টমটমে চড়ার সেই দিন
প্রিয় পাঠক, প্রথম আলোয় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে আপনাদের লেখা। আপনিও পাঠান। গল্প-কবিতা নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা। আপনার নিজের জীবনের বা চোখে দেখা সত্যিকারের গল্প; আনন্দ বা সফলতায় ভরা কিংবা মানবিক, ইতিবাচক বা অভাবনীয় সব ঘটনা। শব্দসংখ্যা সর্বোচ্চ ৬০০। দেশে থাকুন কি বিদেশে; নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ পাঠিয়ে দিন এই ঠিকানায়: [email protected]
১৯৫৩–৫৪ সালের কথা। আমার বয়স বছর পাঁচেক। বড় বোন, ছোট ভাই আর আমাকে নিয়ে বাবা পুরান ঢাকার আলুবাজারের একটা ভাড়া বাড়িতে উঠলেন। একই বাসায় বাড়িওয়ালি এবং আরও দুই–তিনটি ভাড়াটে পরিবার থাকত। বাসার সামনে ছিল একটা বড় উঠান। যেখানে প্রায়ই অবসর সময়ে নানা ধরনের গল্পের আসর বসত।
অল্প কিছুদিনের মধ্যে ইডেন কলেজে পড়াশোনা করতে মেজ খালা ফেনী থেকে এলেন আমাদের বাসায়। খালার ভর্তির পর্ব শেষ হওয়ার কয়েক দিন পর থেকেই দেখলাম, ওনাকে কলেজে নিয়ে যাওয়ার জন্য সকালে একটা ঘোড়ার গাড়ি এসে দাঁড়াত। দুই–তিনজন করে বসার মতো দুটি বড় সিট, গাড়িটির দুই দিকে একটা করে দরজাসহ চারটা জানালা ছিল। যেটাকে এলাকার সবাই ‘টমটম’ বলত। গাড়ির চালক, যাকে সবাই কোচোয়ান বলত, জোরে ডাক দিলে খালা গাড়িতে উঠতেন। আবার বিকেলে খালা এই ঘোড়ার গাড়িতেই ফিরতেন।
খালার গাড়িতে উঠতে যেটুকু সময় লাগত, সেই সময় আমার কাছাকাছি বয়সের পাড়ার কিছু ছেলে–মেয়ে গাড়ির পেছনে একটা কাঠের সিটে লাফ দিয়ে উঠে বসত। আমি রোজই দেখতাম গাড়িটি যখন বড় রাস্তায় ওঠার জন্য মোড় নিত, তখন ওরা সবাই গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে নেমে দৌড়ে ফিরে আসত।
কোচোয়ান কী সুন্দরভাবে একটা ছড়ির মাথায় একসঙ্গে বাঁধা কতগুলো চিকন চামড়ার দড়ি নিজের মাথার ওপর দিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে মুখে একটা অদ্ভুত শব্দ করত, আর ঘোড়াগুলো দৌড়াত। রাস্তার মাথায় মোড় ঘোরানোর আগে ঘোড়ার মুখে লাগাম দিয়ে পিঠে ছড়ির ঘা দিত, আর গাড়িটি অদৃশ্য হয়ে যেত।
ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম, এই শব্দেরও রকমফের আছে। কোচোয়ান একেকভাবে তার ছড়ি ঘোরানোর সঙ্গে ভিন্ন রকমের শব্দ করত, যেটা অনুসরণ করে ঘোড়াগুলো ওদের গতি বদল করত। আর তাদের মাথাও বিভিন্নভাবে ঘোরাত। কখনো ডানে-বাঁয়ে, কখনো ওপরে-নিচে। আবার মাঝেমধ্যে মনে হতো ওরা কোচোয়ানের নির্দেশ না মেনে ওদের ঘাড়-মাথা শক্ত করে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকত। এভাবে সম্ভবত ওরা ওই মুহূর্তে কোচোয়ানের নির্দেশ মানার অনিচ্ছা প্রকাশ করত।
প্রতি সপ্তাহে চার–পাঁচ দিন এই দৃশ্য দেখতে দেখতে এরপর আমারও মনে একটা ইচ্ছা জাগতে লাগল, ‘ইশ্, আমিও যদি ওদের মতো ওই গাড়িতে চড়তে পারতাম।’
একদিন খালা যখন গাড়ির দরজার সামনের পাদানিতে পা দিয়ে উঠতে ব্যস্ত, আমিও দৌড়ে পেছন দিকে গেলাম। ওই সিটে ততক্ষণে আমার আগেই দুই-তিনটা ছেলে উঠে বসে ছিল। আমি চেষ্টা করেও ততটা উঁচুতে উঠতে পারছিলাম না। আগে থেকেই বসা দুজন আমাকে দুই হাত ধরে টেনে উঠিয়ে নিল। ততক্ষণে কোচোয়ান গাড়ি চালাতে শুরু করে দিয়েছে। ভয় আর উত্তেজনায় তখন আমার হাত–পা কাঁপছে। আমি ঠিকমতো বসার আগেই দেখি টমটম বড় রাস্তার মোড়ে এসে গেছে। ওরা একজন একজন করে লাফ দিয়ে নেমে পড়ছে। আমি দুই–তিনবার চেষ্টা করার পর একেবারে ধপ করে পড়লাম। পথচারীদের মধ্যে একজন আমাকে ধরে উঠিয়ে বাসার দিকে একটু এগিয়ে দিলেন। আমার সারা শরীরে ধুলা, চোখে পানি আর হাঁটুর দিকে তাকিয়ে দেখি রক্ত পড়ছে। হাঁটতে শুরু করে দেখি পারছি না। বেশ কষ্ট হচ্ছে আর খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হচ্ছে।
পরমুহূর্তে ব্যথার চেয়ে যে ভয়টা আমার সারা শরীরকে হিমশীতল করে দিল তা হলো, আম্মা তো আজ আমাকে খুব কঠিন শাস্তি দেবেন। কেমন করে আমি এই অবস্থায় ওনার সামনে গিয়ে দাঁড়াব!
গেট দিয়ে ঢুকে আগে বাড়িওয়ালি খালাম্মার বাসায় গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে তাঁকে সব জানালাম। তিনি তাড়াতাড়ি ডেটল পানিতে তুলা ভিজিয়ে মুছে দিয়ে আমাকে আম্মার কাছে নিয়ে গেলেন। আমাকে তার পেছনে দাঁড় করিয়ে ঘটনা জানিয়ে অনুরোধ করে বললেন, ‘মেয়েটা একদিকে এত ব্যথা পেয়েছে আর অন্যদিকে তোমার ভয়ে আধমরা হয়ে গেছে, তুমি ওকে আর বকাবকি কোরো না।’
আম্মাও আমার অবস্থা দেখে আদেশ করলেন, ‘কান ধরে বল আর কখনো না বলে বাড়ির বাইরে যাবি না, আর এ ধরনের কাজ করবি না।’
কাঁদতে কাঁদতে সেটুকু বলে কাছে যেতেই আম্মা কোলে করে ঘরে নিয়ে গেলেন। বিকেলে মিটফোর্ড হাসপাতালে অ্যান্টিটিটেনাস ইনজেকশন দিয়ে ওষুধ নিয়ে এলেন। আমার ঠিকভাবে হাঁটাচলা করতে অনেক দিন লেগেছিল।
সেই টমটমে আমার প্রথম ও শেষযাত্রার কথা আজও মনে পড়ে। ব্যথাটা ভুলে গেছি, কিন্তু সেই দিনের ভয় আর মায়ের কোলে ফিরে যাওয়ার স্মৃতিটা আজও অমলিন।