সবচে উষ্ণ মাসে এত বৃষ্টির কারণ কী, এবার হাওরে ফসলের এমন ক্ষতি কেন
হাওরের বাঁধ ভেঙে আসা পানিতে তিন বছর আগে ফসল নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এবার ফসল নষ্ট হলো হঠাৎ বৃষ্টিতে, জলাবদ্ধতায়। ফসলের ক্ষতি যেন রফিকুল ইসলামের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। তাঁর বাড়ি সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার পাগনার হাওর এলাকার লক্ষ্মীপুর গ্রামে।
৫০ বছর বয়সী কৃষক রফিকুল বলছিলেন, ‘হাওরে আগে বাঁধ ভাইঙ্গা বউত মানুষের ধান গেছে, আমারও খেত নষ্ট অইছে। ইবার মেঘের (বৃষ্টি) পানিতে দেখা দিল ডুবরা (জলাবদ্ধতা)। ইলা আগে কোনো সময় অইছে না। অখন বাঁধও ভাঙ্গে, লগে ডুবরাও হাওরের ধান যায়।’
হাওর অঞ্চলে রফিকুলের মতো হাজার হাজার কৃষকের বড় ভরসা বোরো ধান। হাওর এলাকাটাই এমন। এক মৌসুমে এই একটি ফসলের ওপরই জীবন চলে বড় অংশের কৃষকের। সেই ফসলেরই এবার সীমাহীন ক্ষতি। এর ওপর নির্ভর করে পুরো বছরের খাদ্যের সংস্থান। এপ্রিল শেষের অতিবর্ষণ, উজানের ঢল, পাহাড়ি নদীগুলো উপচে পড়ায় প্লাবিত হয়েছে হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকার ফসল। অনেক কৃষকই ধান ‘কাটব কাটব’ করে সময় গুনছিলেন। এমন সময় এল বিপর্যয়।
হাওরে আগে বাঁধ ভাইঙ্গা বউত মানুষের ধান গেছে, আমারও খেত নষ্ট অইছে। ইবার মেঘের (বৃষ্টি) পানিতে দেখা দিল ডুবরা (জলাবদ্ধতা)। ইলা আগে কোনো সময় অইছে না। অখন বাঁধও ভাঙ্গে, লগে ডুবরাও হাওরের ধান যায়।কৃষক রফিকুল
এই বৃষ্টি শুধু হাওরের জেলাগুলোর ধানের ক্ষতি করেই ক্ষান্ত হয়নি। দেশের বিভিন্ন স্থানে তরমুজ, মুগ ডাল, বাদাম এবং সূর্যমুখীসহ নানা ফসলেরও ক্ষতি করেছে। ক্ষতির সীমা ছড়িয়েছে দক্ষিণ, দক্ষিণ–পূর্ব এমনকি উত্তরের কোনো কোনো জেলায়ও।
কৃষিবিদ, আবহাওয়াবিদ, পানিবিশেষজ্ঞ এবং জলবায়ুবিশারদেরা ফসলের এই ক্ষতির জন্য দূষছেন এপ্রিলের অকাল বৃষ্টিকে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০১৭ সালের পর দেশে এপ্রিল মাসে এত বৃষ্টি আর হয়নি। এপ্রিল দেশের সবচেয়ে উষ্ণ মাস। কিন্তু এ সময়ে এত বৃষ্টির জন্য প্রস্তুত ছিল না কেউ।
৯ বছরে সর্বোচ্চ বৃষ্টি
দেশের সবচেয়ে উষ্ণ মাস এপ্রিল। এ মাসে গড় তাপমাত্রা থাকে ৩৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে এবার এপ্রিল মাসে সর্বোচ্চ ও গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিক থেকে যথাক্রমে শূন্য দশমিক ৬ ডিগ্রি এবং শূন্য দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম থেকেছে।
চলতি বছর গরমের মৌসুমের শুরুর দিকেই আবহাওয়া অধিদপ্তর পূর্বাভাস দিয়েছিল, অন্তত এপ্রিলে গরম তত তীব্র হবে না। দেখা গেছে, ২২ এপ্রিল শুধু এক দিন রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০২৪ সালে পুরো এপ্রিল মাস তাপপ্রবাহ ছিল। সদ্য বিদায়ী এপ্রিলে বিচ্ছিন্নভাবে তাপপ্রবাহ থেকেছে বিভিন্ন স্থানে। তবে তা টানা থাকেনি। মাসের শুরুতে তাপপ্রবাহ শুরু হলেও দুই দিনের মধ্যেই তা কমে যায়। তারপর বৃষ্টি শুরু হয় প্রথম সপ্তাহেই। দ্বিতীয় সপ্তাহের পর আবার তাপপ্রবাহ শুরু হলে তা টেকে সাত দিনের মতো। তা–ও দেশের সর্বত্র তা থাকেনি। সর্বোচ্চ ২২টি জেলায় তাপপ্রবাহ ছিল। মাসের শেষ দিকে আবার বৃষ্টি শুরু হয়। এখন এই মে মাসের তিন দিন চলে গেলেও সেই বৃষ্টির রেশ রয়ে গেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর গতকাল রোববার দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে। বলা হয়েছে, গেল মাস এপ্রিলে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৫ শতাংশের বেশি বৃষ্টি হয়েছে। এক রাজশাহী বিভাগ বাদ দিয়ে সব বিভাগেই অনেক বেশি বৃষ্টি হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদ বৃষ্টি ও জলবায়ুর–সম্পর্কিত উপাত্ত নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত মাসের বৃষ্টি ৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। তিনি বলেন, এ বছর এপ্রিলে অস্বাভাবিক বৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাব কৃষিতে পড়েছে। প্রাক্–বর্ষা এবং বর্ষা–পরবর্তী সময়ে বৃষ্টির পরিমাণ বৃদ্ধি একটি নতুন প্রবণতা। এর মূল কারণ জলবায়ুর পরিবর্তন।
হাওরের ফসলের যত ক্ষতি
কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায় থেকে এবারের হঠাৎ বৃষ্টি, বন্যার ক্ষয়ক্ষতির তথ্য আসতে শুরু করেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইং (শাখা) ফসলের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং এ নিয়ে সরকারকে নানা পরামর্শ দেয়। উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মন্ডল গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, হাওরের সাত জেলায় চলতি মৌসুমে বোরো আবাদ হয়েছিল ৪ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৩ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে ৭১ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। আর এই জমির মধ্যে ৪৬ হাজার হেক্টর জমি পানিতে ডুবে গেছে। হাওরের সাত জেলা হচ্ছে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
তবে হাওরে কৃষকদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কৃষি বিভাগের দেওয়া হিসাবের তুলনায় ধানের ক্ষতি আসলে অনেক বেশি।
হাওরের ভূপ্রকৃতি পরিবর্তন হয়ে গেছে। এর অনেকটাই মনুষ্যসৃষ্ট। কখনো সড়ক, বসতবাড়ি, পাকা স্থাপনা ইত্যাদি নানা কারণেই এর পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখন যে পরিস্থিতি, তাতে হাওরে প্রচলিত কৃষি এবং চিরাচরিত ফসল নির্বাচনে পরিবর্তন আনতে হবে। পরিবর্তিত অবস্থায় এই কৃষি এবং ফসল কেমন হবে তা গবেষক, কৃষিবিদসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ঠিক করতে হবে। হাওর অর্থনীতিকে কেবল কৃষি নয়, অকৃষি খাতের ওপরও জোর দিতে হবে।কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবদুস সাত্তার মণ্ডল
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করতে তাঁরা কিছুটা রক্ষণশীল হচ্ছেন। কারণ, একেক স্থানে ধানের দাম একেক রকম। অন্যান্য ফসলের দামেও ভিন্নতা আছে এলাকাভেদে। ক্ষতি নিরূপণে সময় লাগবে।
শুধু সুনামগঞ্জের কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, বৃষ্টিতে ১৮ হাজার হেক্টরের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর এর আগে ক্ষতি হয়েছে ২ হাজার হেক্টরের ফসল। সেই অনুযায়ী অন্তত ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
বিশিষ্ট কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবদুস সাত্তার মণ্ডল বলেন, হাওরের ভূপ্রকৃতি পরিবর্তন হয়ে গেছে। এর অনেকটাই মনুষ্যসৃষ্ট। কখনো সড়ক, বসতবাড়ি, পাকা স্থাপনা ইত্যাদি নানা কারণেই এর পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখন যে পরিস্থিতি, তাতে হাওরে প্রচলিত কৃষি এবং চিরাচরিত ফসল নির্বাচনে পরিবর্তন আনতে হবে। পরিবর্তিত অবস্থায় এই কৃষি এবং ফসল কেমন হবে তা গবেষক, কৃষিবিদসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ঠিক করতে হবে। হাওর অর্থনীতিকে কেবল কৃষি নয়, অকৃষি খাতের ওপরও জোর দিতে হবে।
হাওরের তলদেশ ভরছে
সুনামগঞ্জের হাওরের ফসল রক্ষায় প্রতিবছর বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার হয়। এতে শতকোটি টাকা ব্যয় হয় প্রতিবছর। কিন্তু এবার হাওরে ফসল রক্ষায় নির্মাণ বা সংস্কার করা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কোনো বাঁধ ভাঙেনি। তবু ব্যাপক ফসলের ক্ষতি হয়েছে।
এখন সুনামগঞ্জের নানা শ্রেণি–পেশার লোকজন বলছেন, শুধু বাঁধ দিয়ে যে আর হাওরের ফসল রক্ষা হবে না, তা এবার প্রমাণিত হলো। বাঁধের পাশাপাশি হাওরের ফসল রক্ষায় বিকল্প কী হতে পারে, সেই প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। এবার জলাবদ্ধতা, পানিনিষ্কাশনের সংকট বেকায়দায় ফেলে কৃষকদের।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার স্বীকার করেছেন, হাওরের তলদেশ, নদী-নালা পলি পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। আবার এসবের ওপর অনেকে স্থাপনা তৈরি করায় পানিনিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। যে কারণে পানি সহজে নামতে পারেনি।
এপ্রিলে সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয়েছে বরিশাল বিভাগে, যা ১৬৯ শতাংশের বেশি। তবে রাজশাহী বিভাগে স্বাভাবিকের চেয়ে সামান্য কম বৃষ্টি হয়েছে। ঢাকা বিভাগে প্রায় ৮০ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে।
হাওর ছাড়াও অন্যত্র যত ক্ষতি
এপ্রিলে সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয়েছে বরিশাল বিভাগে, যা ১৬৯ শতাংশের বেশি। তবে রাজশাহী বিভাগে স্বাভাবিকের চেয়ে সামান্য কম বৃষ্টি হয়েছে। ঢাকা বিভাগে প্রায় ৮০ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে।
বরিশাল বিভাগের পটুয়াখালীতে একটি লাভজনক শস্য হলো মুগ ডাল। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আমানুল ইসলাম প্রথম আলোকে জানান, এ বছর ৫১ হাজার হেক্টর জমিতে মুগ ডাল চাষ হয়েছে। ৬ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে হয়েছে বাদাম আর তিন হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে হয়েছে সূর্যমুখী।
আমানুল ইসলাম বলেন, হঠাৎ বৃষ্টিতে অনেক কৃষকের বাদাম খেত পচে গেছে। মুগ ডাল কয়েক পর্যায়ে তোলা হয় খেত থেকে। মোটামুটি ২০ এপ্রিলের পর থেকেই এ কাজ হয়। ২৬ তারিখ থেকে টানা বৃষ্টি হয়েছে। তাঁর হিসাবে, সব ফসলের জমির মুগ ডালই কিছু কিছু নষ্ট হয়েছে।
বরগুনা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রবি মৌসুমে জেলায় মোট ৭০ হাজার ২৭৯ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের ফসলের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ৪৮ হাজার ৭৬০ হেক্টর জমিতে মুগ ডাল, ৮০১ হেক্টরে চিনাবাদাম, ১ হাজার ৩৬০ হেক্টরে মরিচ এবং ৫৯৪ হেক্টরে মিষ্টি আলু। ভারী বৃষ্টিতে ৫ হাজার ২৬০ হেক্টর মুগ ডাল, মরিচ ১০২ হেক্টর, মিষ্টি আলু ৫৭ হেক্টর আর ১২২ হেক্টর জমির বাদাম নষ্ট হয়েছে।
এ ছাড়া অতিবৃষ্টিতে খাগড়াছড়ি, গাইবান্ধা ও সাতক্ষীরা সদর, কলারোয়া এবং তালা উপজেলাতেও ধানের ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা। খাগড়াছড়ির কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক তথ্যমতে, টানা বৃষ্টিতে প্রায় ২২১ হেক্টর জমির বোরো পাকা ধান, ৬৩ হেক্টরের সবজি এবং ৫৪৮ হেক্টর জমির ফলবাগান ক্ষতির মুখে পড়েছে।
গাইবান্ধায় বৃষ্টির সঙ্গে কালবৈশাখীতে প্রায় ২১২ হেক্টর জমির ধানগাছ শুয়ে গেছে।