সারের ডিলারশিপ পেতে নেতাদের দৌড়ঝাঁপ, বিতরণ ব্যাহত

কুড়িগ্রামে বারবার ঘুরেও সার না পেয়ে ডিলারের গুদাম ভেঙে সার নিয়ে যান কৃষকেরা। গত রোববার বেলা ১১টার দিকে ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুড়ি ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটেফাইল ছবি: ভিডিও থেকে সংগৃহীত

নতুন ডিলার (পরিবেশক) নিয়োগকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন জেলায় সারের সরবরাহ ও বিতরণে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বর্তমান পরিবেশকদের অনেকে বাদ পড়ার আশঙ্কা করছেন। তাঁরা মনে করছেন, সরকারদলীয় নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নতুন ডিলারের দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন। ফলে বাদ পড়ার আশঙ্কা থেকে অনেকে সার বিতরণে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন। সরকারের একটি সংস্থার প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইচ্ছা করেই সার উত্তোলন ও বিতরণে দেরি করছেন অনেক ডিলার। তাঁরা কৃষকদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। এতে বিভিন্ন এলাকায় সার নিয়ে কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

ডিলারশিপ পেতে বিএনপির নেতা–কর্মীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। ফলে যাঁরা এখন ডিলারের দায়িত্বে আছেন, তাঁদের মধ্যে আতঙ্ক ও ভয় কাজ করছে।

এই প্রতিবেদনের সূত্র ধরে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে মানিকগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও নড়াইলে সারের নতুন ডিলার নিয়োগের খোঁজ নেওয়া হয়। এতে জানা যায়, সরকারদলীয় নেতারা ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যায়ে ডিলারের দায়িত্ব পেতে দৌড়ঝাঁপ করছেন। মন্ত্রী ও প্রভাবশালীদের কাছ থেকে আধা সরকারিপত্র (ডিও) নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ডিলারশিপ পেতে বিএনপির নেতা–কর্মীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। ফলে যাঁরা এখন ডিলারের দায়িত্বে আছেন, তাঁদের মধ্যে আতঙ্ক ও ভয় কাজ করছে।

এ পরিস্থিতিতে কৃষকেরা বলছেন, সরকার সুষ্ঠুভাবে সার ব্যবস্থাপনা করতে পারছে না। কৃষক পর্যায়ে চাহিদা অনুযায়ী সার যাচ্ছে না। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। কোথায় কতটুকু সারের প্রয়োজন, সরকার তা বলতে পারছে না।

বিদ্যমান ডিলারদের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টির কারণে সারসংকট তৈরি হয়েছে। তবে সরকার এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি যে সব ডিলারকে বাদ দেবে। নতুন-পুরোনো মিলেই থাকবে।
আমিন উর রশিদ, কৃষিমন্ত্রী

এদিকে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে বলা হচ্ছে, ঢালাওভাবে সব ডিলারকে সরানো হবে না। নতুন–পুরোনো মিলিয়ে পরিবেশক নিয়োগ দেওয়া হবে।

সারে নতুন ডিলার নিয়োগ দিতে গত ২৭ আগস্ট একটি নীতিমালা প্রকাশ করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়, একই পরিবারে একাধিক ডিলার নিয়োগের সুবিধা থাকবে না। ডিলারের কার্যক্রম মূল্যায়নের মাধ্যমে বাতিল বা নবায়ন করা হবে। প্রতিটি ইউনিয়নে তিনজন সার ডিলার (এখন দুজন) নিয়োগ করা যাবে। প্রতিটি পৌরসভায় তিনজন করে ডিলার নিয়োগ দেওয়া যাবে। নতুন ডিলার নিয়োগে এরই মধ্যে বিভিন্ন জেলা প্রশাসক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছেন। অনেকে পরিবেশক পদে আবেদন করছেন।

নতুন ডিলার নিয়োগ দিলে বর্তমানে যাঁরা আছেন, তাঁরা বাদ পড়বেন—মাসখানেক আগে থেকে এমন কানাঘুষা শুরু হয়। নতুন ডিলারের দায়িত্ব পেতে কেউ কেউ প্রভাবশালীদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন বলেও শোনা যাচ্ছে। এমন বাস্তবতায় ২৩ আগস্ট কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে একজন ডিলারের গুদামের দরজা ভেঙে ১৯৭ বস্তা ইউরিয়া সার (প্রতি বস্তা ৫০ কেজি) নিয়ে যান কৃষকেরা। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে কিছু সার ফেরত পাওয়া যায়। সারসংকটের কারণে কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ ও উপজেলা কৃষি কার্যালয়।

কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে বলা হচ্ছে, ঢালাওভাবে সব ডিলারকে সরানো হবে না। নতুন–পুরোনো মিলিয়ে পরিবেশক নিয়োগ দেওয়া হবে।

৬ সেপ্টেম্বর সার দিতে দেরি হওয়ায় কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার কচাকাটা বাজারে এক পরিবেশকের গুদামে ভাঙচুর করেন ক্ষুব্ধ কৃষকেরা। সারের দাবিতে জেলার ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় সড়কে বিক্ষোভ করেন তাঁরা। লালমনিরহাটেও একই দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন কৃষকেরা। সারসংকট নিয়ে সংসদেও আলোচনা হয়েছে।

আন্দোলনরত কৃষকদের অভিযোগ, চলতি আমন চাষ মৌসুমে চাহিদামতো সার না পাওয়ায় তাঁরা সময়মতো জমিতে সার দিতে পারছেন না। কোথাও কোথাও সারের দাম বেশি রাখছে। নিয়মিত সার সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সার নিয়ে গড়ে ওঠা কৃত্রিম সংকট বা সিন্ডিকেট বন্ধের দাবিতে তাঁরা জাতীয় মহাসড়কে নামতে বাধ্য হন।

কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে সারসংকটের কারণ ও উত্তরণ নিয়ে ৮ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। এ চিঠিতেও ডিলার পর্যায়ে অনিয়মের বিষয়টি উঠে আসে। বলা হয়, এবার নির্ধারিত সময়ে সার বিতরণ শুরু করেননি ডিলাররা। প্রকৃত কৃষক ও জমির পরিমাণ কত, সে বিষয়ে হালনাগাদ কোনো তথ্য নেই। একই ব্যক্তি একাধিকবার সার নিয়েছেন। ইউনিয়ন সার বিতরণ কেন্দ্রের সামনে অতিরিক্ত জনসমাগম এবং সারসংকট নিয়ে গুজব ও অপপ্রচার দেখা গেছে। তবে সার বিতরণ নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

আরও পড়ুন

পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বলা হয়, সারসংকট নিরসনে প্রকৃত কৃষকের তালিকা ও জমির পরিমাণভিত্তিক চাহিদার আলোকে ডেটাবেজ তৈরি করা জরুরি। স্থানীয় প্রশাসন যখন সার বিতরণ করতে যাবে, এর আগে অবশ্যই পুলিশ প্রশাসনকে জানাতে হবে। গুজব প্রতিরোধে প্রশাসন, কৃষি বিভাগ, জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে প্রচার চালাতে হবে। প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত বরাদ্দ দিতে হবে বলে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে জানানো হয়।

মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর, সিরাজগঞ্জ, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট ও গাইবান্ধায় চাহিদা অনুযায়ী গত মাসে সার পাওয়া যায়নি। এসব জেলায় বেশি দামে সার বিক্রি হয়েছে। এসব জেলায় সারের অবৈধ মজুতের অভিযোগও রয়েছে।

অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশে সারের ঘাটতি নেই। চাহিদার তুলনায় দেশে বাড়তি সারের মজুত রয়েছে। বিগত সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া ডিলাররা সার বিতরণে অস্থিরতা তৈরি করছেন। তবে বিরোধী দল থেকে বলা হচ্ছে, সারের ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি আছে।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, প্রতিটি ইউনিয়নে দুজন করে সারের ডিলার থাকার কথা। কিন্তু কোথাও একজন রয়েছেন, কোথাও একজনও নেই। সরকার প্রতিটি ইউনিয়নে তিনজন করে সারের ডিলার নিয়োগ দেবে। ফলে নতুন করে কোথাও একজন, কোথাও দুজন নিয়োগ পাবেন।

কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, আবেদন জমা হলে যাচাই-বাছাই শেষে শিগগিরই ডিলার নিয়োগ শুরু হবে। তখন সব ঠিক হয়ে যাবে। তিনি বলেন, বিদ্যমান ডিলারদের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টির কারণে সারসংকট তৈরি হয়েছে। তবে সরকার এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি যে সব ডিলারকে বাদ দেবে। সব নতুন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হবে, তা নয়। নতুন–পুরোনো মিলেই থাকবেন। তবে কেউ যদি অবৈধভাবে সার মজুত করেন, সরকার অবশ্যই তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।

মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর, সিরাজগঞ্জ, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট ও গাইবান্ধায় চাহিদা অনুযায়ী গত মাসে সার পাওয়া যায়নি। এসব জেলায় বেশি দামে সার বিক্রি হয়েছে। এসব জেলায় সারের অবৈধ মজুতের অভিযোগও রয়েছে।

প্রতিবেদনে কী আছে

সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে জমা দেওয়া সরকারি সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশে যোগ্যতার পরিবর্তে অনুগত ব্যক্তিদের ডিলার নিয়োগ দেওয়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। নতুন ডিলার নিয়োগে নিজেদের পছন্দের লোকদের সুযোগ দিতে প্রভাবশালী মহলের চাপ রয়েছে। এটা হলে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বাদ পড়তে পারেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে প্রভাবশালী বিভিন্ন গোষ্ঠী সার পরিবহনে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। এতে সার পরিবহন ও বিতরণব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর সুযোগে কৃষকদের কাছ থেকে সারের অতিরিক্ত দাম আদায় করা হতে পারে।