২ নভেম্বর বেলালের দোকানে গিয়ে দেখা যায়, হাসিমুখে বৈদ্যুতিক পাখা মেরামত করছেন। নেই বিষাদের ছায়া। তাঁর পাশে দাঁড়ানো মো. খোরশেদ। তিনি নগরের হামজারবাগ থেকে এসেছেন। জানতে চাইলে মো. খোরশেদ প্রথম আলোকে বলেন, দীর্ঘদিন বেলালের কাছে তাঁর বাসার বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম মেরামত করে আসছেন। এই কাজে তিনি খুব দক্ষ। কখনো বেলালের কাছে এসে ঠকেননি।  

বেলালের পাশেই বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম নিয়ে বসেন বিক্রেতা মো. ফারুক। তিনি বলেন, বেলাল একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও দুই হাতে ভর দিয়ে চলাফেরা করেন। আর সেই হাতে কাজ করে খান, যা শারীরিকভাবে সক্ষম অনেক মানুষের চেয়ে বেলাল কর্মঠ। অনেক দ্রুত আর নিখুঁত কাজ করেন তিনি।  

কীভাবে বেলালের এ অবস্থা হলো, জানতে চাইলে বলেন, গ্রামের বাড়ি মিরসরাইয়ের মগাদিয়ায় হলেও বাবার চাকরির সুবাদে চট্টগ্রাম শহরে থাকতেন তাঁরা। ১৯৯৩ সালের শেষের দিকে ঘটনা। বন্ধুদের সঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে যেতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেনে ওঠেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ১৩ বছর। নতুন পাড়া এলাকায় হঠাৎ ট্রেনে কাটা পড়েন। তাঁর কোমরের নিচ থেকে দুই পা হারান চিরতরে। এরপরও বেলাল পড়ালেখা চালিয়ে যেতে থাকেন। ২০০০ সালের দিকে তাঁর বাবা মারা যান। পরিবারের বড় ছেলে তিনি। বাবাকে হারিয়ে দিশাহারা পঙ্গু বেলাল কখনো ইট ভাঙেন। আবার কখনো বিক্রি করেছেন সবজি। কিন্তু চলাফেরা করতে যেহেতু অসুবিধা, বসে কাজ করা যায় এমন কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে মুঠোফোন ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম মেরামতের কাজ শেখেন দোকানে। কোনো প্রতিষ্ঠানে গিয়ে শেখার মতো সময় ও সুযোগ ছিল না তাঁর। 

১৫ বছর আগে নগরের রৌফাবাদে ফুটপাতের পাশে একটি অস্থায়ী দোকান দেন বেলাল। এখনো সেই দোকান করে মা, স্ত্রী, দুই সন্তানসহ পাঁচ সদস্যের পরিবার চালান। আর তাঁকে সহযোগিতা করেন স্ত্রী নিলা আক্তার। সন্তানদের দেখাশোনা, স্কুলে নিয়ে যাওয়া, বাসার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বাজার থেকে নিয়ে আসা—সবই করেন স্ত্রী। 

বেলালের স্ত্রী নিলা আক্তার জানান, তাঁর স্বামী কাজ করে সংসার চালান। ভালোভাবে চলতে না পারলেও তাঁরা আত্মসম্মানের সঙ্গে বেঁচে আছেন, এটাই বড় পাওয়া। 

ছেলেকে নিয়ে গর্বিত বেলালের মা ফাতেমা খাতুনও। তিনি বলেন, তাঁর ছেলের চেয়ে শারীরিকভাবে সক্ষম অনেকেই ভিক্ষা করছেন। তাঁর ছেলে কাজ করে সংসার চালান। শত অভাব থাকলেও কখনো কারও কাছে হাত পাতেনি। 

বেলাল বলেন, দুর্ঘটনার জন্য হাহুতাশ না করে প্রচণ্ড মনোবল নিয়ে এত বছর ধরে সংসার চালিয়ে যাচ্ছেন। এখনো কারও কাছে হাত পাতেননি। পুঁজি না থাকায় দোকানটি বড় করতে পারছেন না। মালামাল না থাকায় অনেকে আসতে চান না। এ ছাড়া বাসাভাড়ার পেছনে তাঁর অনেক টাকা চলে যায়। 

প্রতিবন্ধী হিসেবে সরকারের কাছ থেকে একটি ঘর পেলে তাঁর জন্য উপকার হবে। যে আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চালাতে কষ্ট কম হবে। 

বেলাল উদ্দিনের বিশ্বাস, ইচ্ছাশক্তি থাকলেই প্রতিবন্ধীরাও পারেন অনেক কিছু করতে। তিনি বলেন, প্রতিবন্ধীরা ভিক্ষা না করে যদি কোনো কাজ করে খান, তবে দেশের আরও উন্নতি হবে।