বাজারদর যাচাই না করেই ইভিএম কেনা হচ্ছে

প্রতিটি ইভিএমের দাম ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। ইভিএম কিনতে ৮ হাজার ৭১১ কোটি ৪৪ লাখ টাকার প্রকল্প।

ফাইল ছবি: প্রথম আলো

বাজারদর যাচাই না করেই দুই লাখ ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) কিনতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। প্রতিটি ইভিএমের দাম ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৩৩ হাজার টাকা।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এই ইভিএম কিনতে ৮ হাজার ৭১১ কোটি ৪৪ লাখ টাকার প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। তড়িঘড়ি করে নেওয়া এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতাও যাচাই করা হয়নি। ২০১৮ সালের চেয়ে এখন প্রতিটি ইভিএমের দাম প্রায় এক লাখ টাকা বেশি পড়ছে।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) বলছে, যে ইভিএম তারা ব্যবহার করছে, সেটি বিশ্বের আর কোথাও ব্যবহার করা হয় না। তাই ইভিএমের দর যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এরপরও ইসির দর যাচাই কমিটি বিভিন্ন দেশের নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখেছে। কিন্তু কোথাও ইভিএমের দাম সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়নি।

আগামী নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার না করা এবং ইভিএম কেনা থেকে এখনই সরে আসা হবে ইসির জন্য সর্বোৎকৃষ্ট সিদ্ধান্ত।
বদিউল আলম মজুমদার, সম্পাদক, সুজন

রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ১৫০টি আসনে ইভিএমে ভোট নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। ইসির কাছে এখন দেড় লাখ ইভিএম আছে। এর মধ্যে অনেকগুলো অকেজো। বাকি ইভিএম দিয়ে ৬০-৭০টি আসনে ভোট করা যাবে। ১৫০ আসনে ভোট গ্রহণ করতে আরও ২ লাখ ইভিএমের দরকার।

ইভিএম কেনার প্রকল্প প্রস্তাব চূড়ান্ত করতে গত ১৩ সেপ্টেম্বর বৈঠক করেছিল ইসি। কিন্তু সেদিন প্রস্তাব অনুমোদন করেনি ইসি। বৈঠক শেষে জানানো হয়েছিল, ইভিএমের বাজারদর যাচাই কমিটি তাদের কাজ শেষ করতে না পারায় কমিশন প্রস্তাব চূড়ান্ত করেনি। পরবর্তী বৈঠকে বাজারদর যাচাই কমিটির প্রতিবেদন দেওয়া হবে। এরপর ১৯ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে ‘নির্বাচনী ব্যবস্থায় ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং টেকসই ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক প্রকল্প প্রস্তাব চূড়ান্ত করে নির্বাচন কমিশন।

ইভিএম
ছবি: সংগৃহীত

ইসি সূত্র জানায়, ইভিএম প্রস্তুতকারক কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি ইসির বাজারদর যাচাই কমিটি। এই কমিটি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, ইভিএমের স্পেসিফিকেশন (প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ কোনটি কী পরিমাণে লাগবে) এবং বাজারদর যাচাইয়ের জন্য ইভিএম ব্যবহারকারী বিভিন্ন দেশের নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট পর্যালোচনা করা হয়। কিন্তু ইভিএমের দরের তথ্য পাওয়া যায়নি। তা ছাড়া বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ব্যবহৃত ইভিএমের সঙ্গে বিশ্বের অন্য কোনো দেশের ইভিএমের মিল নেই।

আরও পড়ুন

কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচন কমিশন যেসব ইভিএম ব্যবহার করছে, সেগুলোর একমাত্র সরবরাহকারী বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (বিএমটিএফ)। তাই তাদের কাছ থেকে এ-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। বিএমটিএফ ইভিএমের যে দাম দিয়েছে, প্রকল্প প্রস্তাবেও একই দাম ধরা হয়েছে। বাজারদর যাচাই কমিটির ওই প্রতিবেদন প্রকল্প প্রস্তাবের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে।

ইসি সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ প্রথম আলোকে বলেন, ইসি যে ধরনের ইভিএম ব্যবহার করে, আর কোথাও হুবহু একই রকমের ইভিএম পাওয়া যায় না। এটি শুধু বিএমটিএফই সরবরাহ করে। যে কারণে এই মেশিনের সুনির্দিষ্ট বাজার দর অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।

প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই না করার বিষয়ে অশোক কুমার দেবনাথ বলেন, সম্ভাব্যতা যাচাই করতে গেলে অনেক সময় প্রয়োজন হতো। এটি করতে গেলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা যাবে না। এ কারণে সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।

আরও পড়ুন

দেশে এখন যেসব ইভিএম ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলো কেনা হয় ২০১৮ সালে। তখন প্রতিটি ইভিএমের দাম পড়েছিল ২ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। তখন ভারতে ব্যবহৃত ইভিএমের দাম ছিল ১৭ হাজার রুপি। অবশ্য বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে দুই দেশের ইভিএমের মধ্যে পার্থক্য আছে। তবে বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে কিছু পার্থক্য থাকলেও দামের বিশাল পার্থক্যকে অস্বাভাবিক বলে উল্লেখ করেছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা।

ইসি বলছে, ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় ইভিএমে বাড়তি ব্যয় হচ্ছে। দেশের ইভিএমে বায়োমেট্রিক যাচাইয়ের মাধ্যমে ভোটারের পরিচয় নিশ্চিত করার ব্যবস্থা আছে, যা ভারতের ইভিএমে নেই।

অন্যদিকে ভারতের ইভিএমে ভিভিপিএটি (ভোটার কোন প্রতীকে ভোট দিয়েছেন সেটিসহ একটি কাগজ বের হয়ে আসে) আছে, যা দেশের ইভিএমে নেই। এর আগে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ইসির জন্য ইভিএম তৈরি করেছিল। তখন প্রতিটির দাম পড়েছিল ২০-২২ হাজার টাকা।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, অতীতে ভারতের চেয়ে ১১ গুণ বেশি দামে ইভিএম কেনা হয়েছে। ইভিএম কেনাকাটায় তখন বাণিজ্য ও নিয়ম না মানার অভিযোগ উঠেছিল। একক উৎস থেকে নেওয়ার বড় সমস্যা হলো বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হয়।

বাজারদর যাচাইয়ে সুযোগ না থাকলে কল্পনাপ্রসূত ব্যয় নির্ধারণ করার আশঙ্কা থাকে। ইসির পদক্ষেপে মনে হয়, ‘লাগে টাকা, দেবে গৌরী সেন’—এই মনোভাবে তারা কাজ করছে। আগামী নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার না করা এবং ইভিএম কেনা থেকে এখনই সরে আসা হবে ইসির জন্য সর্বোৎকৃষ্ট সিদ্ধান্ত।