আনোয়ারা সৈয়দ হক চোখ উপন্যাসের জন্য এ পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘পেশায় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হলেও আমি মূলত একজন লেখক। ছোটবেলা থেকেই আমি লেখালেখি করি। যদিও পরিবারের ইচ্ছায় আমাকে ডাক্তারি পড়তে হয়েছে, কিন্তু লেখালেখি থেকে আমি কখনো এতটুকু বিচ্যুত হইনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘লন্ডনে যখন হাসপাতালে কাজ করছি, তখন “সোনার হরিণ” নামে একটি লেখা বাংলাদেশের কাগজে ছাপা হয়। সেই গল্পটি নিয়ে আবু রুশ্‌দ একটি ইংরেজি দৈনিকে আলোচনা লিখেছিলেন। ব্যাপারটি আমাকে ভীষণ অনুপ্রাণিত করেছিল। আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল যে, আমি লেখালেখি করতে পারব।’

আনোয়ারা সৈয়দ হক বলেন, ‘আজ অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁকে (আবু রুশ্‌দ) স্মরণ করছি। আমার ভেতরে যে আশার প্রদীপ তিনি জ্বালিয়েছিলেন, সে কারণে আমি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ। আমার জীবনের একজন দিকনির্দেশক হিসেবে তিনি আমার ভেতরে বেঁচে থাকবেন।’

বরফকল উপন্যাসের জন্য পুরস্কার পাওয়া ওয়াসি আহমেদ বলেন, ‘উপশমের জন্য ও আত্মতাড়না থেকে আমি লেখালেখি করি। সেই লেখা যদি পাঠকের মনোযোগ কাড়ে, সেটা আমার কাছে বাড়তি পাওয়া। পুরস্কারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রেও তাই। উপন্যাস শেষ করতে আমার দীর্ঘ সময় লেগে যায়। কিন্তু বরফকল শেষ করেছিলাম মাত্র ৭ মাসে। কাজটি করোনাকালে পাঠক লুফে নিয়েছেন।’

পাপড়ি রহমান নদীধারা আবাসিক এলাকা ও মাহমুদ আখতার শরীফ মানুষ হবার কাল্পনিক গল্প উপন্যাসের জন্য পুরস্কৃত হয়েছেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আবু রুশ্‌দ অত্যন্ত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। তবে কিছুটা বিচ্ছিন্ন ও গম্ভীর। যারা তাঁর সঙ্গে মিশেছেন, তাঁরা জানেন, তিনি ছিলেন ভীষণ সংবেদনশীল ও স্নেহশীল মানুষ। আজ আমরা কেবল তাঁকে স্মরণ করছি না, তাঁর নামে পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে তাঁর সাহিত্যকে মর্যাদা দিচ্ছি।’

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘সাহিত্যকে মূল্য দেওয়া এই সময়ের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, আমরা এমন এক পরিস্থিতির দিকে পতিত হচ্ছি যেখানে বিচ্ছিন্নতা, বিদ্বেষ, আত্মকেন্দ্রিকতা, মুনাফালিপ্সা প্রবলভাবে আমাদের আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। আমরা প্রযুক্তির উন্নয়ন দেখেছি, যার প্রতিটি সাহিত্যকে সাহায্য করেছে। কিন্তু ইদানীং সাহিত্য অবমূল্যায়িত হচ্ছে। এ জন্য দায়ী মালিকানা।’ তিনি আরও বলেন, ‘পুঁজির দৌরাত্ম্যে বাণিজ্য প্রধান হয়ে উঠেছে। মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা বেড়েছে, যা করোনায় চরম রূপ লাভ করেছে। এই সময়ে সাহিত্য অত্যন্ত মূল্যবান। সাহিত্য মানুষকে সংলগ্ন করে, কাছে নিয়ে আসে, অনুভূতিকে পরিশীলিত করে, ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করে। আজ এই পুরস্কার সাহিত্যের প্রতি আমাদের আনুগত্য ও ভালোবাসার প্রকাশ।’

পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা বলেন, ‘আবু রুশ্‌দ অনুবাদক হিসেবে ছিলেন অসাধারণ। কাজী নজরুলের অনুবাদ তিনি খুব ভালো করেছেন।’

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন জ্ঞানতাপস আবদুর রাজ্জাক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক আহরার আহমেদ, শিক্ষাবিদ ফখরুল আলম, আবু রুশ্‌দ স্মৃতি পর্ষদের সদস্য সমাজকর্মী খুশি কবীর। আবু রুশ্‌দের পরিবারের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা এ আর মামুন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বন্যা লোহানী।

আবু রুশ্‌দ গত শতকের চল্লিশের দশক থেকে শিক্ষকতা ও লেখালেখিতে যুক্ত ছিলেন। তাঁর প্রথম গল্পের সংকলন রাজধানীতে ঝড়। গল্প, উপন্যাস মিলিয়ে তাঁর রচনার সংখ্যা কম নয়। নতুন প্রজন্মের পাঠকদের সঙ্গে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিতে এই সাহিত্যিকের রচনা পুনর্মুদ্রণের আহ্বান জানান অতিথিরা।