নতুন আইনে খর্ব হবে মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা, খসড়া দেখে শঙ্কা টিআইবির

অন্তর্বর্তী সরকার আমলে করা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন বাতিলের পর বিএনপি সরকার এখন যে আইন করতে যাচ্ছে, তাতে কমিশনের স্বাধীনতা খর্ব হওয়া আশঙ্কা দেখছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির অভিযোগ, নতুন আইনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে কমিশনকে সরকার ও সংশ্লিষ্ট বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল করা হচ্ছে।

২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন পরিবর্তন করে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে অধ্যাদেশ জারি করে। গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার পর ওই অধ্যাদেশ বাতিল করে। এরপর এখন নতুন আইনের একটি খসড়া তৈরি করেছে।

এই খসড়া নিয়ে টিআইবি উদ্বেগ ও হতাশা প্রকাশ করে আজ মঙ্গলবার বিবৃতি দিয়েছে। এতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি হওয়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশে কমিশনকে গুম, খুনসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সরাসরি তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশ করার সুযোগও ছিল। কিন্তু নতুন খসড়া আইনে ২০০৯ সালের আইনের ১৮ ধারা পুনর্বহালের মাধ্যমে সেই ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে।

টিআইবি বলেছে, মানবাধিকার কমিশনে কমিশনার নিয়োগে সরকারি দলের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার মতো বিধানও রাখা হয়েছে। এতে মানবাধিকার কমিশন আবারও সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নতুন খসড়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে কমিশনকে সরকার বা বাহিনী প্রধানের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভরশীল করা হয়েছে। তাঁর দাবি, ২০০৯ সালের আইনের এই দুর্বলতার কারণেই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে কখনো ‘এ’ ক্যাটাগরির মর্যাদা পায়নি।

আরও পড়ুন

ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, অতীতে গুম-খুনসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের যেসব অভিযোগ উঠেছে, তার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাংশের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল। ফলে বর্তমান খসড়ায় ওই বিধান বহাল থাকলে তা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সুরক্ষা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।

খসড়া আইনের ১৩ ধারা নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে টিআইবি। সংস্থাটির দাবি, কমিশনকে স্বপ্রণোদিত হয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তদন্তের এখতিয়ার দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া গোয়েন্দা সংস্থা ও সেনাবাহিনীর সম্ভাব্য আটকস্থল অনুসন্ধান, পরিদর্শন ও তদন্তের যে সুযোগ অধ্যাদেশে ছিল, তা বাদ দেওয়া হয়েছে।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিগত কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে দেশবাসী এবং বর্তমান সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা–কর্মীরা যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রতিফলন খসড়া আইনে দেখা যাচ্ছে না।

কমিশনার নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে টিআইবি। খসড়া আইনে বাছাই কমিটিতে স্পিকার, আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারদলীয় একজন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে সদস্য হিসেবে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে কমিশনের ওপর সরকারের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি তৈরি হবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

আরও পড়ুন

টিআইবি আরও বলেছে, অধ্যাদেশে থাকা ‘সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের আওতাধীন হইবে না’—এই বাক্য খসড়া আইন থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে একদিকে কমিশনকে স্বাধীন সংস্থা বলা হলেও, অন্যদিকে তার স্বাধীনতা নিশ্চিতকারী ভাষ্য বাদ দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

এ ছাড়া কমিশনকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে অধ্যাদেশে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও নারীদের কমিশনার হিসেবে অন্তর্ভুক্তির বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছিল। কিন্তু খসড়ায় ‘যোগ্য প্রার্থী’ পাওয়ার শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। টিআইবির আশঙ্কা, এতে কমিশন ‘পুরুষতান্ত্রিক’ ও ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতান্ত্রিক’ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে।

কমিশনের মোট জনবলের ৩০ শতাংশ প্রেষণে নিয়োগ এবং চাকরিরত সরকারি কর্মকর্তাকে ছুটিতে কমিশনার হিসেবে নিয়োগের সুযোগ রাখার সমালোচনাও করেছে সংস্থাটি। টিআইবির মতে, এতে কমিশন আবারও আমলাতান্ত্রিক ও সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

টিআইবি খসড়া আইনের বিতর্কিত ধারাগুলো পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, নির্বাচনী ইশতেহারে মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র অনুযায়ী মানবাধিকার সুরক্ষার যে অঙ্গীকার সরকার করেছিল, তা বাস্তবায়নে একটি কার্যকর ও স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।