আগাম বার্তা ছাড়াই হতে পারে এ ধরনের বিপর্যয়: নীরা শ্রেষ্ঠা প্রধান

নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ হড়পা বান বা আকস্মিক বন্যা নিয়ে কথা বলেছেন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের (ইসিমডের) ওয়াটার অ্যান্ড ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন (ওয়াটার অ্যান্ড ডিআরআর) লিড নীরা শ্রেষ্ঠা প্রধান। তিনি এবারের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণ, পানি ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, আগাম সতর্কতাসহ নানা বিষয়ে নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন পার্থ শঙ্কর সাহা

প্রথম আলো:

হিমবাহের সম্মুখভাগ ভেঙে পড়াকে নেপালের এবারের বিপর্যয়ের কারণ বলা হচ্ছে। পানিব্যবস্থার দৃষ্টিকোণ থেকে এত বড় আকস্মিক বন্যায় ভাটির নদী ও জনপদের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়ে? হঠাৎ বিপুল পরিমাণ বরফ, পানি, পলি ও ধ্বংসাবশেষ নেমে এলে কি আকস্মিক বন্যার পানির পরিমাণ ও ধ্বংসক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে?

নীরা শ্রেষ্ঠা: হিমবাহের সম্মুখভাগ এত বড় আকারে ভেঙে পড়লে শুধু পানির পরিমাণই বাড়ে না; এর সঙ্গে বরফ ও ধ্বংসাবশেষও যুক্ত হয়। বরফ, পানি ও ধ্বংসাবশেষের এই মিশ্রণ ঘন হয়। দ্রুতগতির ও ভারী কাদার স্রোতের মতো এটি নদীপথ ধরে ভাটির দিকে নেমে আসে। সাধারণ বন্যার পানির তুলনায় এটি অনেক বেশি বিধ্বংসী। এর গতিপথে যা কিছু পড়ে, সবকিছুরই মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।

ভাটির জনপদের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ ধরনের বিপর্যয় কোনো পূর্বতথ্য বা আগাম বার্তা ছাড়াই হঠাৎ আঘাত হানতে পারে। ফলে অপ্রত্যাশিত এই দুর্যোগের জন্য মানুষ প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পান না।

প্রথম আলো:

হঠাৎ হিমবাহ–সংশ্লিষ্ট এ ধরনের দুর্যোগের ক্ষেত্রে হিমালয়ের নদীব্যবস্থা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ কেন? নেপালের এমন কোনো নির্দিষ্ট নদী অববাহিকা আছে কি, যেখানে একই ধরনের ঘটনা আরও বড় ক্ষয়ক্ষতির কারণ হতে পারে?

নীরা শ্রেষ্ঠা: নেপালের ভূপ্রকৃতি ও উচ্চতা বিবেচনা করলে বিষয়টি বোঝা যায়। দেশটির হিমালয় অঞ্চলের উচ্চতা ৩ হাজার থেকে ৮ হাজার ৮৪৮ মিটার, মধ্যবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলের উচ্চতা ১ হাজার থেকে ৩ হাজার মিটার, মহাভারত পর্বতশ্রেণির উচ্চতা ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিটার, চুরিয়া পাহাড়ের উচ্চতা ৬০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ মিটার এবং তরাই অঞ্চলের উচ্চতা ৬০ থেকে ৩০০ মিটার।

এর অর্থ হলো, নেপালের নদীগুলো অত্যন্ত উঁচু, শীতল ও হিমবাহে আবৃত এলাকা থেকে খাড়া ঢাল বেয়ে সরু উপত্যকার মধ্য দিয়ে নেমে আসে। এসব নদী উপত্যকার পাশেই মানুষের বসতি, সড়কসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট বা আইসিমোডের ২০২১ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭৭ সালের পর নেপালে হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা বা জিএলওএফের ২৬টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি ঘটনায় চীন ও নেপাল—দুই দেশেই আন্তসীমান্ত প্রভাব পড়েছে।

এই অঞ্চলে সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিমবাহ হ্রদ রয়েছে ৪৭টি। এর মধ্যে ২৫টি চীনে, ২১টি নেপালে এবং ১টি ভারতে। হ্রদগুলো নেপালজুড়ে কোশি, গান্ডাকি ও কার্নালি নদী অববাহিকায় অবস্থিত। এগুলো ভবিষ্যৎ বিপর্যয়ের সম্ভাব্য উৎস।

প্রথম আলো:

বর্তমানে ঝুঁকির কতটা হিমবাহের নিজস্ব পরিবর্তনের কারণে এবং কতটা ঝুঁকি সংবেদনশীল নদী উপত্যকায় বসতি, সড়ক, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও অন্যান্য অবকাঠামো বৃদ্ধির কারণে তৈরি হয়েছে?

নীরা শ্রেষ্ঠা: এ প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণে বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন। বিষয়টি স্থান ও প্রেক্ষাপটের ওপরও নির্ভরশীল।

প্রথম আলো:

আপনার বিবেচনায়, নেপালে বর্তমানে থাকা বন্যার পূর্বাভাস ও নদী পর্যবেক্ষণব্যবস্থা কি হঠাৎ হিমবাহ–সংশ্লিষ্ট বন্যা শনাক্ত করে ভাটির জনপদকে যথাসময়ে সতর্ক করতে সক্ষম? সক্ষম না হলে সবচেয়ে বড় ঘাটতিগুলো কী?

নীরা শ্রেষ্ঠা: বৃষ্টিপাতের কারণে সৃষ্ট বন্যার পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রে নেপাল অগ্রগতি অর্জন করেছে। প্রধান নদীগুলোর বিভিন্ন স্থানে জলবিদ্যা ও আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু হঠাৎ হিমবাহ–সংশ্লিষ্ট বন্যা শনাক্ত করার জন্য এসব ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়।

এ ধরনের বন্যা শনাক্ত করতে দুর্গম ও উঁচু পার্বত্য এলাকায় তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহের উপযোগী পর্যবেক্ষণকেন্দ্র প্রয়োজন। বরফের বিশাল অংশের নড়াচড়া শনাক্ত করার জন্যও প্রয়োজনীয় সেন্সর স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি আন্তসীমান্ত তথ্য আদান–প্রদানের একটি নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার।

প্রথম আলো:

হিমবাহের সম্মুখভাগ, উঁচু এলাকার হ্রদ, নদীর প্রবাহ ও আবহাওয়া তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হলে কি এ ধরনের ঘটনার আগাম সতর্কতা দেওয়া সম্ভব? নেপালের কোন প্রযুক্তি বা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত?

নীরা শ্রেষ্ঠা: হিমবাহ ও নদীর প্রবাহ তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা গেলে এ ধরনের ঘটনার আগাম সতর্কতা দিতে অবশ্যই সহায়তা করবে।

এ জন্য কয়েক ধরনের প্রযুক্তি কার্যকর হতে পারে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে: উপগ্রহের মাধ্যমে হিমবাহ ও হিমবাহ হ্রদ পর্যবেক্ষণ; নদীর প্রবাহ ও পানির ঘোলাভাব পরিমাপের স্বয়ংক্রিয় সেন্সর; ভূমিকম্পের কারণে সৃষ্ট ভূমিধস ও বরফধস শনাক্ত করার সিসমিক সেন্সর।

এর পাশাপাশি ইসিমডের জনগোষ্ঠীভিত্তিক বন্যার আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। এ ব্যবস্থায় সহজ ও কম খরচের পানির উচ্চতা পরিমাপক সেন্সর ব্যবহার করা হয়। পানির উচ্চতা বাড়লে মোবাইল ফোন বা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট গ্রামের মানুষকে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। এতে স্থানীয় মানুষ দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য কিছুটা বেশি সময় পান।

এসব প্রযুক্তি ও ব্যবস্থার সমন্বিত ব্যবহার নেপালে কার্যকর আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। এর মাধ্যমে ভাটির জনপদের মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষা করা সম্ভব হবে।

প্রথম আলো:

সাম্প্রতিক দুর্যোগে নেপাল–চীন সীমান্তের দুই পাশের এলাকাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ধরনের আন্তসীমান্ত বিপদ পর্যবেক্ষণ ও মোকাবিলায় নেপাল, চীন, ভুটান ও ভারতের মধ্যে পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কী ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন?

নীরা শ্রেষ্ঠা: আমার মতে, সব ক্ষেত্রে নদীর প্রবাহের সুনির্দিষ্ট উপাত্ত আদান–প্রদানের প্রয়োজন না–ও হতে পারে। এ ধরনের উপাত্ত ভাগাভাগি করা কঠিন হতে পারে। কিন্তু উজানে পানির উচ্চতা বাড়ছে—এ তথ্যটি অন্তত ভাটির দেশ ও জনপদকে জানানো যেতে পারে।

উজানের পানির উচ্চতা বৃদ্ধির তথ্য সময়মতো পাওয়া গেলে ভাটির জনপদের মানুষ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারবেন। এতে মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষা করা সম্ভব হবে।