বিশ্ব থাইরয়েড সচেতনতা মাস উপলক্ষে ঢাকায় আন্তর্জাতিক সায়েন্টিফিক সেমিনার অনুষ্ঠিত
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি তিনজনে একজন কোনো না কোনো থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্ত হলেও প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষই তা জানেন না। এ বাস্তবতাকে সামনে রেখে বিশ্ব থাইরয়েড সচেতনতা মাস জানুয়ারি ২০২৬ উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের ক্রিস্টাল বলরুমে এ আন্তর্জাতিক সায়েন্টিফিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারের আয়োজন করে অ্যাসোসিয়েশন অব ক্লিনিক্যাল এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট অ্যান্ড ডায়াবেটোলজিস্ট অব বাংলাদেশ (এসেডবি)। এতে দেশ ও বিদেশের খ্যাতনামা এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট, চিকিৎসক, গবেষক ও স্বাস্থ্য খাতের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানের সায়েন্টিফিক পার্টনার ছিল রেনাটা পিএলসি।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন এসেডবির প্রেসিডেন্ট ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. ফরিদ উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘অনেকেই মনে করেন থাইরয়েড রোগের উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে হয়, কিন্তু বাস্তবতা হলো বর্তমানে বাংলাদেশেই থাইরয়েড রোগের বিশ্বমানের চিকিৎসা সম্ভব। আধুনিক প্রযুক্তি, অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও সমন্বিত চিকিৎসাব্যবস্থার মাধ্যমে আমরা জটিল থাইরয়েড সমস্যারও সফল চিকিৎসা দিচ্ছি। বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে থাইরয়েড পরীক্ষা ও সময়মতো চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, এতে শুধু মায়ের নয়, অনাগত শিশুর সুস্থ ভবিষ্যৎও নির্ভর করে।’
সেমিনারে থাইরয়েড রোগের বর্তমান চিত্র, বাংলাদেশে রোগের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা, আধুনিক ও বিশ্বমানের চিকিৎসাপদ্ধতি, রোগনির্ণয়ে নতুন প্রযুক্তি ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। বক্তারা বলেন, থাইরয়েড রোগ অনেক ক্ষেত্রেই নীরবে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্ষতি করে এবং সময়মতো শনাক্ত না হলে জটিলতা মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। তাই নিয়মিত স্ক্রিনিং, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগনির্ণয় ও সময়োপযোগী চিকিৎসা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
সেমিনারের প্যানেল অব এক্সপার্টস হিসেবে বক্তব্য দেন এসেডবির ভাইস প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক মীর মোশাররফ হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আনোয়ারুল কবির, অধ্যাপক মো. রুহুল আমিন ও একাডেমিক অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড রিসার্চ সেক্রেটারি অধ্যাপক শারমিন জাহান।
এ ছাড়া বৈজ্ঞানিক অধিবেশনে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এসেডবির সেক্রেটারি জেনারেল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ইন্দ্রজিৎ প্রসাদ ও ফিলিপাইন সোসাইটি অব এন্ডোক্রাইনোলজি, ডায়াবেটিস অ্যান্ড মেটাবলিজমের সাবেক প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক লেইলানি বি মারকাদো–আসিস।
অধ্যাপক ইন্দ্রজিৎ প্রসাদ বলেন, ‘থাইরয়েড রোগ অনেক সময় নীরবে শরীরে ক্ষতি করে। ফলে রোগীরা বুঝতেই পারেন না কখন সমস্যাটি জটিল হয়ে উঠছে। নিয়মিত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করলে থাইরয়েডজনিত জটিলতা সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। জাতীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে এ ধরনের বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী।’
রেনাটা পিএলসির মার্কেটিং প্রধান (হরমোন অ্যান্ড ডার্মা পোর্টফোলিও) মো. খায়রুল ইসলাম তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের অকুণ্ঠ প্রশংসা করেন। কারণ, দেশে যখন থাইরয়েড সমস্যার কোনো ওষুধ ছিল না, তখন এ দেশের বিজ্ঞানীরাই তা তৈরি করতে সহায়তা করেন। পরবর্তী সময়ে বায়োইকুইভ্যালেন্ট মানে উন্নীত করার ফলে থাইরয়েডের বিশ্বমানের ওষুধ অনেক সস্তায় এখন দেশেই উৎপাদন ও বাজারজাত হচ্ছে। তিনি পার্শ্ববর্তী দেশের উদাহরণ টেনে জানান, যেখানে ভারতে থাইরয়েডের ওষুধের (লিভোথাইরক্সিন) ব্র্যান্ডের অবস্থান পঞ্চম, সেখানে বাংলাদেশে তার অবস্থান ১৩৭তম। অর্থাৎ এই রোগের চিকিৎসা ও ওষুধ বাংলাদেশের অনেকের কাছেই পৌঁছাচ্ছে না। এ বিষয়ে সম্মানিত চিকিৎসকদের এগিয়ে আসার জন্য তিনি অনুরোধ জানান।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন মোহাম্মদ আতিকুর রহমান এবং পুরো সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন মো. মাজহারুল ইসলাম সোহেল। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন অধ্যাপক এ কে এম আমিনুল হক।