রেমিট্যান্স যোদ্ধা যাঁদের বলা হয়, তেমন একজন শ্রমিকের মরদেহ এক বছর ধরে বিদেশে থাকা নিয়ে প্রশ্ন আছে। ৯০ দিনের ‘ফ্রি ভিসায়’ সৌদি আরব যাওয়ায় মনির শেখের মরদেহ দেশে পাঠানো নিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানের দায় ছিল না। এদিকে মৃত্যুর খবরের পর খুলনার তেরখাদার উত্তরপাড়ার এ পরিবারটি বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তারা প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় বা দূতাবাসে যায়নি। গত ৩১ জুলাই প্রথম আলোয় মনির শেখের মরদেহ বিদেশের হিমঘরে পড়ে থাকা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

default-image

৩ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মনির শেখর মরদেহ দেশে আনার প্রক্রিয়া কয়েক মাস ধরেই চলছে। এ বছরের মে মাসে সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাস প্রথম জানতে পারে, মরদেহটি এখনো দেশে পাঠানো হয়নি।

দূতাবাসের পক্ষ থেকে কফিলের (সৌদি আরবের নিয়োগকর্তা) সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তিনি সাড়া দেননি। ফলে দূতাবাসের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তাঁর অনলাইন আইডি ব্লক করে দেয়। সংশ্লিষ্ট থানার মাধ্যমে কফিলের কাছ থেকে মর্গ ফি বাবদ ৬ হাজার সৌদি রিয়াল আদায় করে পুলিশ। কফিলের পক্ষ থেকে বাকি টাকা দেওয়ার জন্য সময় চাওয়ায় মরদেহটি হিমঘরে রাখার সময় দীর্ঘায়িত হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাকি ৭ হাজার রিয়াল পরিশোধ করতে হয়েছে বাংলাদেশ দূতাবাসকেই। মনির শেখের মরদেহ বৃহস্পতিবার দেশে ফিরিয়ে আনার খবর প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম।

এক বছর তিন মাসের মধ্যে কেউ দাবি না জানালে সৌদি সরকার সাধারণত বেওয়ারিশ হিসেবে মরদেহ দাফন করে বা কোনো মেডিকেল কলেজকে দান করে দেয়। ফলে মনির শেখের মরদেহ পরিবারের পক্ষ থেকে খুঁজে পাওয়ার জন্য সময় ছিল আর মাত্র তিন মাস। সাধারণত প্রবাসী শ্রমিকের দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে পরিবারের যে অর্থ পাওয়ার কথা, তা এ পরিবার পাবে না। স্বাভাবিক মৃত্যুর কারণে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ‘ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ তহবিল’ থেকে তিন লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা রয়েছে।

default-image

মনির শেখের মৃত্যুর এক বছর পর এক দিনের মধ্যে ওয়ারিশের কাগজপত্র জোগাড় করে তেরখাদা থেকে রাজধানীতে এসে মরদেহ গ্রহণ করার মতো পরিস্থিতি ছিল না পরিবারটির। এ সময় তাদের পাশে দাঁড়ায় সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস মুভমেন্ট- সিএইচআরএম নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। মরদেহ গ্রহণ থেকে শুরু করে খুলনায় বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নেয় তারা। সিএইচআরএম-এর নির্বাহী প্রধান মুজাহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই পরিবারটির পক্ষে ক্ষতিপূরণের টাকা বুঝে নেওয়ার অবস্থাও নেই। কিন্তু ছোট তিন সন্তান নিয়ে পুরোপুরি অসহায় অবস্থায় আছেন মনির শেখের স্ত্রী জেছমিন বেগম। মৃত মনির শেখের বাক্‌শক্তি হারানো পিতা আবদুল হামিদ শেখ আর মা রেনু বেগমের জন্যও এ টাকাটা পাওয়া খুব জরুরি।’

এক বছর ধরে পরিবারটির হয়ে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করতে মনির শেখের ভাইদের পাশাপাশি এগিয়ে এসেছিলেন তেরখাদা সরকারি নর্থ খুলনা কলেজের শিক্ষক রবিউল ইসলাম রাজু। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, মনির শেখের মেজ মেয়ে মিলিনা অষ্টম শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী। তিন সন্তানকে পড়ালেখা করানো সম্ভব হলে একদিন হয়তো পরিবারটি স্বনির্ভর হতে পারবে।

এক বছর পর স্বামীর মরদেহ দাফনের পর প্রথম আলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন মনির শেখের স্ত্রী জেছমিন বেগম। তিনি অনুরোধ করেন, তাঁর সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে হলেও যেন পাওনা টাকাটা যত দ্রুত সম্ভব বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন