গোসম্পদের এমন বাড়ন্ত দেখে বোধ হয় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেছিলেন, ‘দেশের মানুষ চাইলে এখন তিন বেলা মাংস খেতে পারে।’

দেশে গরুর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে মাংসের জোগান বেড়েছে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সবার হাতের মুঠোয় মাংস আপসে আপ চলে আসবে না। এটি বুঝতে মহাশূন্যে যাওয়ার দরকার নেই। মন্ত্রীর এসব কথা বলার জন্য বলা। অবশ্য আজকের আলোচনার বিষয় এটি নয়। বিকাশমান প্রাণিসম্পদ খাত হঠাৎই ধাক্কা খেয়েছে। ঘুরপাক খাচ্ছে সংকটের আবর্তে। দেশের প্রায় সব জেলায় লাম্পি স্কিন রোগ (এলএসডি) ছড়িয়ে পড়েছে। গরু মারা যাচ্ছে। আক্রান্ত গরুর দুধ কমে যাচ্ছে। এই রোগ চিন্তায় ফেলে দিয়েছে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।

যত দূর জানা যায়, ২০১৬ সালের দিকে প্রথম দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ঝিনাইদহ, যশোর জেলায় গরুর মধ্যে এলএসডি শনাক্ত হয়। ভারত থেকে এই রোগ দেশের গরুর মধ্যে ছড়িয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

এলএসডি কী, কীভাবে ছড়ায়  

প্রাণিবিজ্ঞানীরা বলছেন, এলএসডি একধরনের ভাইরাসজনিত রোগ। এটি গরুর একধরনের চর্মরোগ। বিভিন্ন কীটপতঙ্গ যেমন মশা ও বিশেষ প্রজাতির মাছি ইত্যাদির মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায়। এ ধরনের কীটপতঙ্গ আক্রান্ত গরুকে দংশন করার পর অন্য একটি সুস্থ গরুকে দংশন করলে সেই গরুটিও আক্রান্ত হয়। আবার আক্রান্ত গরুর লালা খাবারে মিশে এবং খামার পরিচর্যাকারী ব্যক্তির কাপড়চোপড়ের মাধ্যমে ছড়াতে পারে।

আক্রান্ত গাভির দুধেও এই ভাইরাস বিদ্যমান। তাই আক্রান্ত গাভির দুধ খেয়ে বাছুর আক্রান্ত হতে পারে। আক্রান্ত গরুতে ব্যবহার করা সিরিঞ্জ থেকেও ভাইরাস ছড়াতে পারে। আক্রান্ত গরুর সিমেনও (বীর্য) এই রোগের অন্যতম বাহন। প্রাণিচিকিৎসকেরা বলেন, প্রাথমিক অবস্থায় এ রোগের লক্ষণ হলো জ্বর। এরপর ত্বকের ওপরে বড় মাপের ফোড়া বা গোটা তৈরি হয়। মানুষের জলবসন্ত হলে যেমন হয়, এটি অনেকটা তার কাছাকাছি। শরীরজুড়েই গোটা তৈরি হতে থাকে। কয়েক দিনের মাথায় সেগুলো ফেটে তরল নিঃসৃত হতে থাকে। এর কিছুদিন পরে ওই গোটা বা ঘা ধীরে ধীরে শুকায়।

এলএসডি সব গরুর ক্ষেত্রে এক রকম নয়। কোনো কোনো গরু বিশেষ করে যেসব গরু প্রথমবার আক্রান্ত হয়, তাদের ক্ষেত্রে এই রোগ মারাত্মক আকার নিতে পারে। এমন ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার বেশি। আক্রান্ত গরুর শরীরে ফোসকা পড়ে যায়। কোনো গরুর পা, অণ্ডকোষ ফুলে যায়, কোনো গরুর গলায় ঘা হয়। কিছু কিছু আক্রান্ত গরুর চামড়ার নিচে পচন ধরে।

সঠিক চিকিৎসা না হলে গরু দুর্বল হয়ে যায়। এ অবস্থায় গরুর মৃত্যুসহ নানা মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি হয়। অনেক গরুর চোখ দিয়ে অনবরত পানি ঝরে, এতে চোখ অন্ধ হয়ে যেতে পারে। গর্ভবতী প্রাণীদের গর্ভপাত হতে পারে। রোগের তীব্রতা কম হলে যথাযথ চিকিৎসায় এক-দুই সপ্তাহের মধ্যে এবং তীব্রতা বেশি হলে এক থেকে দেড় মাসে আক্রান্ত গরু সুস্থ হয়ে ওঠে।

কীভাবে মোকাবিলা করছেন খামারিরা

গ্রামের বেশির ভাগ কৃষক ও খামারি না বুঝেই হাতুড়ে চিকিৎসক দিয়ে গরুর চিকিৎসা করছেন। এর ফলে রোগ সেরে যাওয়ার পরও অনেক গরু নানা জটিলতায় ভোগে। রোগটির চিকিৎসা প্রটোকল নিয়ে মাঠপর্যায়ের চিকিৎসকদের মধ্যে সংশয় আছে।

দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর শিবনগর ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামের ফেরদৌস আলী উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পশুচিকিৎসককে দিয়ে চিকিৎসা করিয়েও গরুগুলো বাঁচাতে পারেননি। এক সপ্তাহের মধ্যে তাঁর তিনটি গরু মারা যায়। এতে আতঙ্কিত হয়ে তিনি তাঁর অন্য পাঁচটি গরু কম দামে বিক্রি করে দেন।

ভারতীয় বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জানা যায়, এই রোগের কোনো টিকা বা প্রতিষেধক এখনো তৈরি হয়নি। ফলে এটি প্রতিরোধের আপাতত কোনো উপায় নেই। তবে এই রোগে আক্রান্ত হলে প্রাণীকে সুস্থ করে তুলতে চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। লাম্পি স্কিন রোগ বা এলএসডিতে ব্যাপকভাবে আক্রান্ত রাজস্থান ও গুজরাট রাজ্যে সেই ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

তবে আমাদের কৃষি তথ্য সার্ভিসের (এআইএস) ওয়েবসাইট অবশ্য বলছে, ‘আক্রান্ত গরুকে সুস্থ করে তুলতে নিয়মিত এলএসডি টিকা দেওয়া যায়। এর আগে আমাদের দেশে রোগটির প্রাদুর্ভাব কম দেখা গেছে। তাই এই রোগের টিকা সহজলভ্য নয়।’

যশোরের কেশবপুরের প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা বলছেন, গরুর লাম্পি স্কিন রোগের এখনো কোনো টিকা তৈরি হয়নি। টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা গণমাধ্যমের কাছে এই রোগের বিস্তারের কথা স্বীকার করে বলেন, নতুন এই রোগের চিকিৎসায় সরকারি ব্যবস্থা এখনো অপর্যাপ্ত। বেসরকারি পর্যায়ে বিদেশি টিকা আমদানি হচ্ছে। তবে তুলনামূলক কম। বাজারে টিকার সংকটের মধ্যেও গরুকে লাম্পি স্কিন রোগের ক্ষতি থেকে বাঁচাতে খামারে খামারে টিকা দেওয়া হচ্ছে।

কেউ বলছেন টিকা এখনো তৈরি হয়নি। আবার কেউ বলছেন, খামারে খামারে টিকা দিচ্ছেন। আসলে টিকার নামে খামারিদের মিথ্যা সান্ত্বনা দেওয়া হচ্ছে কি না, কে জানে? যত দূর জানা গেছে, এলএসডির টিকা বলে ব্যবহার করা কথিত টিকাটি আসলে গোটপক্স টিকা।

এ অবস্থায় নিরুপায় খামারি আর আক্রান্ত গরুর মালিকেরা বাধ্য হয়ে কবিরাজি চিকিৎসার দিকে ঝুঁকছেন। আক্রান্ত গরুর গায়ে নিম, নিশিন্দার পাতা, হলুদবাটা মাখাচ্ছেন। এতে খরচ আর পেরেশানি বাড়ছে, কিন্তু গরু সুস্থ হচ্ছে না।

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জের বাহাগিলি ইউনিয়নের উত্তর দুরাকুটি পশ্চিমপাড়া গ্রামের খামারি ফেরদৌস মিয়া বলেন, ‘আমার খামারে ১০টি গরু আছে। প্রথমে একটি গরু আক্রান্ত হলে চিকিৎসা শুরু করি। এ পর্যন্ত ৮–১০ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। রোগ সারা দূরে থাক, আস্তে আস্তে বাকি গরুগুলোর মধ্যেও এই রোগ দেখা দিয়েছে।’

বিস্তার কতটা  

২০২০ সালে প্রায় ২৫টি জেলায় এলএসডির প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল। এবার বিস্তার আরও বেশি। বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের ধারণা, কমপক্ষে ৫০টি জেলায় লাম্পি স্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।

তাদের হিসাবে, সারা দেশে সাড়ে তিন লাখের বেশি গরু–মহিষ এই রোগে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত। অনেক গৃহস্থ বা নিবন্ধনহীন খামারি নিজেদের মতো করে চিকিৎসা দেওয়ায় সঠিক তথ্য পাওয়া মুশকিল। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর চেষ্টা চালিয়ে গেলেও এখনো আক্রান্ত গরুর হিসাব চূড়ান্ত করতে পারেনি।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শুধু ঝিনাইদহের ছয় উপজেলায় প্রায় ১০ হাজার গরু এলএসডিতে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে পাঁচ শ গরু মারা গেছে। সীমান্তবর্তী জেলা মেহেরপুরের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ওই জেলায় প্রায় প্রতিটি খামার ও কৃষকের ঘরে লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত গরু রয়েছে। গত শনিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত শতাধিক গরু মারা গেছে।

দেশের উত্তরাঞ্চলীয় নীলফামারী, নাটোর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা প্রভৃতি জেলায় ব্যাপক হারে এলএসডি ছড়িয়ে পড়েছে। নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ, দিনাজপুরের ফুলবাড়ী, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা এই রোগের হটস্পটে পরিণত হয়েছে। গোবিন্দগঞ্জের সাপমারা ইউনিয়নের কোগারিয়া, জিরাই, কোটালপুর ও মাল্লাসহ কয়েকটি গ্রামে ইতিমধ্যে অন্তত ২১টি গরু মারা গেছে।

দেশের দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলীয় চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ গরু এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে। এই জেলায় ছোট–বড় মিলে প্রায় ৩২ হাজার খামারি আছেন। এর মধ্যে যশোরের কেশবপুর উপজেলার সব কটি ইউনিয়নের গরু এলএসডিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

টাঙ্গাইলের মধুপুর ও ময়মনসিংহের গৌরীপুরে গবাদিপশুর মধ্যে মহামারি আকারে এলএসডির প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এসব উপজেলায় প্রতিদিনেই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। গরু–মহিষের মৃত্যুর খবরও পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিদিন শুধু প্রাণিসম্পদ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আনা হচ্ছে ১৫০ থেকে ২০০ গরু-বাছুর।

হাসপাতালের নাগালে বাইরে যারা

জেলা-উপজেলার হাসপাতালগুলো তাদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও যথাসাধ্য সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু সবার কাছে তাদের সেবা পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। উপজেলা কেন্দ্র থেকে দূরের এলাকায় বসবাসকারী মানুষের পক্ষে গরু-মহিষ নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া কঠিন।

সেই আর্থিক সংগতি অনেকের নেই। ইচ্ছা আর প্রয়োজন থাকলেও চিকিৎসকেরা হাসপাতালের বাইরে যেতে পারেন না। উপজেলা পর্যায়ের একজন পশুচিকিৎসক যেমন জানালেন, গ্রামপর্যায়ে চিকিৎসা দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা তাঁদের নেই। কারও গবাদিপশুর চিকিৎসা করাতে হলে তাদের কাছেই আসতে হবে।

ওই চিকিৎসকের মতে, লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত গরুর চিকিৎসার ক্ষেত্রে বেশ সতর্ক থাকতে হয়। যেমন অসুস্থ গরুকে ইনজেকশন দেওয়ার পর একই সিরিঞ্জ অন্য গরুর শরীরে ব্যবহার করা যাবে না। এতে অন্য গরুও আক্রান্ত হতে পারে।

এলএসডি মোকাবিলায় উপায় কী

এলএসডি মোকাবিলা ও বিস্তার রোধে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে ২০২০ সালের ১৭ জুন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেয় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় এলএসডির প্রাদুর্ভাব রয়েছে, এমন এলাকার প্রতিটি ইউনিয়নে একজন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা অথবা একজন পশুচিকিৎসক অথবা একজন প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তার নেতৃত্বে উপসহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা অথবা ভেটেরিনারি ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট অথবা ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্টের (এআই) সমন্বয়ে পশু চিকিৎসা দল (ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম) গঠনের কথা বলা হয়। এলএসডিতে আক্রান্ত প্রতিটি গবাদিপশু সরাসরি দেখে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে চিকিৎসা দলকে বলা হয়েছিল।

মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় আরও বলা হয়, চিকিৎসাকাজ সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও তদারকির জন্য বিভাগীয় ও জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা দায়িত্ব থাকবেন।

প্রয়োজনে পার্শ্ববর্তী জেলা বা উপজেলা থেকে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের সমন্বয়ে চিকিৎসা দল এলএসডি–কবলিত এলাকায় কাজ করবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রাণিসম্পদ দপ্তরকে প্রতিদিন চিকিৎসাধীন গবাদিপশুর মালিকের নাম, মুঠোফোন নম্বরসহ ঠিকানাসংবলিত তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে বলা হয়েছিল।

সব বিবেচনায় ২০২০ সালের তুলনায় এবারের পরিস্থিতি বেশ নাজুক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা দলের কোনো বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে এলএসডি নিয়ে আমাদের ব্যাপক গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ ধারাবাহিকভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

প্রয়োজন একটা চিকিৎসা প্রটোকল তৈরি ও সেটির অনুসরণ। এই রোগ ফিরে ফিরে আসছে। তবে এর সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে একটা ধারণা তৈরি হয়েছে। এখন এসব তথ্য সতর্কবার্তা আকারে প্রচারমাধ্যমে প্রচার করা প্রয়োজন। সচেতনতা বাড়িয়েও একটা সার্থক প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়।

গওহার নঈম ওয়ারা লেখক ও গবেষক

ই–মেইল: [email protected]

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন