সরকারি স্বাস্থ্য খাতের যেসব সমস্যা গবেষণায় উঠে এসেছে, সেগুলো বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো বিষয় নয়। এগুলো দীর্ঘদিনের এবং চলমান। দুই বছর আগে করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণাতেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গিয়েছিল। স্বাস্থ্য খাতের সংকটের কারণ শুধু অর্থের অভাব নয়, এর চেয়ে বেশি দায়ী হলো ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা।
অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দেখা যায়, যন্ত্রপাতি আছে; কিন্তু তা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নেই। আবার কোথাও মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট বা অপারেটর থাকলেও যন্ত্রপাতি সচল নেই। ইমেজিং সেবার জন্য যেমন সনোগ্রাফার প্রয়োজন, তেমনি প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার জন্য প্রয়োজন মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট; কিন্তু এসব গুরুত্বপূর্ণ পদের বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে আছে।সোনো
যন্ত্রপাতি সচল না থাকার বড় কারণ হলো রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থার অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়করণ। ন্যাশনাল ইলেকট্রো-মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার এ দায়িত্ব পালন করলেও তাদের কার্যক্রম মূলত কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সীমিত। বিভাগীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত সক্ষমতা না থাকায় কোনো যন্ত্র নষ্ট হলে দ্রুত সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না। আবার স্থানীয় পর্যায়ে হাসপাতাল নিজস্ব উদ্যোগে মেরামত করতে চাইলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক যন্ত্র স্থায়ীভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ে।
ডায়াগনস্টিক সেবার ক্ষেত্রে মূল সমস্যা হলো প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। একটি কার্যকর ডায়াগনস্টিক সেবা চালু রাখতে চারটি বিষয় একসঙ্গে প্রয়োজন—যন্ত্রপাতি, দক্ষ জনবল, প্রয়োজনীয় রিএজেন্ট ও সরঞ্জাম এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ। এর যেকোনো একটি অনুপস্থিত থাকলে পুরো ব্যবস্থাই অকার্যকর হয়ে পড়ে।
সরকারের জনবল নিয়োগ পরিকল্পনাতেও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগের বিষয়টি গুরুত্ব পেলেও কারিগরি জনবল নিয়োগে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অথচ রোগীর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিশ্চিত করতে এসব কর্মী অপরিহার্য। জনগণের কাছে কতজন চিকিৎসক বা নার্স নিয়োগ হলো তা গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং প্রয়োজনের সময় তাঁরা সহজে ও হয়রানি ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ ।
ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থাতেও সমস্যা রয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এমএসআর ফান্ডের বড় অংশ এসেনসিয়াল ড্রাগ কোম্পানি (ইডিসিএল) থেকে ওষুধ কেনার জন্য নির্ধারিত থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির সরবরাহের সক্ষমতা সীমিত। সময়মতো ওষুধ সরবরাহ বা বিকল্প উৎস থেকে স্থানীয়ভাবে কেনার অনুমোদন না পাওয়ায় বরাদ্দ অর্থ অব্যবহৃত থেকে যায়।
গবেষণায় ২২টি হাসপাতাল অন্তর্ভুক্ত হলেও এর চিত্র সারা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সমস্যাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; বরং জনবল, যন্ত্রপাতি, বাজেট ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি একটি অপরটির সঙ্গে যুক্ত। তাই সমাধানও হতে হবে সমন্বিত। শুধু অবকাঠামো বা যন্ত্রপাতি বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। পুরো ব্যবস্থাপনার সংস্কার প্রয়োজন।
*সৈয়দ আব্দুল হামিদ: অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়