মাদারীপুর থেকে ঢাকা, ৪ হাসপাতাল ঘুরেও বাঁচানো গেল না সোহা মনিকে
মাথায় ছোট ছোট চুল। রঙিন রাবার ব্যান্ড দিয়ে ওই চুলেই কয়েকটি ঝুঁটি করা। বিছানায় বসে ১০ মাস বয়সী সোহা মনি হাসছে। এ ছবি তোলার কয়েক দিন পরের আরেকটি ছবি ফেসবুকে ঘুরছে। গোলাপি রঙের নকশিকাঁথায় সোহার মুখসহ সারা শরীর মুড়িয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরছেন স্বজনেরা। হাম ও নিউমোনিয়ায় ১০ এপ্রিল মারা যায় সে।
চার হাসপাতাল ঘুরে রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল অ্যান্ড ইনস্টিটিউটের আরআইসিইউতে (শ্বাসতন্ত্রের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) মারা যায় সোহা মনি। গুরুতর ফুসফুস বা শ্বাসকষ্টের রোগীদের ভেন্টিলেটরসহ ফুসফুস কার্যক্ষম রাখার বিশেষ সুবিধা আছে এ কেন্দ্রে।
কিন্তু প্রথমবার এখানে ভর্তির সুযোগ হয়নি। স্বজনেরা এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না হাসিখুশি বাচ্চাটি আর নেই। মাদারীপুর সদরের খোয়াজপুর ইউনিয়নের পখিরা গ্রামে নিয়ে শিশুটিকে দাফন করা হয়।
সোহা মনির টিকার কার্ডে বিসিজিসহ অন্য টিকাগুলো কবে দেওয়া হয়েছিল, তা লেখা রয়েছে। ৯ মাস বয়সে হাম ও রুবেলার জন্য এমআর টিকার ঘরটি খালি রয়েছে। সোহার মা লিমা আক্তার বললেন, ‘মেয়েরে শুধু হামের টিকাটা দিতে পারি নাই। এলাকার টিকাকেন্দ্রে তিনবার মেয়েরে নিয়ে গেছি। কেন্দ্র থেকে প্রতিবারই বলেছে, সরকারি টিকা নাকি বন্ধ আছে। পরে মেয়েরে নিয়ে সদর হাসপাতালে যাই। ওই খানে টিকা ছিল, কিন্তু বলছে নির্দিষ্ট টিকাকেন্দ্র থেকেই টিকা নিতে হবে, তারা দিতে পারবে না। এই করতে করতে মেয়ে তো হামে মরেই গেল।’
গতকাল রোববার সোহার মা লিমা আক্তার ও চাচা রাশেদুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয়। লিমা জানান, মেয়ের চিকিৎসায় অনেক টাকা খরচ হয়েছে, তিন লাখের বেশি। মেয়ের চাচা দিয়েছেন। জমানো কিছু টাকা ছিল। আর দুটো গরু, নিজের গয়নাও বিক্রি করেছেন। চারটি হাসপাতালে মেয়েকে নিয়ে ছোটাছুটির পরও মেয়েকে বাঁচাতে পারলেন না মা। বাড়ি ফিরলেন মেয়ের লাশ নিয়ে।
লিমা আক্তারের আক্ষেপ, ‘মেয়ের একটু জ্বর হলেও শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে নিতাম। মেয়েটার বড় কোনো অসুখও ছিল না। হামের টিকাটা যদি দিতে পারতাম, মেয়েটা আমার কোলেই থাকত।’
মেয়েরে শুধু হামের টিকাটা দিতে পারি নাই। এলাকার টিকাকেন্দ্রে তিনবার মেয়েরে নিয়ে গেছি। কেন্দ্র থেকে প্রতিবারই বলেছে, সরকারি টিকা নাকি বন্ধ আছে। পরে মেয়েরে নিয়ে সদর হাসপাতালে যাই। ওই খানে টিকা ছিল, কিন্তু বলছে নির্দিষ্ট টিকাকেন্দ্র থেকেই টিকা নিতে হবে, তারা দিতে পারবে না। এই করতে করতে মেয়ে তো হামে মরেই গেল।সোহার মা লিমা আক্তার
এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার তিন মাস আগে লিমা আক্তারের বিয়ে হয়। তারপর আর পড়াশোনা করতে পারেননি। পাঁচ বছরের বিবাহিত জীবন। লিমার আরেক মেয়ের বয়স সাড়ে তিন বছর। জানালেন, এ মেয়ের হামসহ সবগুলো টিকাই সময়মতো দিতে পেরেছেন। তবে চারপাশে হামের মহামারিতে এখন এ মেয়েকে নিয়েও তাঁর চিন্তা হচ্ছে।
সোহার বাবা সাকিব হোসেন গৃহস্থালির কাজ করেন। তাঁর ভাই রাশেদুল ইসলাম ইতালিতে থাকেন, মাস দুয়েক আগে ছুটিতে দেশে এসেছেন। মা-বাবার পাশাপাশি চাচাও সোহাকে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরেছেন। হাসপাতালগুলোর অব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন প্রবাসী চাচা।
চাচার ভয়ংকর অভিজ্ঞতা
গত ২৬ মার্চ সোহার জ্বর হলে স্থানীয় শিশু বিশেষজ্ঞকে দেখানো হয়। ২৯ মার্চ মাদারীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তারপর ১০ এপ্রিল পর্যন্ত পরিবারের সদস্যরা সোহাকে নিয়ে এই হাসপাতাল ওই হাসপাতালে ঘুরতে থাকেন। ক্লিনিক থেকে শুরু করে সরকারি, বেসরকারি কোনো হাসপাতালই বাদ রাখেননি।
‘সরকারি টিকা নেই, হাসপাতালে ওষুধ নেই, আইসিইউতে বিশেষ ব্যবস্থা নেই। বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরলাম। টাকা খরচ হলো। সরকারের কানে এই কথাগুলো যায় না? হামে শিশুরা মরে যাচ্ছে। অথচ আমরা বলি, শিশুরাই নাকি জাতির ভবিষ্যৎ। শিশুরা তো বাঁচতেই পারছে না। এ কেমন দেশ?’ প্রশ্ন চাচা রাশেদুলের।
হাসপাতালে দৌড়ানোর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে রাশেদুল ইসলাম বলেন, একেক হাসপাতালে হাতে-পায়ে ধরে সোহাকে ভর্তি করতে হয়েছে। এক হাসপাতালে গেলে বলা হয় অন্য হাসপাতালে যেতে। মাদারীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তির পর সোহাকে অক্সিজেনও দেওয়া হয়নি। ঢাকার শিশু হাসপাতালে নেওয়ার পর সেখানকার চিকিৎসকেরা বলেছেন, মাদারীপুরে থাকার সময়ই সোহার অবস্থা খুব খারাপ ছিল।
সরকারি টিকা নেই, হাসপাতালে ওষুধ নেই, আইসিইউতে বিশেষ ব্যবস্থা নেই। বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরলাম। টাকা খরচ হলো। সরকারের কানে এই কথাগুলো যায় না? হামে শিশুরা মরে যাচ্ছে। অথচ আমরা বলি, শিশুরাই নাকি জাতির ভবিষ্যৎ। শিশুরা তো বাঁচতেই পারছে না। এ কেমন দেশ?রাশেদুল ইসলাম
মাদারীপুর থেকে ঢাকায় শিশু হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে সিট নেই বলে ভর্তি করা হয়নি। প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে দ্রুত অন্য হাসপাতালে নিতে বলে। অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, আইসিইউ লাগবে, আইসিইউ শয্যা খালি নেই। ওয়ার্ডে ভর্তি করতে চাইলে ‘বন্ড সই’ করে ভর্তি করতে হবে। রোগী মারা গেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। চিকিৎসাটা অন্তত শুরু হোক—এ চিন্তা থেকে সোহাকে ওয়ার্ডেই ভর্তি করা হয়। তবে শয্যা খালি না থাকায় মেঝেতে রেখেই অক্সিজেন, স্যালাইন দেওয়া হয়। সব ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়।
মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে সোহা ভর্তি ছিল ৩০ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত। একসময় এখানে আইসিইউ শয্যাও পাওয়া যায়; কিন্তু শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে এ হাসপাতাল থেকেও সোহাকে অন্য হাসপাতালে নিতে বলা হয় বলে জানান রাশেদুল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের কনসালট্যান্ট (শিশু) এ আর এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘এ হাসপাতালের আইসিইউতে ৬ বছরের কম বয়সীদের জীবন রক্ষাকারী কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস ব্যবস্থা (ভেন্টিলেটর) নেই। এ বয়সী শিশুদের আমরা শুধু মনিটর করা এবং অক্সিজেন দিতে পারি। এটি অবশ্যই আমাদের ব্যর্থতা।’
অবশেষে শিশু হাসপাতাল থেকে ফোন করে সিট খালি আছে জানানো হলে আবার সোহাকে সেখানে নেওয়া হয় ৯ এপ্রিল। তত দিনে শিশুটির অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। চিকিৎসকেরা জানান, হয়তো তাকে বাঁচানো যাবে না। শেষ পর্যন্ত তা-ই হলো।
রাশেদুল জানান, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে নিতে বলা হলে আবার পাগলের মতো তাঁরা ভেন্টিলেটর আছে এমন হাসপাতাল খোঁজা শুরু করেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর পাওয়া গেল শ্যামলীর বেসরকারি সিটি কেয়ার জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের। এখানে প্রতিদিনেই খরচ হচ্ছিল ২৮ হাজার টাকা। একদিকে টাকা খরচ, অন্যদিকে সোহার অবস্থার অবনতি দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দেয়। একপর্যায়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটি প্যাকেজের আওতায় দৈনিক খরচ কমিয়ে চিকিৎসার সুযোগ দেয়।
অবশেষে শিশু হাসপাতাল থেকে ফোন করে সিট খালি আছে জানানো হলে আবার সোহাকে সেখানে নেওয়া হয় ৯ এপ্রিল। তত দিনে শিশুটির অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। চিকিৎসকেরা জানান, হয়তো তাকে বাঁচানো যাবে না। শেষ পর্যন্ত তা-ই হলো।
ফেসবুকে সোহার কাঁথায় মোড়ানো যে ছবিটা ঘুরছে, তা তুলেছিলেন ডেইলি টাইমস অব বাংলাদেশ পত্রিকার আলোকচিত্রী জান্নাতুল ফেরদাউস। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সোহার লাশ নিয়ে পরিবারের সদস্যরা যখন বাড়ি ফিরছিলেন, তখন তাঁদের সঙ্গে কথা বলার মতো কোনো পরিস্থিতি ছিল না। সোহার চাচা রাশেদুল ইসলামের ফোন নম্বরটি শুধু নিয়ে রেখেছিলাম।’
রাশেদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের মতো পরিবারের জন্য বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করানো তো কঠিন ব্যাপার। সরকার যদি নজর না দেয়, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে!’