অধ্যাপক মো. আবুল কাশেম মিয়া এখন প্রেষণে (বুয়েট থেকে অনুমোদন নিয়ে) ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহ-উপাচার্য। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত উপাচার্যের মেয়াদ শেষ হওয়ায় এখন তিনি উপাচার্যের রুটিন দায়িত্বও পালন করছেন। এর আগে বুয়েটে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

শিক্ষাজীবনে বরাবরই এগিয়ে
গত ২৫ অক্টোবর বুয়েট ক্যাম্পাসের বাসায় আবুল কাশেম মিয়ার সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। জানা যায়, তাঁর গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরে। বাবার কর্মসূত্রে তিনি ছেলেবেলা থেকেই ঢাকায় বসবাস করছেন। স্কুল ও কলেজও রাজধানীতে। প্রাথমিকে কিছুদিন পড়েছেন ঢাকার পিঅ্যান্ডটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তখন থাকতেন শান্তিনগর এলাকায়।

অধ্যাপক আবুল কাশেম বলেন, তাঁর ছেলে যখন বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় তৃতীয় হন, তখন তাঁর মা অর্থাৎ সন্তানের দাদি বেঁচে ছিলেন। তৃতীয় হওয়ার পর ছেলে নাফিস তাঁর দাদিকে গিয়ে বলেন, ‘দাদি, আমি তোমার ছেলেকে হারিয়ে দিয়েছি।’ কথাটি বলতে গিয়ে আবুল কাশেম কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। বলেন, ‘এতে আমার মা খুবই খুশি হয়েছিলেন। আর বাবা হিসেবে আমি সন্তানের কাছে এমন পরাজয়ই তো চাই।’

মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৮১ সালে এসএসসি পাস করে আবুল কাশেম মিয়া ভর্তি হন ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজে। সেখান থেকে স্টার মার্কস নিয়ে ১৯৮৩ সালে এইচএসসি পাস করেন। এরপর চিকিৎসাবিদ্যা নাকি প্রকৌশলবিদ্যায় পড়বেন, তা নিয়ে কিছুটা দোটানায় ছিলেন।

ভর্তি পরীক্ষা দেন দুই জায়গাতেই। ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য নির্বাচিত হন। আর বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় ২০তম স্থান অর্জন করেন। ফলে তিনি চাইলে বুয়েটে যেকোনো বিষয়ে পড়তে পারতেন। তবে পরিবারের ইচ্ছা ছিল ছেলে চিকিৎসক হোক।

আবুল কাশেম মিয়া জানান, তাঁর গণিতের প্রতি বেশি ঝোঁক ছিল। এই বিষয়ে বরাবরই ভালো করতেন তিনি। মুখস্থবিদ্যায় ছিল ভীতি। বন্ধুবান্ধবেরা পরামর্শ দিলেন বুয়েটে পড়তে। বাবাও বললেন ছেলে যেখানে পড়তে চাইবে, সেটাই হবে।

শেষ পর্যন্ত আবুল কাশেম মিয়া ভর্তি হন বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগে। তখন বুয়েটে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগ চালু হয়নি। ইইইতেই এই বিষয়টি পড়ানো হতো। তিনি মেধাতালিকায় অবস্থান নিয়ে প্রথম শ্রেণিতে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন।

ফল ভালো হওয়ায় বসে থাকতে হয়নি। তত দিনে বুয়েটে সিএসই বিভাগ চালু হয়েছে। তাঁর যখন ফল প্রকাশ হয়, তখন সিএসই ও ইইই বিভাগে একসঙ্গে শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল। তিনি সিএসইতে আবেদন করেন। ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।

আবুল কাশেম মিয়া জানালেন, ১৯৯২ সালে পিএইচডি করতে জাপানে যান। পিএইচডি করার সময় ১৯৯৬ সালের শেষের দিকে ছুটিতে দেশে আসেন। ১৯৯৭ সালে পারিবারিকভাবে বিয়ে করেন বুয়েটের ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষক সুলতানা পারভীনকে। বর্তমানে তিনিও অধ্যাপক। তাঁর স্কুল ও কলেজও ঢাকায়।

‘লেগে থাকলে সাফল্য আসবেই’
কথা বলতে গিয়ে এই দম্পতির দুই সন্তানের প্রসঙ্গ উঠল। মেয়ে নাবিলা তাসনীম ও ছেলে নাফিস তাহমীদ—দুজনই বুয়েট ক্যাম্পাসে অবস্থিত ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভারসিটি স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে পাস করে এখন বুয়েটে পড়ছেন। নাবিলা ইইই বিভাগে চতুর্থ বর্ষে পড়ছেন। আর ছেলে নাফিস পড়ছেন সিএসই বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষে।

বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষা ও শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া এখনো বিতর্কমুক্ত। প্রকৃত মেধাবীরাই এখানে ভর্তি হন এবং শিক্ষক হওয়ার সুযোগ পান। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পোষ্য কোটা থাকলেও বুয়েটে তা নেই। আবুল কাশেম মিয়া জানালেন, তাঁর ছেলে ২০১৯ সালে বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় তৃতীয় হয়েছিলেন এবং ইচ্ছা অনুযায়ী পছন্দের বিভাগ সিএসইতে ভর্তি হয়েছেন।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আবুল কাশেম মিয়া বলেন, দেশের শিক্ষার্থীরা কিন্তু মেধাবী ও বুদ্ধিমান। কিন্তু সুযোগ দিতে না পারায় তাঁরা পিছিয়ে পড়ছেন। তাই যখনই যে সুযোগ আসে, সেটিকে কাজে লাগাতে হবে। দ্বিতীয়ত, এমন একটি বোধ জাগাতে হবে যে ‘আমাকে দিয়ে হবে না, এটি যেন শিক্ষার্থীরা কোনোভাবেই না ভাবে। প্রত্যেকে যেন মনে করে তাঁকে দিয়ে হবে। আর লেগে থাকলে সাফল্য আসবেই।’

আবুল কাশেম বলেন, তাঁর ছেলে যখন বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় তৃতীয় হন, তখন তাঁর মা অর্থাৎ সন্তানের দাদি বেঁচে ছিলেন। তৃতীয় হওয়ার পর ছেলে নাফিস তাঁর দাদিকে গিয়ে বলেন, ‘দাদি, আমি তোমার ছেলেকে হারিয়ে দিয়েছি।’ কথাটি বলতে গিয়ে আবুল কাশেম কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। বলেন, ‘এতে আমার মা খুবই খুশি হয়েছিলেন। আর বাবা হিসেবে আমি সন্তানের কাছে এমন পরাজয়ই তো চাই।’

গত বছরের ডিসেম্বরে মেয়ে নাবিলা তাসনীমকে বিয়ে দিয়েছেন বুয়েটেরই সিএসই বিভাগের প্রভাষক শাদমান সাকিবের (ইউসুফ) সঙ্গে। তিনি আগামী জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে যাচ্ছেন। সঙ্গে যাচ্ছেন মেয়েও।

আবুল কাশেম মিয়া বলেন, ছেলেমেয়েরা তাঁদের পছন্দ অনুযায়ী পেশা বেছে নেবেন, এ নিয়ে তাঁদের কোনো চাওয়া নেই। ছেলেমেয়েদের ভালো মানুষ করতে পেরেছেন, এটাই বড় কথা। একই সঙ্গে পরিবারের সবাই বুয়েটে পড়তে পারায় সৃষ্টিকর্তার প্রতি তিনি কৃতজ্ঞ।

শিক্ষকতার পাশাপাশি আবুল কাশেম মিয়া সরকারের বিভিন্ন জাতীয় কমিটিতেও কাজ করেছেন। যেমন ন্যাশনাল আইডি কার্ডসংক্রান্ত কমিটিতে কাজ করেছেন। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগসংক্রান্ত বিডিরেন প্রকল্পের মূল নকশা প্রণয়ন কমিটিতেও যুক্ত ছিলেন। দুই বছর ধরে এমবিবিএস (মেডিকেলে) ভর্তি পরীক্ষায় কারিগরি সহায়তার কাজ করছেন। করোনাকালে পরীক্ষা ছাড়াই বিষয় ম্যাপিং করে ফল প্রকাশের কাজেও তিনি যুক্ত ছিলেন।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আবুল কাশেম মিয়া বলেন, দেশের শিক্ষার্থীরা কিন্তু মেধাবী ও বুদ্ধিমান। কিন্তু সুযোগ দিতে না পারায় তাঁরা পিছিয়ে পড়ছেন। তাই যখনই যে সুযোগ আসে, সেটিকে কাজে লাগাতে হবে। দ্বিতীয়ত, এমন একটি বোধ জাগাতে হবে যে ‘আমাকে দিয়ে হবে না, এটি যেন শিক্ষার্থীরা কোনোভাবেই না ভাবে। প্রত্যেকে যেন মনে করে তাঁকে দিয়ে হবে। আর লেগে থাকলে সাফল্য আসবেই।’