তেরো বছরের কারিগরি সংগ্রাম পেরিয়ে আমার আত্মবিশ্বাসের জয়গাথা

নাজমুন নাহার মুন্নিছবি: লেখক

প্রকৌশলবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা শেষ করার পর জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের সম্মুখীন হলাম—মেয়ে হয়ে কেন এ বিষয় নিয়ে পড়লাম? এরপর পেশাগত জীবনে প্রবেশের পর প্রশ্নের ধরন পাল্টে গেল—ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো চ্যালেঞ্জিং পেশায় কেন গেলাম? মেয়েরা কি ভারী যন্ত্রপাতি বা পাওয়ার প্ল্যান্টের কাজ সামলাতে পারবে?

এসব কথায় কান না দিয়ে আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম। স্বপ্নপূরণে আত্মবিশ্বাসী ছিলাম। আজ এক যুগের বেশি সময় ধরে এই পেশায় কাজ করার পর গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, মেধা ও পরিশ্রমের কোনো লিঙ্গভেদ নেই।

আমি যখন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে বিএসসি শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করি, তখন কামিন্স, এমডব্লিউএম বা গুয়াসকরের মতো বিশালাকার জেনারেটর আর জটিল সাবস্টেশনের রক্ষণাবেক্ষণ ছিল আমার নিত্যদিনের সঙ্গী। সে সময়ও অনেকেই বলতেন, জেনারেটর রুমের তেল-কালি আর যান্ত্রিক গোলযোগের মাঝে কাজ করা একজন নারীর জন্য অনেক কঠিন। কিন্তু আমার নিজের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস ছিল। পাওয়ার ফ্যাক্টর ক্যালকুলেশন থেকে শুরু করে জটিল ট্রাবলশুটিং—প্রতিটি ধাপে আমি নিজের যোগ্যতায় জায়গা করে নিয়েছি।

বিশালাকার জেনারেটর আর জটিল সাবস্টেশনের রক্ষণাবেক্ষণই নাজমুন নাহার মুন্নির নিত্যদিনের সঙ্গী
ছবি: লেখক

তেরো বছরের দীর্ঘ পথচলায় আমি শুধু একজন প্রকৌশলী হিসেবে নিজেকে গড়িনি, বরং একজন মা হিসেবেও সফলভাবে দায়িত্ব পালন করছি। আমার তিন বছরের আদরের সন্তান যখন আমাকে কর্মক্ষেত্রে দক্ষ হাতে কাজ করতে দেখে, আমি ভাবতে থাকি, সে জানুক যে তার মা একজন লড়াকু। সংসার, সন্তান এবং বিশালাকার পাওয়ার প্ল্যান্টের দায়িত্ব একসঙ্গে সামলানো সহজ ছিল না। কিন্তু গভীর রাতে যখন জরুরি রক্ষণাবেক্ষণের ডাক আসত, তখন ক্লান্তি ভুলে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার যে মানসিকতা—সেটিই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি।

যন্ত্রের গর্জনের মাঝে যখন আমি নিখুঁতভাবে সমস্যার সমাধান করি, তখন প্রাপ্তির যে আনন্দ পাই, সেটাই আমার তেরো বছরের পরিশ্রমের সার্থকতা। আমি বিশ্বাস করি, একজন নারীর প্রকৃত সৌন্দর্য আত্মবিশ্বাসে এবং তাঁর অর্জিত দক্ষতায়। আমার মতে, সমাজ আপনার জন্য কোনো সীমা নির্ধারণ করে দেওয়ার আগেই নিজের দক্ষতায় সেই সীমানাকে জয় করতে শেখা দরকার।