পাঠক না থাকার আক্ষেপ
পড়ন্ত বিকেলে কেন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর স্টলে গভীর মনোযোগ দিয়ে বই দেখছিলেন গাজী রাফি ও তাঁর সহপাঠী নাইমুর রহমান। রাফি উপন্যাস পড়তে পছন্দ করেন। তিনি কিনলেন লতিফুল ইসলাম শিবলীর উপন্যাস দারবিশ। তাঁরা টঙ্গীর তামিরুল মিল্লাত মাদ্রাসার আলিম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ঢাকায় বিশেষ কাজে এসে বিকেলে ঢুকেছিলেন মেলায় বই কেনার উদ্দেশ্য নিয়েই। স্টলের ব্যবস্থাপক শায়লা ইসলাম বললেন, এমন পাঠক–ক্রেতা নিয়মিত পাওয়া গেলে বেচাকেনা নিয়ে কোনো আক্ষেপ থাকে না; কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। মেলায় এবার বইয়ের ক্রেতা বেশ কমে গেছে।
গতকাল মঙ্গলবার অমর একুশের বইমেলা চত্বরের নিরিবিলি পরিবেশ আগের মতোই বজায় ছিল। কেন্দ্রবিন্দু নামের এই প্রকাশনা সংস্থা প্রধানত বিদেশি লেখকদের বিভিন্ন ধরনের অনুপ্রেরণামূলক বই প্রকাশ করে থাকে। সঙ্গে কিছু কবিতা আর উপন্যাসও। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক জানান, ইদানীং গল্প–উপন্যাসের তুলনায় এ ধরনের অনুপ্রেরণামূলক বইয়ের প্রতি পাঠকের আগ্রহ বেশি। সে কারণে তাঁদের বইগুলো ভালোই চলে। এবারও তাঁরা বেশ কিছু নতুন বই এনেছেন।
বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্রের দেওয়া হিসাবে গতকাল মেলায় নতুন বই এসেছে ৬৫টি। নিয়মিতভাবে মেলার তথ্যকেন্দ্র থেকে নতুন বইয়ের প্রচার করা হচ্ছে। আর মূল মঞ্চে চলছে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গতকাল আলোচনার বিষয় ছিল ‘জন্মশতবর্ষ: তাজউদ্দীন আহমদ’। অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানের সভাপতিত্বে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন লেখক মহিউদ্দিন আহমদ,আলোচনায় অংশ নেন সাজ্জাদ সিদ্দিকী।
তাজউদ্দীন আহমদের লেখা নিয়ে একটি বিশেষ ধরনের বইও এবার মেলায় প্রকাশ করেছে প্রথমা প্রকাশন। মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশ: ব্যক্তিগত নোট-১৯৭১-১৯৭৩ নামের বইটি পাওয়া যাচ্ছে প্রথমার স্টলে। এদিন প্রথমায় নতুন এসেছে আবুল বাসার অনূদিত কার্লো রোভেল্লির সেভেন ব্রিফ লেসনস অন ফিজিকস। পুরোনো বইয়ের মধ্যে মহুয়া রউফের ভ্রমণবিষয়ক বই লাতিনের নাটাই।
অন্যান্য প্রকাশনীর নতুন বইয়ের মধ্যে ছিল বাতিঘরের মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের অর্থনীতিবিষয়ক বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতি, স্টুডেন্ট ওয়েজ এনেছে জরিনা আখতারের কবিতা আমি মির্জা গালিব নই, আগামী এনেছে ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেনের রাজনৈতিক প্রবন্ধ মজলুম জনতার মাওলানা ভাসানী ও অন্যান্য প্রবন্ধ, অনুপম এনেছে মিলন কান্তি নাথের ভূত চতুর্দশী: চিরায়ত ১৪টি ভূতের গল্প, ঐতিহ্য এনেছে রফিকুল ইসলামের গবেষণাগ্রন্থ ফিরে দেখা বনি ইসরায়েল।
চলমান ইতিহাস
চলমান ইতিহাস: জীবনের কিছু সময় কিছু কথা ১৯৯১ থেকে ২০১৯ বইটিতে মওদুদ আহমদ একজন প্রত্যক্ষদর্শী ও অংশীজনের জবানিতে ১৯৯১ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত প্রায় তিন দশকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস তুলে ধরেছেন। এ সময় স্বৈরশাসনের অধীন কীভাবে দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক ও নাগরিক অধিকার উপেক্ষিত ও অবদমিত হয়েছে, তার প্রচুর তথ্য ও দালিলিক উদাহরণসহ বিশদ বিবরণ দিয়েছেন তিনি। এ কারণে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কালের পাঠক, গবেষক ও ইতিহাসবিদদের জন্য প্রথমা প্রকাশনের এ বইটির মূল্য অপরিসীম।
মওদুদ আহমদের জন্ম ১৯৪০ সালে নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জে। স্কুলের ছাত্রাবস্থায়ই ভাষা আন্দোলনের মিছিলে যোগ দিয়ে জেল খাটেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক (সম্মান) পাস করে তিনি লন্ডনের বিখ্যাত লিংকনস-ইন থেকে বার–অ্যাট–ল ডিগ্রি লাভ করে ঢাকা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধকালের প্রবাসী সরকার, পরে বিএনপি ও জাতীয় পার্টির সরকারে বিভিন্ন সময় মন্ত্রী থেকে উপরাষ্ট্রপতি পর্যন্ত বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনীতি ও আইন পেশার পাশাপাশি মওদুদ আহমদ অক্সফোর্ড, হার্ভার্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন। অতিথি অধ্যাপক হিসেবে পড়িয়েছেন আমেরিকার জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে। গবেষক হিসেবে তাঁর বস্তুনিষ্ঠতা সুবিদিত।