পুলিশ পরিদর্শকের জবানবন্দি
‘সড়কে দুই নেতার মরদেহ পড়ে থাকতে দেখি, সেখানে ছিলেন এসপি ও দুই এএসআই’
ঘটনাস্থলে গিয়ে সড়কের ওপর ছাত্রদল ও জাসাসের দুই নেতার মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেছিলেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন সাক্ষী পুলিশ পরিদর্শক মো. নজরুল ইসলাম মজুমদার। জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, যেখানে ছাত্রদল ও জাসাসের দুই নেতার মরদেহ পড়ে ছিল, সেখানে বরিশালের সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) এ কে এম এহসানউল্লাহ এবং বরিশালের উজিরপুর থানার সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. মাহাবুল ইসলাম ও মো. জসিম উদ্দিনকে দেখতে পান তিনি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–২–এ আজ বৃহস্পতিবার এমন জবানবন্দি দেন সাক্ষী পুলিশ পরিদর্শক নজরুল ইসলাম মজুমদার। ছাত্রদল ও জাসাসের দুই নেতাকে ক্রসফায়ার দেওয়ার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে তিনি জবানবন্দি দেন। ২০১৪ সালের ২২ জুন থেকে ২০১৫ সালের ৩০ আগস্ট পর্যন্ত বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় এসআই হিসেবে তিনি কর্মরত ছিলেন।
২০১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ক্রসফায়ারে নিহত হন আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদলের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার এবং উপজেলা জাতীয়তাবাদী সামাজিক–সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) সাংগঠনিক সম্পাদক কবির হোসেন মোল্লা।
এই মামলার চার আসামির মধ্যে আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এবং বরিশালের সাবেক এসপি এ কে এম এহসানউল্লাহ পলাতক। অপর দুই আসামি বরিশালের উজিরপুর থানার সাবেক এএসআই মাহাবুল ইসলাম ও জসিম উদ্দিন কারাগারে আছেন।
জবানবন্দিতে নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, ২০১৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরা থেকে বরিশালের উদ্দেশে ছেড়ে আসা ফলবাহী পিকআপ ভ্যানে আগুন দেওয়ার ঘটনায় করা মামলাটি তদন্ত করেন তিনি। মামলাটি তদন্ত করার সময় ২০১৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি বরিশালের তৎকালীন পুলিশ সুপার এ কে এম এহসানউল্লাহ নিজ কার্যালয়ে আগৈলঝাড়া থানার ওসি মনিরুল ইসলাম ও তাঁকে ডাকেন। ওসি ও তাঁকে দেখে এসপি রেগে যান। এসপি বলেন, ‘একটা আসামি ধরতে পারো না…অথর্ব, অযোগ্য লোক। আসামি ধরো, না হলে চাকরি থাকবে না।’
অনেকের সামনে এসপি চরম অপমান করায় কেঁদে ফেলেন উল্লেখ করে নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, এরপর এসপি বলেন, ‘তুই তো কানা, চোখে দেখো না, তুই তো আসামি ধরতে পারবি না। তোর সাথে আমার চৌকস অফিসার ডিবির এসআই খলিলুর রহমানকে দিলাম। তোরা গিয়ে ডিসি (ডিবি), ডিএমপি, ঢাকা–এর নিকট রিপোর্ট করবি, সেখানে বলা আছে।’
২০১৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি রাতে কনস্টেবল শাহজাহান, কনস্টেবল লিটন শর্মা ও ডিবির এসআই খলিলুর রহমানসহ একত্র হয়ে ঢাকায় রওনা হন বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন নজরুল ইসলাম মজুমদার। তিনি বলেন, ঢাকায় ডিবির তৎকালীন মুখপাত্র মনিরুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করেন। মনিরুল ইসলাম তৎকালীন ডিবির এসি মহরম ও তাঁর টিমকে আসামি গ্রেপ্তারের দায়িত্ব দেন। একই বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে আশুলিয়া থানার কুরগাঁও পুরাতন পাড়া থেকে কবির মোল্লাকে এবং একই রাতে কেরানীগঞ্জের মধ্যেরচর এলাকা থেকে টিপু হাওলাদারকে গ্রেপ্তার করেন। তাৎক্ষণিকভাবে এসপি এহসানউল্লাহ ও আগৈলঝাড়া থানার ওসি মনিরুল ইসলামকে বিষয়টি জানান।
পরে ২০ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার দুই আসামিসহ এসআই খলিলুর ও তিনি মাইক্রোবাস ভাড়া করে বরিশালের উদ্দেশে রওনা করেন উল্লেখ করে জবানবন্দিতে নজরুল ইসলাম বলেন, রওনা দেওয়ার সময় তিনি বরিশালের এসপির সঙ্গে কথা বলেন। এসপি আসামি দুজনকে নিয়ে মাদারীপুরের কালকিনির ভুরঘাটা এলাকায় যেতে বলেন এবং বরিশাল ডিবি দল সেখানে আছে। ভুরঘাটা এলাকায় পৌঁছে দেখেন ডিবির টিম অবস্থান করছে। তখন তাদের কাছে আসামি দুজনকে হস্তান্তর করেন তিনি।
২০ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত দেড়টায় (মূলত ২১ ফেব্রুয়ারি) আগৈলঝাড়া থানায় যান উল্লেখ করে নজরুল ইসলাম বলেন, তখন ওসি ডিউটি অফিসার ও সেন্ট্রিকে রেখে আগৈলঝাড়া থানার সব অফিসার ও ফোর্স নিয়ে বুধার বাইপাস সড়কে যান। সেখানে গিয়ে ওসি সবাইকে বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন করেন। তখন ওসি তাঁর কাছাকাছি ছিলেন। রাত ২টার দিকে তাঁদের সামনে দিয়ে বরিশালের এসপির গাড়ি যায়। তার পেছনে একটি মাইক্রোবাসও ছিল। এর ১৫ মিনিট পর কয়েকটি গুলির শব্দ শুনতে পান। ওসি তাঁকে বলেন, কী হয়েছে, সামনে গিয়ে দেখবেন। তখন ওসি ও তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে রাস্তার ওপর কবির মোল্লা ও টিপু হাওলাদারের রক্তাক্ত মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। ঘটনাস্থলে বরিশালের এসপি এহসানউল্লাহ ও উজিরপুর থানার এএসআই মাহাবুল ও এএসআই জসিমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন।
তাঁদের দেখে এসপি রেগে যান, এ কথা নজরুল ইসলাম বলেন। তখন এসপি বলেন, ‘তোরা এখন আসছ কী জন্য? তোরা তো কিছুই করতে পারলি না।’ এএসআই মাহাবুল ও এএসআই জসিমকে দেখিয়ে এসপি বলেন, ‘তোরা পারলি না। এ জন্য দেখ উজিরপুর থানা থেকে তাদের নিয়ে আসছি। তাদের পুরস্কৃত করব।’