শিল্পবর্জ্য ছাড়াও নদীদূষণের বড় উৎস নৌযান। প্রতিদিন হাজার হাজার জাহাজ, স্টিমার, লঞ্চ, ইঞ্জিনচালিত নৌকা থেকে নিঃসৃত জ্বালানি, তেল ও দূষিত তরল বর্জ্য পরিশোধন ছাড়াই ফেলা হচ্ছে নদীতে।

প্রতিবেদনে ধলেশ্বরী নদীর পানি পরীক্ষার ফলাফলের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ধলেশ্বরীতে ট্যানারির তরল বর্জ্য ফেলা হয়। তাতে উচ্চমাত্রার ক্রোমিয়াম থাকে।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. খালিকুজ্জামান একাধিক নদীর দূষণ পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা নদীর পানিতে ক্রোমিয়াম পেয়েছিলাম। ক্রোমিয়াম মানুষের শরীরে ক্যানসার তৈরি করে।’

দূষিত মাছ

নদীর পানির দূষণের বড় শিকার মাছ। গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো কোনো নদীতে মাছ বা অন্য কোনো জলজ প্রাণী বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় দ্রবীভূত অক্সিজেন থাকে না। অন্যদিকে কোনো নদীতে অক্সিজেন কিছু পরিমাণে থাকলেও অন্যান্য ভারী ধাতুর পরিমাণ অনেক থাকে। এসব ভারী ধাতু মাছের শরীরে প্রবেশ করে।

অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনের গ্রিফিত বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, আণবিক শক্তি কমিশন ও চীনের চায়না ইউনিভার্সিটি অব জিওসায়েন্সের সাতজন বিজ্ঞানী ও গবেষক মেঘনা নদীর ১৫টি মাছ নিয়ে গবেষণা করেছেন। এই মাছগুলো বেশি খাওয়া হয়। তাঁরা মাছের মধ্যে ভারী ধাতুর উপস্থিতি দেখার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁদের গবেষণা প্রবন্ধ ২০২৩ সালে টক্সিক জার্নালে ছাপা হয়েছিল।

মাছের তালিকায় ছিল তেলাপিয়া, কই, কাতলা, রুই, গ্রাসকার্প, বিগহেড কার্প, কালবাউস, বাটা, পাবদা, পোয়া, চিরিং, রিকশা, গুলিয়া, লইট্টা ও কোরাল। যেসব ধাতুর উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়েছিল তার মধ্যে আছে সিসা, ক্রোমিয়াম, তামা, দস্তা, ম্যাঙ্গানিজ, লোহা, পারদ, নিকেল, ক্যালসিয়াম (এটি হালকা ক্ষারীয় মৃত্তিকা ধাতু, সাধারণ সংজ্ঞায় ভারী ধাতু নয়), কোবাল্ট, সেলেনিয়াম (এটি একটি অধাতু/উপধাতু), রুবিডিয়াম (এটি মৃদু/হালকা ক্ষার ধাতু)।

গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, মাছগুলোতে লোহা, দস্তা, তামা, পারদ ও নিকেলের পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি ছিল। গবেষকেরা বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যতালিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে মাছ। ভারী ধাতু আছে এমন মাছ খাওয়া তাদের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

অবশ্য দূষিত নদীর মাছ খেয়ে কোনো মানুষ বিশেষ কোনো অসুখে পড়েছেন—এমন গবেষণা পাওয়া যায়নি।

মানসিক আঘাত

শুধু নদীর পানি কিংবা মাছে ভারী ধাতুর উপস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি নয়। বাংলাদেশে প্রতিবছর বহু মানুষ নদীভাঙনের শিকার হয়। তারা বাস্তুচ্যুত হয়। এটি একটি গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক আঘাত তৈরি করে। আবার কোনো নদী যখন শুকিয়ে যায়, কোনো নদী যখন বিষাক্ত হয়ে পড়ে, তখন নদীতীরের মানুষ নিজে বাস্তুচ্যুত না হয়েও নদীর সঙ্গে নিজের বিচ্ছিন্নতা অনুভব করে। এই দুই ধরনের মানসিক সমস্যা নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হতে দেখা যায় না।

২০১৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন গবেষক রাজবাড়ী ও টাঙ্গাইলের ৬১১ পরিবারের ওপর জরিপ করেন। এর মধ্যে ৫০৯ পরিবার ছিল নদীভাঙনের শিকার ও ১০২ পরিবার ছিল সাধারণ পরিবার। গবেষকেরা দেখেছেন, নদীভাঙনের শিকার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও মানসিক চাপ অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি।

সংকটে সংস্কৃতি

নদী যখন দূষিত হয়, পলি জমে শুকিয়ে যায় বা দখল হয়, তখন মানুষ কেবল অর্থনৈতিক বা পরিবেশগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, মানুষ নান্দনিক আশ্রয় হারায়। নদী দখল ও দূষণের কারণে নৌকাবাইচ ও নদীভ্রমণ কমে যাচ্ছে। নৌকাবাইচ কেবল খেলা নয়, এটি নদীর বুকে সমষ্টিগত শক্তি, উৎসব এবং ছন্দের মহোৎসব। চরের পাখি বা নদীতে জাল ফেলে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য প্রকৃতি ও মানুষের নিখুঁত সহাবস্থানের প্রতীক। প্রকৃতি যখন তার নিজস্ব নিয়মে স্বাভাবিক থাকে, তখন সেই বাস্তুতন্ত্রের সৌন্দর্য কেবল দেখার আনন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা মানুষকে তৃপ্ত করে।

নদী কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, নদীর এই নান্দনিক মূল্য হারিয়ে যাওয়া বিপজ্জনক। যে সমাজে মানুষ প্রাকৃতিক এই সৌন্দর্য দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, সেখানে যান্ত্রিকতা, মানসিক অস্থিরতা এবং নান্দনিক শুষ্কতা বৃদ্ধি পায়। তাই নদীর এই সৌন্দর্যকে টিকিয়ে রাখা কেবল পরিবেশ রক্ষার তাগিদ নয়, মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যকে বাঁচিয়ে রাখারও এক জরুরি প্রয়োজন।