বদরুলসহ ১৩ ব্যক্তি এই সম্মাননা পেয়েছেন। আজ বুধবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মাননা হস্তান্তর করা হবে। সম্মাননা নিতে পিরোজপুরের বদরুল এখন ঢাকায়। সঙ্গে আছেন স্ত্রী-সন্তানেরাও।

বদরুল বলেন, টেকসই কৃষি নিয়ে কাজ করবেন, তা আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন তিনি। তবে ঠিক কেঁচো নিয়েই যে কাজ করবেন, তা ভাবেননি।

২০১২ সালে একটি দৈনিক পত্রিকায় কেঁচো চাষ নিয়ে একটি প্রতিবেদন পড়েন বদরুল। ওই প্রতিবেদন পড়ে কেঁচো চাষ নিয়ে কাজ করার আগ্রহ জন্মে তাঁর। তারপর তাঁকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

বদরুল শুরুতে তাঁর চাচাতো ভাই ফারুক হোসেন ব্যাপারীর কাছ থেকে ছয় একরের একটি সমন্বিত কৃষিখামার ভাড়া নেন। চুয়াডাঙ্গা থেকে ১৩ হাজার ২০০ টাকায় দুই কেজি কেঁচো কেনেন। কেনেন ছয়টি স্যানিটারি রিং। শুরু করেন ‘জাগো কেঁচো খামার’।

বদরুল বলেন, কেঁচো নিয়ে কাজ করায় শুরুতে আশপাশের লোকজন হাসাহাসি করত। তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত। কিন্তু তিনি হতোদ্যম হননি। কাজ চালিয়ে গেছেন নিজের মতো।

default-image

তবে এখন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাচ্ছে। বদরুলের কাজ নিয়ে তাঁর পরিবারের সদস্যরাও গর্বিত। এমনকি তাঁরা তাঁর কাজে নানাভাবে সহায়তা করছেন।

বদরুলের নিজের তিনটি খামারে বর্তমানে কেঁচো সার উৎপাদনের পরিমাণ মাসিক প্রায় ৮৫ মেট্রিক টন। তিনি বিভিন্ন খামার থেকে সোর্সিং করে মাসে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন কেঁচো সার বিক্রি করেন। এক মেট্রিক টন কেঁচো সার ১২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।

বদরুল বলেন, ‘শুরুতে নিজের উৎপাদিত কেঁচো সার নিজের কৃষিখামারে ব্যবহার করি। এতে ভালো ফল পাই। তারপর অন্য কৃষকদের কেঁচো সার উৎপাদন ও ব্যবহারের কাজে নামি। তবে কাজটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়। কিন্তু এ কাজেও সফলতা আসে।’

কৃষি উৎপাদন/বাণিজ্যিক খামার স্থাপন ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প ক্যাটাগরিতে বদরুল গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (এআইপি) সম্মাননা পেয়েছেন। এ প্রসঙ্গে বদরুল বলেন, স্বীকৃতি পেতে তিনি আবেদন করেন। সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে আবেদন যাচাই–বাছাই করা হয়। পরে তাঁকে জানানো হয়, তিনি এ সম্মাননা পাচ্ছেন।

default-image

বদরুল জানান, সম্মাননা পাওয়ায় তিনি বেশ কিছু সুবিধা পাবেন। যেমন এক বছর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রশংসাপত্র পাবেন। বাংলাদেশ সচিবালয়ে ঢোকার জন্য পাস পাবেন। বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পাবেন। আকাশ, রেল, সড়ক ও জলপথে ভ্রমণে সরকার পরিচালিত গণপরিবহনে আসন সংরক্ষণে অগ্রাধিকার পাবেন। ব্যবসা বা দাপ্তরিক কাজে বিদেশ ভ্রমণের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভিসাপ্রাপ্তিতে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসকে লেটার অব ইন্ট্রোডাকশন ইস্যু করবে। বিমানবন্দরে ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহারের সুবিধা পাবেন। নিজের ও পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার জন্য সরকারি হাসপাতালে কেবিন সুবিধাপ্রাপ্তিতে অগ্রাধিকার পাবেন।

বদরুলের জন্ম পিরোজপুরের নাজিরপুরের চৌঠাইমহল গ্রামে, ১৯৭৬ সালে। তাঁর বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা আলতাফ হোসেন ব্যাপারী। তিনি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান।

বদরুলসহ তিন বন্ধু মিলে গ্রামে একটি অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর স্ত্রী আনজুমান আরা স্কুলটিতে অবৈতনিক শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

default-image

বদরুল ডিগ্রি পাস করেছেন। তিনি জানান, আগে স্থানীয় কৃষকদের অলস সময়কে ব্যবহার করে বিকল্প কর্মসংস্থানের কথা চিন্তা করতেন। কৃষিতে অধিক মাত্রায় রাসায়নিক সারের ব্যবহারের বিষয়টি তাঁকে ভাবাত। তাঁর এই ভাবনাগুলোয় নতুন মাত্রা এনে দেয় কেঁচোখামারের ধারণা।

শুরুতে কেঁচোখামারের সব বিষয় বদরুল বুঝতেন না। যে বিষয়গুলো বুঝতেন না বা জানতেন না, তার জন্য তিনি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, মৎস্য কর্মকর্তা ও প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কাছে যেতেন। বদরুলের আগ্রহ দেখে সরকারি কর্মকর্তারা তাঁর পাশে দাঁড়ান।

বদরুলের নিজ গ্রাম ও পাশের গ্রামে তাঁর সার্বিক সহায়তায় ৪১টি কেঁচোখামার গড়ে উঠেছে। তিনি বলেন, একপর্যায়ে খামারগুলোর উৎপাদিত সার বাজারজাতকরণের বিষয়টি সামনে চলে আসে। সমস্যা সমাধানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কেঁচো সার উৎপাদনকারী কৃষকদের নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন বাংলাদেশ ভার্মিকম্পোস্ট উৎপাদক অ্যাসোসিয়েশন নামের একটি সংগঠন। ফেসবুকে সবুজ পরিবহন সোসাইটি নামে একটি গ্রুপের মাধ্যমে তিনি নগর কৃষি সম্প্রসারণে কাজ করছেন।

বদরুল বলেন, ‘দিনে কেঁচো নিয়ে কাজ করি। রাতে ফেসবুকে কেঁচো নিয়ে পোস্ট দিই। কষ্ট হলেও কখনো হাল ছাড়িনি।’

২০১৬ থেকে ২০২০ সালে করোনার আগপর্যন্ত ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশালসহ বিভিন্ন এলাকায় ৬৩টি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে প্রায় ২০ হাজার নগর ও মাঠ কৃষকের কাছে পৌঁছান বদরুল।

বদরুল দেশের বিভিন্ন জেলার প্রায় ৭০ হাজার কৃষককে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। সরকারের ‘আমার বাড়ি আমার খামার’ প্রকল্পে প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

কেঁচো সার নিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের গবেষণায় সহায়তা করেছেন বদরুল। সরকারের জৈব সারের নিবন্ধন নীতিমালা সংশোধনে ভূমিকা রেখেছেন। কেঁচো সারকে বিসিক পণ্য তালিকাভুক্তি, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মডিউল তৈরিসহ বিভিন্ন কাজে নিজেকে যুক্ত করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।

বদরুলের চাওয়া কেঁচো সার উৎপাদনের মাধ্যমে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। পাশাপাশি রাসায়নিক সার আমদানি ২০ থেকে ৪০ শতাংশ কমিয়ে আনা।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন