বিডিআর সদস্যদের হত্যা করেন জিয়াউল, সিমেন্টের বস্তার সঙ্গে বেঁধে লাশ ফেলেন নদীতে

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকোলাজ: বাসস

মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান ৮–১০ জন বিডিআর সদস্যকে হত্যা করেছিলেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন সেনাসদস্য ইমরুল কায়েস। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ রোববার তিনি এমন জবানবন্দি দেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শতাধিক ব্যক্তিকে গুম করে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে পঞ্চম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন ইমরুল কায়েস। তিনি বর্তমানে রংপুর সেনানিবাসে ওয়ারেন্ট অফিসার হিসেবে কর্মরত। ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত র‌্যাব হেডকোয়ার্টারে ইমরুল কায়েস প্রেষণে কর্মরত ছিলেন। সে সময় তিনি জিয়াউল আহসানের রানার বা বডিগার্ড হিসেবে কাজ করেছেন। ২০০১ সালে তিনি সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে যোগদান করেছিলেন।

জিয়াউল আহসান এ মামলার একমাত্র আসামি। এদিন তাঁকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। ইমরুল কায়েস সেনাবাহিনীর পোশাক পরে জবানবন্দি দেন।

জবানবন্দিতে ইমরুল কায়েস বলেন, ২০০৯ সালে বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর পলাতক বিডিআর সদস্যদের ধরার জন্য সারা দেশে ‘অপারেশন রেবেল হান্ট’ নামে একটি অপারেশন পরিচালনা করা হয়। সে সময় জিয়াউল আহসান ৮–১০ জন বিডিআর সদস্যকে হত্যা করেন। বিডিআর সদস্যদের দুইভাবে হত্যা করা হয়। একটি ছিল ইনজেকশন দিয়ে। আরেকটি ছিল পোস্তগোলা ব্রিজের কাছে থাকা সেনা ক্যাম্পের ভেতর দিয়ে বোটে (নৌকা) করে ভুক্তভোগীদের নদীতে আনা হয়। সিমেন্ট ভরা একটি বস্তা নিচে রাখা হতো, তার ওপর ভুক্তভোগী ব্যক্তিকে রাখা হতো, তার ওপর আরেকটি সিমেন্ট ভরা বস্তা রেখে রশি দিয়ে পেঁচিয়ে বেঁধে ফেলা হতো। পরে মাথায় গুলি করে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো।

ইলিয়াস আলী প্রসঙ্গ

জবানবন্দিতে ইমরুল কায়েস বলেন, ২০১২ সালের সম্ভবত ১৩ এপ্রিল র‌্যাব হেডকোয়ার্টার থেকে একটি মাইক্রোবাসে করে জিয়াউল আহসান, মেজর নওশাদ, স্কোয়াড্রন লিডার সাইফসহ তাঁরা মহাখালী উড়ালসড়কের কাছে যান। কাকে গাড়িতে তোলা হবে, তা তিনি জানতেন না। জিয়াউল গাড়িতে বসে বিভিন্ন জায়গায় ফোন করছিলেন ‘টার্গেট’ কখন আসবে, তা জানার জন্য। একপর্যায়ে জানা যায়, টার্গেট আসবে না। পরদিন থেকে তিনি ৯ দিনের ছুটিতে যান। ছুটিতে থাকা অবস্থায় গণমাধ্যমে জানতে পারেন, ইলিয়াস আলী নামের বিএনপির এক নেতাকে মহাখালী উড়ালসড়কের ওখান থেকে অপহরণ করা হয়েছে।

ছুটি শেষে ২৩ এপ্রিল যখন কর্মস্থলে যোগ দেন, তখন র‌্যাব হেডকোয়ার্টারে থমথমে পরিবেশ লক্ষ করেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন ইমরুল কায়েস। তিনি বলেন, অন্য সদস্যদের মাধ্যমে জানতে পারেন, অস্ত্রাগারের অস্ত্রের ইন-আউট রেজিস্টার এবং সিসিটিভি ফুটেজ জিয়াউল হক নষ্ট করে ফেলেন।

একদিন জিয়াউল ফোনে কথা বলছিলেন উল্লেখ করে ইমরুল কায়েস বলেন, সে সময় অন্য একটি কল এলে জিয়াউল বলেন, ‘তুই রাখ, তারিক স্যার (সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক) ফোন দিয়েছেন।’ তারিকের সঙ্গে কথা বলা শুরু করেন জিয়াউল। অভিযোগের সুরে জিয়াউল বলছিলেন, ‘স্যার, আপনাদের কথামতো ইলিয়াসকে গলফ করলাম, এখন আপনারা এমন করলে হবে! এর চেয়ে আমি কমান্ডো মানুষ, আমাকে জঙ্গলে পোস্টিং দিয়ে পাঠাই দেন, এটাই আমার ভালো।’

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বাড়তি সুবিধা পেতেন জিয়াউল

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে জিয়াউল আহসানের ভালো সম্পর্ক তৈরি হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন সাক্ষী ইমরুল কায়েস। তিনি বলেন, জিয়াউল যখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যেতেন, তখন তাঁর গাড়িতে অস্ত্র-গোলাবারুদ থাকত। কিন্তু জিয়াউলের গাড়ি বিধায় তা তল্লাশি করা হতো না।

ভারত থেকে আসা দুজনকে হত্যা

সেনাসদস্য ইমরুল কায়েস জবানবন্দিতে বলেন, র‌্যাব-১–এর টিএফআই সেল থেকে দুজন আসামি নিয়ে ২০১২ সালের মাঝামাঝি একদিন জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে জাফলং সীমান্তে যান তাঁরা। সেদিন মধ্যরাতে ভারত থেকে বেসামরিক পোশাকে চার–পাঁচজন এসে তাঁদের কাছে দুজন আসামি হস্তান্তর করেন। আর তাঁদের কাছে থাকা দুজন আসামিকে ভারত থেকে আসা ব্যক্তিদের কাছে হস্তান্তর করেন। ভারত থেকে পাওয়া দুজন আসামি নিয়ে তাঁরা ঢাকার উদ্দেশে রওনা করেন। জাফলং সীমান্ত থেকে ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার আসার পর গাড়ি থেকে একজন আসামিকে নামানো হয়। জিয়াউল আহসান তাঁকে গুলি করে রাস্তার পাশে ফেলে দেন। আরও ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার যাওয়ার পর অন্য আসামিকেও জিয়াউল একইভাবে গুলি করে হত্যা করেন।

১১ জনকে হত্যা

জবানবন্দিতে ইমরুল কায়েস বলেন, ২০১২ সালের প্রথমের দিকে জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে ১১ আসামি নিয়ে পোস্তগোলা সেনা ক্যাম্পে যান তাঁরা। সব আসামিকে বোটে (নৌকা) উঠানো হয়। তখন হঠাৎ একজন আসামি পানিতে ঝাঁপ দেন। জিয়াউলের আদেশে তিনি (সাক্ষী) পানিতে ঝাঁপ দিয়ে সেই আসামিকে ধরেন। বোটটি নদীর মাঝখানে নিয়ে ১১ জনকে হত্যা করে সিমেন্টের বস্তার সঙ্গে বেঁধে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়।

গুলিতে চুলে আগুন

১১ জনকে হত্যার বেশ কিছুদিন পর র‌্যাব-৪–এর সেফ হাউস থেকে দুজন আসামিকে দুটি মাইক্রোবাসে নেওয়া হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন ইমরুল কায়েস। তিনি বলেন, আধা ঘণ্টা চলার পর তিনি যে গাড়িতে ছিলেন, সেখান থেকে একজন আসামিকে নামানো হয়। তিনি গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। জিয়াউল ওই আসামিকে নিয়ে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে হত্যা করেন। ওই আসামির মাথায় অনেক চুল ছিল। চুল থাকায় মাথায় আগুন ধরে গিয়েছিল। তা দেখে উপস্থিত সবাই হাসাহাসি করেন।

লাশ রেললাইনের ওপর রাখা

ইমরুল কায়েস জবানবন্দিতে বলেন, তিনি রানার হিসেবে যোগদান করার ২০ থেকে ২৫ দিন পর একদিন রাতে জিয়াউল আহসান তাঁকে ফোন করে র‌্যাব–১–এর সামনে আসতে বলেন। র‌্যাব-১–এর সামনে থাকা দুটি মাইক্রোবাসের একটিতে তাঁকে উঠতে বলেন জিয়াউল। ওই গাড়িতে র‌্যাব-১–এর সিও রাশেদ ও ক্যাপ্টেন কাউসার ছিলেন। তাঁরা টঙ্গীর দিকে আহসান উল্লাহ উড়ালসড়কের ওপর দিয়ে ডানদিকে মোড় নিয়ে বেশ কিছু দূর যান। যাওয়ার পর সেখানে একটি রেলক্রসিং পড়ে এবং সেখানে তাঁদের গাড়ি থামে। তখন জিয়াউল তাঁকে বলেন, ‘ইমরুল ডিক্কিটা খুল, বস্তাটা বের কর।’ তিনি ডিক্কি খুলে বস্তা নামানোর উদ্দেশ্যে হাত দিলে দেখেন সেটি বস্তা না; বরং একটা ডেড বডি, যা ঠান্ডা ছিল। প্রথমে তিনি ভয় পেয়ে যান। সঙ্গে যাঁরা ছিলেন তাঁদের সহায়তায় বডিটা রেললাইনের পাশে নিয়ে রাখেন। পরে জিয়াউলসহ অন্যরা বডিটা রেললাইনের ওপর রাখেন।

সুন্দরবনে অভিযান

জিয়াউল আহসানের সঙ্গে সুন্দরবনে কয়েকবার অভিযানে যান বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন ইমরুল কায়েস। এর মধ্যে একটি অভিযানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁদের সঙ্গে র‌্যাব-৮–এর সদস্যরাও ছিলেন। তাঁদের বোট থামার পর জঙ্গলের ভেতর থেকে দু–তিনটি গুলির শব্দ শুনতে পান। ফায়ার করার নির্দেশ দেওয়া হলে তাঁরা (র‌্যাব ইন্টেলিজেন্সের সদস্যরা) ও র‌্যাব-৮–এর সদস্যরা গুলি করেন। একপর্যায়ে তাঁরা জঙ্গলের ভেতরের দিকে যান এবং দেখেন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দু–তিনটি লাশ পড়ে আছে। গাছের ডালপালা দিয়ে সেখানে একটি হাঁটার রাস্তা দেখতে পান। রাস্তার দুই পাশ গাছের ডাল দিয়ে তৈরি ছোট ছোট ঘর ছিল। সেখানে একটি ছাগলও ছিল। ছাগলটি তাঁরা দুপুরে জবাই করে খান। এ অভিযান তাঁর কাছে সাজানো মনে হয়েছিল।

লাশ চাকু দিয়ে চিরে ফেলা হতো

ইমরুল কায়েস বলেন, তিনি বেশ কয়েকবার জিয়াউল আহসানের সঙ্গে বরিশালে গিয়েছিলেন এবং র‌্যাব-৮–এর সহযোগিতায় পাথরঘাটায় চরদুয়ানি বাজার থেকে বলেশ্বর নদের ভেতরে সাগরের মোহনায় গিয়ে কখনো দুজন, কখনো তিনজন, কখনো চারজন টার্গেটকে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে গুলি করে হত্যা করে লাশ পানিতে ফেলে দেওয়া হতো। বস্তা বেঁধে লাশ পানিতে ফেলার আগে তাঁদের পেট কমান্ডো নাইফ (চাকু) দিয়ে চিরে ফেলা হতো।

‘আমি নিরাপত্তা চাই’

ইমরুল কায়েস জবানবন্দিতে বলেন, তিনি র‌্যাব থেকে চলে যাওয়ার পর স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেননি (সাক্ষী এ সময় কান্না করেন)। তিনি দেশের জন্য শপথ গ্রহণ করেছেন, প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। তবে তা কখনোই দেশের মানুষকে হত্যা করার জন্য নয়। তিনি রানার হিসেবে তাঁর সঙ্গে দেখেছেন জিয়াউল ওই সময় ১৫০ থেকে ২০০ জন মানুষকে বিভিন্নভাবে হত্যা করেছেন।

ইমরুল কায়েস আরও বলেন, ‘আমি বিবেকের তাড়নায় এবং সুষ্ঠু বিচারের স্বার্থে জবানবন্দি প্রদান করেছি। আমি ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করি। কোনো সৈনিককে কখনই যেন আমার মতো পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে না হয়।’

রংপুর সেনানিবাসে ওয়ারেন্ট অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন উল্লেখ করে ইমরুল কায়েস বলেন, ‘আমি সাক্ষ্য দিয়েছি, এখন আমি নিরাপত্তা চাই।’