ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নুহা

পঞ্চগড়ে নুসরাত জাহান নুহাছবি: পরিবারের সৌজন্যে

একসময় সাইকেল চালাতেন, গাছে চড়তেন, ছুটে বেড়াতেন অবাধ আনন্দে। সেই নুসরাত জাহান নুহার জীবন হঠাৎ থমকে যায় ২০২০ সালে। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় ধরা পড়ে তাঁর হাড়ের ক্যানসার—অস্টিওসারকোমা। কেমোথেরাপির অসহনীয় যন্ত্রণা, পা কেটে ফেলতে হতে পারে—এমন আশঙ্কা আর মাথার চুল পড়ে যাওয়ার বাস্তবতা নুহার শৈশব-কৈশোরকে একনিমেষে বদলে দেয়।

সাইকেল চালানো বা গাছে চড়ার আর উপায় নেই নুহার। ইচ্ছা থাকলেও সাঁতার কিংবা কোনো ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ারও উপায় নেই তাঁর। মন খারাপ হলেও জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি নুহা। ভয়কে শক্ত করে ধরেই এগিয়ে গেছেন। সেই লড়াইয়ের ফল ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি পরীক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিট এবং ব্যবসায় শিক্ষা ইউনিটে ১০০তম স্থান অর্জন।

বাসার সবার ভাব দেখে বুঝতাম বড় কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু সেটা যে ক্যানসার, তা বুঝতে সময় লেগেছে। শুধু জানতাম পায়ে টিউমার। ভাবতাম, এই তো আর একটু, তারপরেই তো শেষ। কেমোথেরাপির একটা ধাপ শেষ হলেই ভাবতাম—সুস্থতার দিন কাছে চলে এসেছে।
নুসরাত জাহান নুহা

নুহার বাড়ি পঞ্চগড়ে। গত মঙ্গলবার সকালে পঞ্চগড় থেকে বাসে করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন নুহা। ঢাকায় পৌঁছেছেন রাত আটটায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে একাই ঢাকায় এসেছেন তিনি। মুঠোফোনে কথা হয় তাঁর সঙ্গে।

নুহা বলেন, ক্যানসারের চিকিৎসায় শেষ পর্যন্ত তাঁর পা কেটে ফেলতে হয়নি। ডান পায়ের একটি হাড় (রাইট টিবিয়া) কেটে সেখানে প্রস্থেটিক ডিভাইস বসানো হয়েছে। ফলে এক পা খানিকটা বড়, আরেক পা ছোট। ডান হাতে ক্রাচ নিয়ে হাঁটতে হয়। এই পায়ে বড় কোনো আঘাত লাগলে জীবনটা হুইলচেয়ারে কাটাতে হতে পারে—এই সতর্কতা নিয়েই চলতে হয় তাঁকে।

ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে একটু থমকে যান নুহা। বলেন, ‘বাসার সবার ভাব দেখে বুঝতাম বড় কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু সেটা যে ক্যানসার, তা বুঝতে সময় লেগেছে। শুধু জানতাম পায়ে টিউমার। ভাবতাম, এই তো আর একটু, তারপরেই তো শেষ। কেমোথেরাপির একটা ধাপ শেষ হলেই ভাবতাম—সুস্থতার দিন কাছে চলে এসেছে।’

পড়াশোনা থামেনি, থামেনি স্বপ্নও

ক্যানসারে চিকিৎসা চলার সময় হাসিমুখে নুহা
ছবি: পরিবারের সৌজন্যে

২০২০ সালে করোনার কারণে অষ্টম শ্রেণিতে অটোপাস পাওয়ায় নুহার পড়াশোনায় বড় কোনো বিরতি হয়নি। তবে ঢাকায় এসে ক্যানসারের চিকিৎসা ও ফলোআপে ব্যাঘাত ঘটে নিয়মিত পড়াশোনায়। তবু থেমে যাননি নুহা। এসএসসিতে জিপিএ–৫, এইচএসসিতেও জিপিএ–৫ পান। বোর্ডে ১৭তম হয়ে অর্জন করেন ট্যালেন্টপুল বৃত্তি।

ঢাকায় হলি ক্রস কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলেও তিনতলায় ক্লাস করতে হবে—এই বাস্তবতায় সেখানে ভর্তি হতে পারেননি। পরে ভর্তি হন পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজে। একই কারণে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিংও তাঁকে করতে হয়েছে অনলাইনে।

নুহার জন্মের সময় বড় বোন আফরোজা মনি ছিলেন দশম শ্রেণির ছাত্রী। সেই বোনই নুহার সবচেয়ে বড় শক্তি। হাসপাতালে সব সময় পাশে থাকা, পড়াশোনায় তদারকি—সবই করেছেন তিনি। কম্পিউটার সায়েন্সে পড়ুয়া এই বোনই নুহাকে বিভিন্ন বিষয় বুঝিয়ে দিতেন।

নুহা বলেন, বোনের এই সহায়তা না পেলে হয়তো এত ভালো ফল করা সম্ভব হতো না। আর শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাতেও এ কারণে তিনি ভালো ফলাফল করেছেন।

২০২০ সালে করোনার কারণে অষ্টম শ্রেণিতে অটোপাস পাওয়ায় নুহার পড়াশোনায় বড় কোনো বিরতি হয়নি। তবে ঢাকায় এসে ক্যানসারের চিকিৎসা ও ফলোআপে ব্যাঘাত ঘটে নিয়মিত পড়াশোনায়। তবু থেমে যাননি নুহা। এসএসসিতে জিপিএ–৫, এইচএসসিতেও জিপিএ–৫ পান। বোর্ডে ১৭তম হয়ে অর্জন করেন ট্যালেন্টপুল বৃত্তি।

ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর ২০২১ সালের মার্চের মধ্যে শেষ হয় নুহার চিকিৎসা। পায়ে অস্ত্রোপচারের পর দিতে হয় ১২টি কেমোথেরাপি।

নুহা বলেন, ‘বলতে গেলে সে সময় স্কুল-কলেজে গিয়ে এক মাসও ক্লাস করতে পারিনি। শিক্ষকেরা সব সময় পাশে ছিলেন। তাঁরা কখনো বুঝতে দেননি আমি অন্যদের থেকে আলাদা। এসএসসি পরীক্ষার ছয় মাস আগে থেকে পড়া শুরু করি। রিয়া, লোটাস, মাফিয়া—এমন কিছু বন্ধুর সঙ্গে সব সময় প্রতিযোগিতা চলত। ফলে পড়াশোনায় পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। শিক্ষক ও এই বন্ধুদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।’

ভয় আর নতুন করে দাঁড়ানো

নুহার কেমোথেরাপির এক পর্যায়ে ক্যানোলা দেওয়ার মতো ভেইনও পাওয়া যাচ্ছিল না। মাথার চুল পড়ে যাওয়ার যন্ত্রণা ছিল আলাদা।

নুহা বলেন, ‘আমার যে অনেক লম্বা লম্বা চুল ছিল তা নয়। তবে মায়ের মতো মাথায় ঘন চুল ছিল। ওই বয়সে মাথা ন্যাড়া করতে হয়েছিল, মন তো খারাপ হবেই। পরে মাথার চুল আগের চেয়েও ঘন হয়ে গজায়। এখন অবশ্য আবার চুল পড়া শুরু হয়েছে।’

বাংলাদেশেই পা না কেটে অস্টিওসারকোমার চিকিৎসা হচ্ছে এটা অনেকেই বিশ্বাস করতে চান না। ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করেও ভালো থাকা যায়, ভালো ফলাফল করা যায়—নুহা তার প্রমাণ।
মো. সিরাজুস সালেহীন, অধ্যাপক, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর)

তবে চুল পড়ে যাওয়ার চেয়ে নুহা বেশি ভয় পেয়েছিলেন যখন শুনেছিলেন, একটা পা কেটে ফেলতে হতে পারে। তিনি বলেন, পা কেটে ফেলতে হতে পারে শুনে বেশ ভয় পেয়েছিলেন। যদিও পরে তা আর করতে হয়নি। এ কারণে তিনি চিকিৎসক রাশেদ জাহাঙ্গীর কবির ও সিরাজুস সালেহীনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।

চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর এখন পর্যন্ত নুহার শরীরে আর ক্যানসারের কোষ পাওয়া যায়নি। বর্তমানে শারীরিক ও মানসিকভাবে ভালো আছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

বড় ভাই খালিদ মাহমুদের সঙ্গে নুহা, ২০২৩ সালে
ছবি: পরিবারের সৌজন্যে

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) অধ্যাপক মো. সিরাজুস সালেহীন প্রথম আলোকে বলেন, অস্টিওসারকোমায় হাড় ফোলা, ব্যথা ইত্যাদি লক্ষণ প্রকাশ পায়। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে সুফল পাওয়া যায়। অস্ত্রোপচার, রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপিসহ চিকিৎসা শেষে পাঁচ বছর কেউ ভালো থাকলে ক্যানসার মুক্ত বলা হয়।

নুহার সাফল্যের খবরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে এই চিকিৎসক বলেন, ‘এটা খুব ভালো খবর। বাংলাদেশেই পা না কেটে অস্টিওসারকোমার চিকিৎসা হচ্ছে, এটা অনেকেই বিশ্বাস করতে চান না। ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করেও ভালো থাকা যায়, ভালো ফলাফল করা যায়—নুহা তার প্রমাণ।’

ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইটা চালিয়ে যেতে হবে। ভয় পেলে চলবে না। মানসিকভাবে শক্ত থাকতে হবে। ভাবতে হবে এই তো আর কটা দিন। ক্যানসারের চিকিৎসা ব্যয়বহুল। তাই আর্থিক ও মানসিক সহায়তায় পরিবারের মানুষগুলোর পাশে থাকাটা খুব জরুরি।
নুসরাত জাহান নুহা

পরিবার, ঋণ আর লড়াই

নুহার বাবা মো. আকবর আলী খান অবসরপ্রাপ্ত বেসরকারি চাকরিজীবী। মায়ের নাম কামরুন নাহার বেগম। নুহার ক্যানসারের চিকিৎসার মাঝেই শনাক্ত হয় তাঁর মায়ের ক্যানসার। গর্ভাশয় কেটে ফেলতে হয়। ব্যয়বহুল চিকিৎসার জন্য ধারদেনা করতে হয়েছে। এ সময় পাশে দাঁড়িয়েছিলেন আত্মীয়স্বজন। সেই ঋণ এখনো শোধ করছেন বাবা।

নুহারা দুই ভাই, তিন বোন। বড় ভাই খালিদ মাহমুদ খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করেছেন। ফেসবুকে ‘খালিদ স্পিকস’ নামে ইংরেজি শেখানোর একটি পেজ আছে তাঁর। সেখানে অনুসারীর সংখ্যা ৭ লাখ। খালিদ ফেসবুকে বোন নুহার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল ও সংগ্রামের গল্প লিখেছেন। হাজারো মানুষ সেখানে নুহাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন।

এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফল প্রকাশের পর থেকে শুভেচ্ছার বন্যায় ভাসছেন নুহা। ফেসবুক, পথেঘাটে—যেখানেই যাচ্ছেন, মানুষ অভিনন্দন জানাচ্ছেন। নুহা বলেন, এটা খুব ভালো লাগছে।

খালিদ মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, নুহার গানের গলা, কবিতা লেখার হাত আর আঁকাআঁকি ভীষণ ভালো। বাবার স্বপ্ন পূরণে নুহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে পড়তে চাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী খালিদ বলেন, ‘নুহা যদি ক্যানসারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায়, বলুন তো আপনার-আমার অজুহাতটা কোথায়?’

নুহাকে নিয়ে এই দীর্ঘ সংগ্রামে আত্মীয়স্বজন যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে খালিদ বলেন, ‘বাবা বেসরকারি চাকরিজীবী ছিলেন। পরিবারের সদস্যসংখ্যা সাতজন। ঢাকায় এসে বাসা ভাড়া নেওয়া, খাওয়া, চিকিৎসা করানোর খরচে হিমশিম খেতে হয়েছে। চিকিৎসাটা ছিল ব্যয়বহুল। ধারদেনার পাশাপাশি আত্মীয়স্বজনেরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন। বাবা একা থাকলেই চোখ মুছতেন। ধারদেনার টাকা এখনো শোধ করতে হচ্ছে বাবাকে।’

বোনের বিয়েতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নুহা
ছবি: পরিবারের সৌজন্যে

অন্যদের জন্য নুহার বার্তা

মায়ের ক্যানসার। এ ছাড়া নুহার নানা, চাচা ও দুই চাচাতো ভাইয়ের ক্যানসারে মৃত্যু হয়েছে। নিজের শরীরে ক্যানসার নিয়ে কাছ থেকে তাই অনেক অভিজ্ঞতাই অর্জন করেছেন তিনি।

ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করা অন্যদের জন্য কিছু বলতে চান কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ২০ বছর বয়সী তরুণী নুহা বলেন, ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইটা চালিয়ে যেতে হবে। ভয় পেলে চলবে না। মানসিকভাবে শক্ত থাকতে হবে। ভাবতে হবে এই তো আর কটা দিন। ক্যানসারের চিকিৎসা ব্যয়বহুল। তাই আর্থিক ও মানসিক সহায়তায় পরিবারের মানুষগুলোর পাশে থাকাটা খুব জরুরি।

নুহা বলেন, দেশেই এখন ক্যানসারের ভালো চিকিৎসা সম্ভব। শুধু সঠিক জায়গায় সঠিক চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।