দুর্যোগ মোকাবিলায় নারীদের দক্ষতা বাড়ানো অপরিহার্য

‘বাংলাদেশে লিঙ্গভিত্তিক সংবেদনশীল দুর্যোগঝুঁকি হ্রাস’ শিরোনামে ব্র্যাক ও ইউএন উইমেনের একটি প্রকল্প উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত কর্মশালা। ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ছবি: ব্র্যাকের সৌজন্যে

যেকোনো দুর্যোগে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকেন। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। তাই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নারীদের নেতৃত্ব দেওয়ার দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। এটি কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, এটি অপরিহার্য।

মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশে লিঙ্গভিত্তিক সংবেদনশীল দুর্যোগঝুঁকি হ্রাস’ শিরোনামে ব্র্যাক ও ইউএন উইমেনের একটি প্রকল্প উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত কর্মশালায় এ কথা বলেন বক্তারা।

অনুষ্ঠানে ‘বাংলাদেশের নারীদের ওপর রিমালের (ঘূর্ণিঝড়) প্রভাব’ শিরোনামে গত বছরের জুনে প্রকাশিত জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, সামাজিক নানা বিধিনিষেধ আর পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধের কারণে নারীরা দেরিতে আশ্রয়কেন্দ্রে যান, যা তাঁদের আরও বেশি দুর্যোগের ঝুঁকিতে ফেলে। এ ছাড়া প্রচণ্ড ভিড় হওয়া আশ্রয়কেন্দ্রে তাঁদের গোপনীয়তা রক্ষা করা কঠিন হয়। আলোর স্বল্পতা ও যথাযথ পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় নারীরা অনিরাপদ বোধ করেন। এ সময় তাঁদের সহিংসতার শিকার হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এই ঝুঁকি কমাতে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নারীদের ক্ষমতায়ন ও অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কর্মশালায় বলা হয়, এ বাস্তবতায় জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থা ইউনাইটেড নেশন উইমেনের (ইউএন উইমেন) সহযোগিতায় এবং সুইডিশ ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সির (সিডা) আর্থিক সহায়তায় ‘জেন্ডার রেসপন্সিভ ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন ইন বাংলাদেশ (জিআরডিআরআরআইবি)’ শীর্ষক একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে ব্র্যাক।

প্রকল্পটি বাংলাদেশের দুর্যোগ মোকাবিলায় দুর্বলতাগুলো কমিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সবার সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং সহনশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করবে। ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দুর্যোগপ্রবণ জেলা কুড়িগ্রাম, জামালপুর, সুনামগঞ্জ, সিলেট, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী, ভোলা, চট্টগ্রাম, সিরাজগঞ্জ, খুলনা ও সাতক্ষীরায় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এ উদ্যোগের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে একটি জেন্ডার সংবেদনশীল জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা করা। এর পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা এবং স্থানীয় জনসাধারণের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি জেন্ডার ইন হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাকশন (জিআইএচএ) ওয়ার্কিং গ্রুপের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে আরও শক্তিশালী সমন্বয় গড়ে তোলা।

‘বাংলাদেশে লিঙ্গভিত্তিক সংবেদনশীল দুর্যোগঝুঁকি হ্রাস’ শিরোনামে ব্র্যাক ও ইউএন উইমেনের একটি প্রকল্প উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত কর্মশালা। ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
ছবি: ব্র্যাকের সৌজন্যে

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কে এম আবদুল ওয়াদুদ বলেন, দুর্যোগে প্রাণহানির ঘটনা কমলেও অর্থনৈতিক ক্ষতি এখনো অনেক বেশি। দুর্যোগ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রস্তুতি গ্রহণ এবং পূর্বাভাস ও সতর্ক বার্তার আলোকে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ইউএন উইমেন বাংলাদেশের ডেপুটি কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ নবনীতা সিনহা বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলা ও সহনশীলতায় অগ্রণী দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবিলায় নারীরা ইতিমধ্যেই সম্মুখসারিতে কার্যক্রম চালাচ্ছেন। এই নারীদের আরও শক্তিশালী নেতৃত্বের পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে।

সুইডেন দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি মাতিলদা স্ভেনসন বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় জেন্ডার (লিঙ্গভিত্তিক) সমতা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, এটি অপরিহার্য। নারীর নেতৃত্বে দুর্যোগে সহনশীলতা অর্জনের উদ্যোগগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

কর্মশালায় মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী গোলাম তৌসিফ বলেন, নারীরা জনসংখ্যার একটি বড় অংশ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় তাঁদের নেতৃত্বের দক্ষতা বাড়াতে হবে। এ ধরনের প্রকল্প লিঙ্গভিত্তিক সংবেদনশীল দুর্যোগঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকাঠামো গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।

দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি ও পরিকল্পনায় নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে বলে জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান। অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ব্র্যাকের দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন ও নগর উন্নয়ন কর্মসূচির পরিচালক মো. লিয়াকত আলী বলেন, স্থানীয় জনসাধারণ যেন আরও ভালোভাবে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে পারে, সে জন্য সব প্রকল্পে জলবায়ু এবং পূর্বাভাস–সংক্রান্ত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ইউএন উইমেন বাংলাদেশের ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন, ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড হিউম্যানিটেরিয়ান অ্যাকশনসের কর্মসূচিবিশেষজ্ঞ দিলরুবা হায়দার। জিআরডিআরআরআইবি প্রকল্পের লিড আবদুল লতিফ খান মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন।