টিকা ক্যাম্পেইনের পরও হাম নিয়ন্ত্রণে আসেনি
হামের টিকার জাতীয় ক্যাম্পেইন শেষ হয়েছে এক মাস আগে—২০ মে। তবু হাম নিয়ন্ত্রণে আসেনি। মৃত্যু কমলেও হামের উপসর্গ নিয়ে এখনো প্রতিদিন গড়ে এক হাজার রোগী আসছে হাসপাতালে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাঁদের পরামর্শ শুনছে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঢাকা কার্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণ বলছে, হামের উপসর্গ ও হামে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়া–কমার মধ্যে আছে। সংস্থাটির ৯ জুন বিতরণ করা সর্বশেষ বিশ্লেষণ বলছে, ১ থেকে ৭ জুন—এক সপ্তাহে আগের সপ্তাহের তুলনায় (২৫–৩১ মে) হামের উপসর্গ নিয়ে ও নিশ্চিত হামে মৃত্যু কমেছে। তবে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা ব্যক্তি বা নিশ্চিত হামের রোগী সামান্য বেড়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘হামে আক্রান্তের সংখ্যা কমে আসার প্রবণতা আমরা লক্ষ করছি। মে মাসের তুলনায় জুনে আক্রান্তের সংখ্যা কম। আশা করছি, জুনের শেষ নাগাদ সংক্রমণ আরও কমে আসবে।’
সংস্থাটির ৯ জুন বিতরণ করা সর্বশেষ বিশ্লেষণ বলছে, ১ থেকে ৭ জুন—এক সপ্তাহে আগের সপ্তাহের তুলনায় (২৫–৩১ মে) হামের উপসর্গ নিয়ে ও নিশ্চিত হামে মৃত্যু কমেছে। তবে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা ব্যক্তি বা নিশ্চিত হামের রোগী সামান্য বেড়েছে।
হামের সংক্রমণ কমে আসা আর হাম নিয়ন্ত্রণে আসা এক কথা নয়। মার্চ মাসের শুরুতে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর সরকার হাম–রুবেলার টিকার জাতীয় ক্যাম্পেইন শুরু করেছিল ৫ এপ্রিল। এই ক্যাম্পেইন শেষ হয়েছে ২০ মে। অর্থাৎ এক মাস বা চার সপ্তাহ আগে। জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ ও টিকাবিশেষজ্ঞরা বলেন, হামের টিকা দেওয়ার দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে শিশুর শরীরে হামের প্রতিরোধক্ষমতা (অ্যান্টিবডি) গড়ে ওঠে। জাতীয় ক্যাম্পেইন চার সপ্তাহ পরও গড়ে দৈনিক হাজারের
বেশি শিশু কেন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ আছে।
গতকাল শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (বৃহস্পতিবার সকাল আটটা থেকে শুক্রবার সকাল আটটা পর্যন্ত) সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে ১ হাজার ৭৮ জন ও হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৪ জন। এই সময় নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ৯৬ জনের। আর তিন হাজারের বেশি মানুষ হাম নিয়ে সরকারি–বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামে আক্রান্ত রোগী বা হামের উপসর্গ নিয়ে মানুষ যদি হাসপাতালে আসা বন্ধ হয়, হামে যদি মৃত্যু না হয় তাহলে বুঝতে হবে, হাম নিয়ন্ত্রণে আছে।
হামে আক্রান্তের সংখ্যা কমে আসার প্রবণতা আমরা লক্ষ করছি। মে মাসের তুলনায় জুনে আক্রান্তের সংখ্যা কম। আশা করছি, জুনের শেষ নাগাদ সংক্রমণ আরও কমে আসবে।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস
তথ্যের ঘাটতি, প্রশ্নের উত্তর নেই
জাতীয় টিকা ক্যাম্পেইনে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, ছয় মাসের কম বয়সী এবং পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে। এমনকি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষও হামে আক্রান্ত হচ্ছেন। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বয়সভিত্তিক কোনো তথ্য প্রকাশ করছে না। এমনকি টিকা দেওয়ার পর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বেড়েছে কি না, তা দেখা হচ্ছে না।
এসব কাজের মূল দায়িত্ব স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার (সিডিসি)। কিন্তু এই শাখা থেকে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। গতকাল মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে এই শাখার পরিচালক ফোন ধরেননি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত কুমার বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) কিছু কাজ দ্রুত শুরু করবে। সেখানে নতুন পরিচালক দেওয়া হয়েছে।
আমি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলাম। এর মধ্যে ছিল হাসপাতালের বহির্বিভাগে জ্বর ও শরীরে র্যাশ থাকা রোগীদের অন্যদের থেকে আলাদা করার ব্যবস্থা (ট্রাইএজ) করা; হাসপাতালে দরজা–জানালা খোলা রাখা; সেবাদানকারীদের মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করা; সাবান–পানি দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়া এবং হাসপাতালে ভিজিটর নিয়ন্ত্রণ করা। এসব করা হচ্ছে বলে মনে হয় না।আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান
অন্যদিকে জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা দেওয়ার পর প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে উঠছে কি না, অর্থাৎ টিকায় কাজ হলো কি না, তা যেমন দেখা দরকার, পাশাপাশি সংক্রমণ যেন না ছড়ায়, তারও উদ্যোগ নেওয়া উচিত। এ ব্যাপারে পরিবারে, সমাজে ও হাসপাতালে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া দরকার ছিল। যেমন: ছয় মাসের কম বয়সী শিশুর হাম হলে তাকে ‘আইসোলেট’ বা আলাদা করে রাখতে হবে। জনসচেতনতা বাড়াতে বা সাধারণ মানুষের করণীয় বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু বলা হচ্ছে না।
আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলাম। এর মধ্যে ছিল হাসপাতালের বহির্বিভাগে জ্বর ও শরীরে র্যাশ থাকা রোগীদের অন্যদের থেকে আলাদা করার ব্যবস্থা (ট্রাইএজ) করা; হাসপাতালে দরজা–জানালা খোলা রাখা; সেবাদানকারীদের মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করা; সাবান–পানি দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়া এবং হাসপাতালে ভিজিটর নিয়ন্ত্রণ করা। এসব করা হচ্ছে বলে মনে হয় না।’