খোলা আকাশের নিচে লাখ লাখ মানুষের মধ্যে রাতভর অদ্ভুত নীরবতা
গত বছর হজের সময় এমন অসংখ্য মুহূর্ত ছিল, যা জীবনে ভোলার নয়। প্রথমবার কাবা শরিফ দেখার অনুভূতি, মহানবী (সা.)-এর রওজা মোবারকের পাশে রিয়াজুল জান্নাতে নামাজ আদায় কিংবা তপ্ত গরমে কাবার বাইরে জুমার নামাজ—সবই আজও মনে গেঁথে আছে। কিন্তু সেই দীর্ঘ সফরের অন্য রকম একটি হয়ে আছে মুজদালিফার রাত। সে রাতের কথা এ জীবনে ভুলব না।
আরাফাতের ময়দানে দিনভর দোয়া, কান্না আর মহান আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের পর সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছিল মুজদালিফার পথে যাত্রা। মরুর বুকে তখন শুধু মানুষের ঢল। কেউ বাসে, কেউ হেঁটে, কেউ ক্লান্ত শরীরে তালবিয়া পড়তে পড়তে এগিয়ে চলেছেন, ‘লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক...।’ সেই ধ্বনি যেন রাতের আকাশেও ভেসে ছিল।
আরাফাত থেকে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। বিভিন্ন জায়গায় চেষ্টা করেও বাস থামতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত এক পাকিস্তানি বাসচালক আমাদের নামিয়ে দিলেন মিনার কাছাকাছি, মুজদালিফার শেষ সীমানায়। একটি ফ্লাইওভারের ওপর নামলাম আমরা। ওপর থেকে নিচে তাকিয়ে হঠাৎ মনে হলো, নিচে যেন সাদা এক সমুদ্র। যেদিকে চোখ যায়, শুধু ইহরাম পরা হাজি। শুকনা খাবার, পানির বোতল আর ব্যাগ হাতে আমরা ধীরে ধীরে নিচে নামছিলাম। তখনই বুঝলাম, এ রাতটা অন্য রকম হতে যাচ্ছে। আমরা খুব ক্লান্ত ছিলাম।
মুজদালিফা মূলত মক্কার কাছে মিনার পথে এক বিশাল খোলা প্রান্তর। এটি কোনো নির্দিষ্ট মাঠ নয়; বরং বিস্তীর্ণ এক এলাকা, যার সীমানা নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। এখানে নেই কোনো হোটেল, নেই কোনো তাঁবু। শুধু বিভিন্ন জায়গায় নারী-পুরুষের জন্য আলাদা ওয়াশরুমের ব্যবস্থা। খোলা আকাশের নিচেই কাটাতে হয় রাত। এটাই নিয়ম। মাটি হয়ে যায় বিছানা, আকাশ হয়ে যায় চাদর।
চারদিকে তখন শুধু মানুষ আর মানুষ। পাহাড়ের ঢল, খোলা মাঠ—যেদিকে চোখ যায়, শুধু হাজিদের উপস্থিতি। অথচ সেই বিশাল জনসমুদ্রেও ছিল অদ্ভুত এক নীরবতা। এশার নামাজ পড়লাম জামাতে। কেউ জায়নামাজে বসে দোয়া করছেন, কেউ কোরআন তিলাওয়াত করছেন, কেউবা ক্লান্ত শরীরে শুয়ে পড়েছেন খোলা মাটিতে।
একটা বিষয় খুব গভীরভাবে খেয়াল করেছিলাম, হজ-সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোয় খাবার ও পানির যেন কোনো সংকট হয় না। কোথা থেকে যেন কেউ না কেউ এসে পানির বোতল এগিয়ে দিচ্ছেন, খাবার বিতরণ করছেন। এত মানুষের ভিড়, অথচ কেউ যেন অভুক্ত বা তৃষ্ণার্ত থাকছেন না।
আমাদের আশপাশে ছিল নানা দেশের মানুষ। ঠিক পাশেই ভারতের কেরলম অঞ্চলের কাফেলা, আরেকটু দূরে ইন্দোনেশিয়ার। নানা ভাষা, নানা বর্ণ, নানা সংস্কৃতি। কিন্তু সেই রাতে মনে হচ্ছিল, সবাই যেন একই পরিবারের মানুষ।
পাশেই দেখলাম উপমহাদেশের একজন খ্যাতিমান ইসলামি বক্তা মাটিতে শুয়ে আছেন। কোনো বিশেষ আয়োজন নেই, কোনো আলাদা ব্যবস্থা নেই। সেই দৃশ্যটা হঠাৎ মনে করিয়ে দিল, হজ মানুষকে আসলে কতটা সমান করে দেয়। সব ভেদাভেদ গুছিয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয়, মানুষ মূলত নিঃস্ব—আসলে কিছুই তার নিজের নয়।
কর্তৃপক্ষ অনেক জায়গায় কার্পেট বিছিয়ে রেখেছিল। আমরা অবশ্য কার্পেট পাইনি। একটা খোলা জায়গাই বেছে নিয়েছিলাম। কেউ ব্যাগকে বালিশ বানিয়েছেন, কারও ইহরামই চাদর। দূরে দূরে গাড়ির শব্দ, মানুষের ফিসফাস আর তালবিয়ার মৃদু ধ্বনি—সব মিলিয়ে রাতটা যেন পৃথিবীর নয়, অন্য কোনো জগতের।
মুজদালিফার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো—ছোট ছোট পাথর সংগ্রহ করা। মিনায় শয়তানকে প্রতীকী পাথর নিক্ষেপের জন্য এখান থেকেই কঙ্কর কুড়িয়ে নিতে হয়। আমরা হিসাব করে কঙ্কর কুড়িয়ে নিয়েছিলাম।
সে রাতে খোলা আকাশের নিচে গভীর ঘুম হয়েছিল। ভাবতেই পারিনি, এমন ঘুমেও এত প্রশান্তি থাকতে পারে। ফজরের নামাজের সেই মুহূর্ত আজও ভুলতে পারি না। পাথুরে জমিনে পাতলা জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়ছিলাম। কোথাও সমতল নেই, কোথাও আরাম নেই। পায়ে পাথরের খোঁচা, সিজদায় গেলে কোপালেও খোঁচা লাগে। তবু মনে হচ্ছিল, জীবনের সবচেয়ে প্রশান্ত এক ভোরে দাঁড়িয়ে আছি। এত কষ্টের মাঝেও হৃদয়ের ভেতর এক অদ্ভুত শান্তি কাজ করছিল।
পরদিন ১০ জিলহজ। যেমনটি আজকে মক্কার দিন। হজের সবচেয়ে ব্যস্ত দিন, ঈদুল আজহার দিনও। ফজরের নামাজের পরই আমরা রওনা দিলাম জামারার উদ্দেশে। তখনো হালকা ঠান্ডা। একটু পরপর স্থানীয় মানুষ, পুলিশ কিংবা স্বেচ্ছাসেবকেরা ঈদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছিলেন। কেউ ঠান্ডা পানি দিচ্ছেন, কেউ ফুল, কেউ আবার হাসিমুখে হাজিদের মুখে পানি ছিটিয়ে দিচ্ছেন। ছোট ছোট এসব দৃশ্য আজও হৃদয়ে রয়ে গেছে।
রোদের তেজ বৃদ্ধির আগেই পৌঁছে গেলাম জামারায়। হাজিদের প্রথম কাজ ছিল বড় জামারায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করা। চারদিকে তখন মানুষের ঢল। কেউ আবেগে, কেউ ধীরভাবে কঙ্কর ছুড়ছেন।
হজের এই কয়েক দিনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হাঁটতে হয় এই দিনেই। জামারা থেকে হারাম শরিফের পথ যেন শেষই হতে চাইছিল না। প্রথমে খুব খেয়াল করে দলে বলে চললেও একসময় তা আর থাকেনি। কেননা সবার হাঁটার গতি এক নয়। দলের সবাই তখন প্রায় বিচ্ছিন্ন। শুধু আমি আর স্ত্রী পাশাপাশি হাঁটছিলাম। এমনকি সঙ্গে থাকা আত্মীয়দেরও হারিয়ে ফেলেছিলাম। অবশ্য ভয় লাগেনি। কারণ, আগেই বলে দেওয়া ছিল, সবার গন্তব্য একটাই—কাবা শরিফ।
মোবাইলের অ্যাপসে দেখেছিলাম, সেদিন ১৪ কিলোমিটারের বেশি হেঁটেছি। আগে শুধু শুনতাম, হজের সময় অনেক কষ্ট হয়। কিন্তু ১০ জিলহজের আগে সেই কষ্টের প্রকৃত অর্থ বুঝিনি। বুঝেছিলাম সেদিন—মুজদালিফা থেকে জামারা, জামারা থেকে হারাম শরিফ পর্যন্ত দীর্ঘ পথ হেঁটে ফিরতে গিয়ে।
একটা দৃশ্য আজও মনে গেঁথে আছে। পাশাপাশি চারজন হাজি এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁদের দুজনের হাতেই ছিল ক্রাচ। কিন্তু সেই শারীরিক সীমাবদ্ধতাও যেন তাঁদের গতি বা উৎসাহকে একটুও থামাতে পারেনি। জামারায় শয়তানকে প্রতীকী পাথর নিক্ষেপ করে হনহন করে এগিয়ে যাচ্ছিলেন তাঁরা। চারপাশে ছিল অসংখ্য হুইলচেয়ারে বসা হাজি। আমাদের দলেও ছিলেন আশির কাছাকাছি বয়সী কয়েকজন বৃদ্ধ।
ওই সময় মনে হচ্ছিল, শরীর হয়তো দুর্বল হতে পারে। কিন্তু বিশ্বাস আর ইচ্ছাশক্তির সামনে বয়স কিংবা অক্ষমতা আসলে খুব ছোট হয়ে যায়। তাঁদের দেখে নিজের সব ক্লান্তিও যেন ভুলে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল, তাঁরা যদি পারেন, তাহলে আমার তো আরও সহজেই পারা উচিত।
বেলা ১১টার দিকে কোরবানির খবর। একটা ছোট সেলুনে গিয়ে মাথা মুণ্ডন করলাম। এর আগে একাধিকবার ওমরাহ করতে এসে ৫ কিংবা ১০ রিয়ালে চুল কেটেছিলাম। কিন্তু সেদিন দাম ২৫ থেকে ৩০ রিয়াল। কিছু করারও ছিল না। কারণ, কোরবানির পর চুল ফেলা হজের গুরুত্বপূর্ণ বিধানগুলোর একটি।
ধীরে ধীরে শেষ হতে থাকল হজের আনুষ্ঠানিকতা। আমাদের জীবনের এক মহাস্বপ্ন যেন পূর্ণতার দিকে এগোচ্ছিল। অথচ বুকের ভেতর তখন অদ্ভুত এক শূন্যতা কাজ করছিল। মনে হচ্ছিল, জীবনের সবচেয়ে পবিত্র, সবচেয়ে সুন্দর দিনগুলো ধীরে ধীরে ফুরিয়ে যাচ্ছে। কী অপার্থিব সুন্দর এক সময়ই না কাটিয়েছিলাম আমরা!