ঘরে মা নাচছেন আপন মনে, মেয়ের করা ভিডিও ভাইরাল; এই আনন্দের পেছনে আছে বেদনার কষ্টগাথা
বাসায় কলিং বেল বাজছে। মাসুমা আনোয়ার গান বাজিয়ে রান্নাঘরে আপন মনে নেচে চলছেন। কলিং বেলের শব্দ শুনে মেয়ে ফাতিহা বিনতে আফছার দরজা খুলতে যাওয়ার সময় তা দেখেন, গোপনে ভিডিও করে রাখেন। একসময় মাসুমা বুঝতে পারেন যে মেয়ে তাঁর নাচের ভিডিও করছেন। ছোট এই ভিডিওটি নেট দুনিয়ায় অনেককেই এখন নিজেদের মাকে নিয়ে নতুন করে ভাবনার খোরাক জোগাচ্ছে।
‘সিঙ্গেল মাদার’ মাসুমার নিজের জীবন নিজের মতো করে যাপন করা হয়ে ওঠেনি। অনেক ঝড় পাড়ি দিয়ে দুই সন্তানকে বড় করতে করতে দেখেন, জীবনের ৪৮টি বছর এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে। ফাতিহা তাই ভিডিও করার সময়ই ভাবছিলেন, তাঁর মা যে জীবন উপভোগ করতে পারেননি, তা যেন এখন করতে পারেন।
এই মা-মেয়ে থাকেন চট্টগ্রামে। ২২ জানুয়ারি সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় মেয়ে ফাতিহা তাঁর ফেসবুকে মায়ের নাচের ভিডিওটি পোস্ট করেন। আজ শনিবার বিকেল সাড়ে ৫টা নাগাদ ওই পোস্টে প্রায় ২৬ হাজার রিঅ্যাকশন, পোস্টটি শেয়ার হয়েছে ১ হাজারের বেশিবার, দেড় হাজার মন্তব্যও জমা পড়েছে পোস্টের নিচে।
মাসুমা আনোয়ার কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ছিলেন। পরে চট্টগ্রাম নেভি হাসপাতালে কাজ করেন। বর্তমানে দুই ছেলে–মেয়েই সংসারের হাল ধরেছেন। মেয়ে ফাতিহা চট্টগ্রামে ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে আইন বিভাগে (ষষ্ঠ সেমিস্টার) পড়ছেন। এর পাশাপাশি তিনি অনলাইন উদ্যোক্তা, কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং নাচের শিক্ষক। ফাতিহার ভাই আলিফ ইবনে আফছার পোল্যান্ডে স্নাতকে পড়ছেন।
আমার জীবনে এত স্ট্রাগল যে তা বলে শেষ করা যাবে না। শ্বশুরবাড়ির নির্যাতন, কোনটা রেখে কোনটা বলব? আমাকে মেরে ফেলার জন্য গলা টিপে ধরার পর গলার স্বরটাও পাল্টে গেছে। সেসব দিনের কথা এখন আর মনেও করতে চাই না।
‘ভাইরাল হয়ে লজ্জা পাচ্ছি’
নাচের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর মুঠোফোনে কথা হলো মাসুমা আনোয়ার ও ফাতিহার সঙ্গে। মেয়ে এবারই যে প্রথম গোপনে করা মায়ের ভিডিও ফেসবুকে দিয়েছেন, তা নয়। এর আগেও মাকে সেজেগুজে ছবি তোলার কথা বলে ভিডিও করেছেন। পরে মাসুমা তা বুঝতেও পারেন। মা ও মেয়ের একসঙ্গে নাচের ভিডিও ফেসবুকে আছেও।
মাসুমা আনোয়ার বলেন, ‘মেয়ে গোপনে ভিডিও করে। ভিডিও শেষে আমাকে যখন ডাক দেয়, তখন লজ্জা পাই। গোপনে ভিডিও করলেও ফেসবুকে পোস্ট করার আগে মেয়ে জানিয়েছিল।’
‘ভিডিও ভাইরাল’ কথাটি অচেনা নয় মাসুমার কাছে। তবে নিজের ক্ষেত্রে হবে, তা ভাবেননি কখনো। তিনি বলেন, ‘চারপাশের মানুষ কতভাবে ভাইরাল হয়, শুধু ভাবতাম ভাইরাল হলে কেমন লাগে। এবার সত্যি সত্যি ভাইরাল হয়ে গেছি। এখন বেশ লজ্জা পাচ্ছি। আবার মেয়ের পোস্টে মানুষের মন্তব্যগুলো পড়ে ভালোও লাগছে। সবাই সুন্দর সুন্দর কথা লিখছেন।’
পেরিয়ে আসা কষ্টগাথা
মাসুমা আনোয়ারের ডাকনাম খেলনা, এটি রেখেছিলেন তাঁর নানি। নামের মতো জীবনও যে তাকে নিয়ে খেলেবে, তা হয়তো স্বজনেরাও ভাবেননি।
১৬ বছর বয়সে ভালোবেসে পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন মাসুমা। পড়াশোনা চালিয়ে যান, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রিও নেন। ২০০৮ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তাঁর স্বামী কাউকে কিছু না জানিয়ে সংসার ছেড়ে চলে যান। তারপর অনেক খুঁজেও তাঁকে আর পাওয়া যায়নি। একপর্যায়ে তাকে মৃতই ধরে নেন মাসুমা এবং তাঁর ছেলেমেয়েরা; যদিও তিনি বেঁচেই আছেন বলে পরে জানতে পারেন।
স্বামী চলে যাওয়ার পর মানসিক চাপ রোগী বানিয়ে ফেলেছিল মাসুমাকে। ঘুমের ওষুধ ছাড়া ঘুমাতে পারেন না। এমনও সময় গেছে যে ঘুমের ওষুধ খাওয়ার পরও একটানা কয়েক দিন ঘুমাতে পারেননি। তখন হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। কৃত্রিম অক্সিজেন না নিলে দমবন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। ২০১১ সালে শারীরিক ও মানসিক অবস্থা এতটাই খারাপ হয়েছিল যে চিকিৎসকেরা বাঁচার আশাই ছেড়ে দিয়েছিলেন। সেই অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ান এই নারী।
মাসুমা আনোয়ার বলেন, ‘আমার জীবনে এত স্ট্রাগল যে তা বলে শেষ করা যাবে না। শ্বশুরবাড়ির নির্যাতন, কোনটা রেখে কোনটা বলব? আমাকে মেরে ফেলার জন্য গলা টিপে ধরার পর গলার স্বরটাও পাল্টে গেছে। সেসব দিনের কথা এখন আর মনেও করতে চাই না।’
স্বামী ছেড়ে চলে গেছেন, তাতে মানসিক রোগী হয়ে পড়েন। তারপরও হার মানেননি মাসুমা আনোয়ার। পারিবারিক চাপ সামলে নিয়েই দুই ছেলে–মেয়েকে বড় করেছেন।
জানতে চাইলে নিজের যাপিত জীবনের কষ্টগাথা তুলে ধরে এই নারী বলেন, ‘কয়েকটা টাকার জন্য আমি বাড়ি বাড়ি গিয়ে সন্তান প্রসব করানোর কাজও করেছি। সংগ্রাম করেই ফ্ল্যাট কিনেছি। স্বামী চলে যাওয়ার পর অনেকেই বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছেন। ছেলে-মেয়েদের কথা ভেবে আর বিয়েও করিনি।’
বিয়ের পর যখন স্বামী ছিলেন, তখনও শ্বশুরবাড়িতে কেবল রাত ১২টার পর থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত পড়াশোনার অনুমতি ছিল মাসুমার। তবে পড়াশোনাটা ছাড়েননি, চিকিৎসক হতে পেরেছিলেন বলেই ছেলে–মেয়েকে বড় করতে পেরেছেন বলে মনে করেন তিনি।
মাসুমা বলেন, ‘স্বামী যখন চলে যায়, তখন মেয়ের বয়স মাত্র ৭ বছর। ছেলে আরও ছোট। আমি চেষ্টা করেছি ওদের মানুষ করতে। শিশু একাডেমিতে ভর্তি, গিটার, তবলা, নাচ শেখানোসহ সবকিছু করার চেষ্টা করেছি।’
নিজের কিছু গয়না বিক্রি আর ঋণ করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছেন। এখন মেয়ে আর ছেলেই সংসারের দায়িত্ব নিয়েছে বলে তিনি জানান।
নিজের পছন্দে বিয়ে করায় বাবার বাড়ির আত্মীয়দেরও কাছে পাননি মাসুমা আনোয়ার। তিনি বলেন, ‘স্বামীর চলে যাওয়া, আমার মানসিক অবস্থা খারাপ হয়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে একসময় নিজের বাড়ির মানুষেরাও আমাকে এড়িয়ে চলা শুরু করেন। অন্যদের কাছে আমার পরিচয় দিতে লজ্জা পেতেন। এখন আবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে।’
মায়ের জীবনের অপূর্ণ শখগুলো পূরণ করার চেষ্টা করি। মা দুই হাতে মেহেদি দিতে ভালোবাসেন। এখন অনেক সাজগোজ করে ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করেন। মা-মেয়ে মিলে রান্না করি।
আনন্দ নিয়ে বাঁচা
এত দিন নিরুদ্দেশ হলেও ছেলে বিদেশ যাওয়ার পর স্বামী যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন বলে জানান মাসুমা। তবে তাতে সাড়া দেননি তিনি। কথাটি বলার সময়ও স্বামীর পরিবর্তে ব্যবহার করেছেন ‘ওই ব্যক্তি’ শব্দবন্ধটি।
মেয়ে ফাতিহা বলেন, তাঁদের দুই ভাই–বোনের নামের সঙ্গে লাগানো ‘আফছার’ শব্দটি ছাড়া তাঁদের জীবনে বাবার আর কোনো অস্তিত্ব নেই। মায়ের ফেসবুকেও তিনি ‘উইডো’ বা বিধবা লিখেছেন। বিভিন্ন কাগজেও বাবাকে ‘মৃত’ হিসেবেই উল্লেখ করেছেন, যাতে কোনোভাবেই ওই ব্যক্তি এসে কোনো দাবি করতে না পারেন।
মা–মেয়ে–ছেলে এখন একজন আরেকজনের জন্য মনের আনন্দে বাঁচেন বলে জানান ফাতিহা। তাঁদের ফেসবুকের ওয়ালে এই সব দুঃখের গল্পের কোনো ছোঁয়া নেই।
মাসুমা আনোয়ার বলেন, ‘আমরা তিনজন সব সময় ভালোভাবে বাঁচার চেষ্টা করি। আমি মানসিক রোগী হলেও ছেলে–মেয়ের বন্ধুরা আমার বাসার নাম দিয়েছে মানসিক রোগ নিরাময় কেন্দ্র। অত্যাচারের পর আমার গলার স্বর পাল্টে পুরুষালি হওয়ায় ছেলে–মেয়েদের বন্ধুদের স্কুল–কলেজে প্রয়োজনে কতবার যে বাবা সেজে মোবাইলে কথা বলে তাদের বিপদ থেকে উদ্ধার করেছি, তার হিসাব নেই।’
দুই সন্তানকে নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময় সামাজিকভাবে যতটা হেয় হওয়ার কথা ছিল, তা হননি বলে জানান মাসুমা। তবে নিজের ও শ্বশুরবাড়ির লোকদের কাছে হেয় হয়েছেন বলে বেদনাভরে জানান তিনি।
৪৮ বছর বয়সী মাসুমা আনোয়ার এখন নিজের আনন্দে সাজগোজ করেন। কখনো সেভাবে নাচ বা গান শেখার সুযোগ না পেলেও ছোটবেলায় স্কুলের অনুষ্ঠানে নাচতেন। পরিবারের কারও বিয়ে থাকলে সে অনুষ্ঠানে নাচতেন, গান গাইতেন। এখন নতুন করে গিটার শিখছেন বলে হাসতে হাসতে জানালেন।
মেয়ে ফাতিহা বললেন, ‘মায়ের জীবনের অপূর্ণ শখগুলো পূরণ করার চেষ্টা করি। মা দুই হাতে মেহেদি দিতে ভালোবাসেন। এখন অনেক সাজগোজ করে ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করেন। মা–মেয়ে মিলে রান্না করি।’
মাসুমা আনোয়ারের মনের আনন্দে নাচের ভিডিও দেখে অনেকে নতুনভাবে নিজের মাকে নিয়ে চিন্তা করছেন বলেও জানিয়েছেন ফাতিহার ভাইরাল হওয়া পোস্টে। কেউ কেউ বলেছেন, অনেকেই মায়ের শখগুলোর কথা সেভাবে মাথায় রাখেন না। অথচ একজন মা নানাভাবে পিষ্ট হয়ে এক সময় নিজের শখগুলোকেই হারিয়ে ফেলেন।