‘গোসল–টয়লেটে দুই মিনিটের বেশি নিলে সারা দিন পেটাত, খাবার দিত না’

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালফাইল ছবি: প্রথম আলো

গুম থাকা অবস্থায় মো. নূরে আলমকে দাঁত ব্রাশ, গোসল, টয়লেট ও ওজু করার জন্য সর্বোচ্চ দুই মিনিট সময় দেওয়া হতো। একটু সময় বেশি লাগলে সারা দিন তাঁকে পেটানো হতো। কোনো খাবার দেওয়া হতো না।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ আজ বুধবার এমন জবানবন্দি দিয়েছেন গুমের শিকার নূরে আলম।

ডিজিএফআইয়ের জেআইসি (জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার) সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সপ্তম সাক্ষী হিসেবে তিনি আজ জবানবন্দি দেন।

২০১৬ সালে নীলফামারী সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগ শাখা ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্ব পালনের সময় গুমের শিকার হন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন নূরে আলম। তখন তিনি নিয়মিত ফেসবুকে বিএনপির পক্ষে এবং ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ও ভারতের বিরুদ্ধে লেখালেখি করতেন বলেও উল্লেখ করেন।

২০১৬ সালের ১২ এপ্রিল রাতে নীলফামারীর বাড়ি থেকে ৩০-৩৫ জন লোক মাইক্রোবাসে তাঁকে তুলে আনে উল্লেখ করে জবানবন্দিতে নূরে আলম বলেন, একটি কক্ষে রাখার পর তাঁর হ্যান্ডকাফ ও চোখের বাঁধন খুলে দেওয়া হয়। সেই কক্ষে কোনো জানালা ছিল না। সেখানে একটি চৌকি, একটি বালিশ, একটি কোরআন শরিফ, একটি জায়নামাজ এবং প্রস্রাবের একটি পট দেখতে পান। সেই কক্ষটি ছিল প্রায় ৮ ফুট বাই ১১ ফুট। একটি বৈদ্যুতিক বাল্ব ২৪ ঘণ্টা জ্বালানো থাকত।

সেখানে থাকা অবস্থায় কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর খবর প্রচারিত হলে মাইকে ‘পূর্ব কাফরুল নিবাসী’ শব্দটি শুনতে পেতেন বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন নূরে আলম। এতে তিনি বুঝতে পারেন, সেনানিবাসের কোথাও গুম আছেন।

গুম হওয়ার প্রথম দিন বিকেলে কক্ষে দুজন ব্যক্তি প্রবেশ করে তাঁর হাতে হ্যান্ডকাফ লাগান ও চোখ বেঁধে ফেলেন উল্লেখ করে জবানবন্দিতে নূরে আলম বলেন, কক্ষ থেকে বের করে কিছুদূর নিয়ে তাঁকে টুলের ওপর বসান। সেখানে তাঁর রক্তচাপ ও তাপমাত্রা মাপেন এবং তাঁর আর কোনো শারীরিক সমস্যা রয়েছে কি না, তা জিজ্ঞাসা করেন। টুল থেকে তুলে তাঁকে অন্য একটি কক্ষে নিয়ে আরেকটি টুলে বসান। সেখানে এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, কেন তিনি বিএনপির রাজনীতি করেন, কেন হাসিনা সরকার ও ভারতের বিরুদ্ধে লেখালেখি করেন। তাঁকে তুলে আনার কারণ জানতে ওই ব্যক্তি রেগে যান এবং তাঁকে বলেন, ‘রেললাইনের পাশে, নদীনালার পাশে এবং বস্তাবন্দী যেসব লাশ পাওয়া যায়, তা আমরাই করি। তোকে যেভাবে বলব, সেভাবেই থাকবি, যেভাবে বলব, সেভাবেই চলবি, তাহলে ভালো থাকবি এবং যেভাবে বাসা থেকে তুলে নিয়ে আসছি, সেভাবে বাসায় রেখে আসব।’ এরপর সেই ব্যক্তি তাঁর দুই হাঁটু ও ঊরুতে বেধড়ক পেটান।

পরে একজন নারী তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন উল্লেখ করে নূরে আলম বলেন, তাঁর কাছেও তুলে আনার কারণ জানতে চান তিনি। এই প্রশ্নে তিনিও অত্যন্ত রাগান্বিত হন। হ্যান্ডকাফ খুলে ফেলে দড়ি দিয়ে তাঁর হাত বাঁধেন। কোনো একটি আংটার সঙ্গে রশি বেঁধে তাঁকে ঝুলানো হয়। তাঁর কোমর থেকে পা পর্যন্ত বেধড়ক পেটান। পরে তাঁর হাতে কয়েকটি কাগজ ও কলম দিয়ে বলা হয়, ‘যাদের সাথে রাজনীতি করেছিস, তাদের নাম লিখে নিয়ে আয়।’

এখানে বন্দী থাকায় অবস্থায় তাঁকে পাঁচ থেকে ছয়বার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। নূরে আলম বলেন, তাঁর কক্ষের ভেতর সিসিটিভি লাগানো ছিল। সেখানে থাকা অবস্থায় প্রথম কয়েক দিন তাঁকে ঘুমাতে দিতেন না। ঘুমালে লোহার দরজায় প্রচণ্ড শব্দ করা হতো। সেখানে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিরা সব সময় মাস্ক পরে দায়িত্ব পালন করতেন, যাতে তাঁদের চেনা না যায়।

১৪ থেকে ১৫ দিন পর তাঁকে একই ভবনের আরেকটি কক্ষে নেওয়া হয় এবং সেখান থেকে ২০১৬ সালের ২৬ জুন তাঁকে অন্য জায়গায় নেওয়া হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন নূরে আলম। তিনি বলেন, নতুন জায়গায় তাঁর হাত দুটি দরজার লোহার শিকের বাইরে নিয়ে হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে দেওয়া হয়। এভাবে তাঁকে প্রায় ৪০ দিন রাখা হয়। কোনো কথা বললে তাঁর দুই হাতে এবং কাঁধে প্রচণ্ড আঘাত করা হতো। সেখানে থাকা অবস্থায় তিনি খুবই অসুস্থ হয়ে যান, কিন্তু তাঁকে চিকিৎসা দেওয়া হয়নি।

সব সময় হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে রাখার কারণে তাঁর হাতে ঘা হয়ে যায় এবং ঘা থেকে রক্ত পড়ত উল্লেখ করে জবানবন্দিতে নূরে আলম বলেন, চোখ ও কান সব সময় বাঁধা থাকার কারণে তাঁর কানে ঘা হয়েছিল। একপর্যায়ে তাঁর সারা শরীরে ঘামাচি হয়। ঘামাচির কারণে তিনি লোহার শিকের সঙ্গে তাঁর পিঠ ঘষাঘষি করতেন। এতে তাঁর পিঠে ক্ষতের সৃষ্টি হয়।

জেআইসিতে গুম করে রাখার এই মামলায় ১৩ আসামির মধ্যে ৩ জন ঢাকা সেনানিবাসের সাব–জেলে আছেন। তাঁরা হলেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক তিন পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী।

এ মামলার অন্য ১০ আসামি পলাতক। তাঁদের মধ্যে আছেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পাঁচ মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী ও মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক।

পলাতক আসামিদের মধ্যে আরও আছেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মখছুরুল হক।

এ ছাড়া পলাতক আছেন আসামি গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক।