গর্ভের শিশুর লিঙ্গপরিচয় নির্ধারণ উৎসাহিত করে বৈষম্যকে: হাইকোর্ট

হাইকোর্টফাইল ছবি

গর্ভের শিশুর লিঙ্গপরিচয় নির্ধারণপ্রক্রিয়া প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যকে উৎসাহিত করে। এতে কাঠামোগত অসমতা ও জনসংখ্যাসংক্রান্ত ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়—এক রায়ে এমনটা উল্লেখ করেছেন হাইকোর্ট।

গর্ভের শিশুর লিঙ্গপরিচয় শনাক্তকরণের পরীক্ষা রোধের নির্দেশনা চেয়ে করা এক রিট আবেদনের রায়ে এ কথা বলা হয়েছে। রায়ে অনাগত শিশুর ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট সংরক্ষণে ছয় মাসের মধ্যে ডাটাবেজ (তথ্যভান্ডার) তৈরি করে নিয়মিত হালনাগাদ করতে স্বাস্থ্য সচিবকে নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

রিট আবেদনকারী আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেছেন, অনাগত শিশুর লিঙ্গপরিচয় শনাক্তকরণ রোধে এই ডাটাবেজ তৈরি ও হালনাগাদ করতে বলা হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী ছয় বছর আগে রিট আবেদনটি করেন। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২০২০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট রুল দেন। চূড়ান্ত শুনানি শেষে বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ, নির্দেশসহ রুল নিষ্পত্তি করে রায় দেন। ৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি দুই বছরের বেশি সময় পর আজ সোমবার হাতে পেয়েছেন বলে জানান আইনজীবী ইশরাত হাসান।

রায়ে বলা হয়েছে, জন্মের আগে শিশুর লিঙ্গপরিচয় নির্ধারণের চর্চা সামাজিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষুণ্ন ও লিঙ্গগত ভারসাম্যহীনতার বিস্তার এবং নারীর প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্যকে উৎসাহিত করে। এ ধরনের চর্চা গর্ভবতী নারীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। রাষ্ট্র সাংবিধানিকভাবে এমন সামাজিকভাবে ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম প্রতিরোধ ও নিষিদ্ধ করতে বাধ্য।

সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদ আইনের দৃষ্টিতে সমতা নিশ্চিত ও লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষেধ করে উল্লেখ করে রায়ে বলা হয়, জন্মের আগে লিঙ্গ নির্ধারণের প্রক্রিয়া প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যকে উৎসাহিত করে। এতে কাঠামোগত অসমতা ও জনসংখ্যাসংক্রান্ত ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়। এ ধরনের চর্চাকে অনুমোদন দেওয়া সংবিধানের ওই মূল নির্দেশনার পরিপন্থী, যেখানে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য দূর করা এবং দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিতের কথা বলা হয়েছে।

হাইকোর্ট আরও বলেছেন, জন্মের আগে লিঙ্গপরিচয় শনাক্তকরণ সরাসরি লিঙ্গনির্বাচনী গর্ভপাত, কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য, জনসংখ্যাগত ভারসাম্যহীনতা ও নারীর প্রতি সহিংসতাকে উৎসাহিত করে। এ ধরনের চর্চা সংবিধানের ১৮, ২৭, ২৮, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে নিশ্চয়তা দেওয়া জীবন, সমতা ও বৈষম্যহীনতার মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।

এর আগে হাইকোর্টের দেওয়া রুলে অনাগত শিশুর লিঙ্গপরিচয় শনাক্তকরণ রোধে নীতিমালা বা নির্দেশনা প্রণয়ন করতে এবং নিবন্ধিত হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও সরকারি-বেসরকারি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে পরিচালিত অনাগত শিশুদের প্রতিটি ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট ডাটাবেজ সংরক্ষণ ও নিয়মিত হালনাগাদ করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছিল।

রুল শুনানিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে হলফনামার মাধ্যমে জানানো হয়, ‘ন্যাশনাল গাইডলাইন রিগার্ডিং প্যারেন্টাল জেন্ডার সিলেকশন’ শীর্ষক নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে, যা ২০২৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি অনুমোদন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অনুমোদন দেয়।

কোনো ব্যক্তি ও চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান আকারে, ইঙ্গিতে, ছবি, চিহ্ন প্রকাশ বা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে গর্ভের শিশুর লিঙ্গ শনাক্তকরণ পরীক্ষা করতে পারে—এ বিষয়ে তাদের সক্ষমতার কথা প্রকাশ করতে পারবে না বলে নীতিমালায় রয়েছে বলে তখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আইনজীবী জানিয়েছিলেন। গর্ভের শিশুর লিঙ্গপরিচয় শনাক্তকরণ পরীক্ষার সক্ষমতা যেসব প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির রয়েছে, তারা এ-সংক্রান্ত তথ্যাদি ডাটাবেজে (তথ্যভান্ডার) সংরক্ষণ করবে বলে নীতিমালায় এসেছে।

কার্যকর ডাটাবেজ ব্যবস্থার অনুপস্থিতি জন্মের আগে লিঙ্গপরিচয় শনাক্তকরণ নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য অকার্যকর ও বাস্তবায়ন-অযোগ্য থেকে যায় বলে পূর্ণাঙ্গ রায়ে এসেছে। রায়ে বলা হয়, ডিজিটাল বাস্তবায়ন ছাড়া শুধু নির্দেশিকা বা নীতিমালা অনুমোদনের মাধ্যমে মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত হতে পারে না। রিট আবেদনকারীর মূল অভিযোগ অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

হাইকোর্ট নিবন্ধিত হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং সরকারি-বেসরকারি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে পরিচালিত অনাগত শিশুর প্রতিটি ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট সংরক্ষণে ডাটাবেজ তৈরি করে নিয়মিত তা হালনাগাদ করতে স্বাস্থ্য সচিবকে নির্দেশ দিয়েছেন। রায়ের অনুলিপি গ্রহণের দিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে এ নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে।

আইনজীবী ইশরাত হাসান প্রথম আলোকে বলেন, রায়ের ফলে কোনো হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ল্যাবরেটরি মৌলিক, রিপোর্ট, চিহ্নসহ কোনো মাধ্যমে অনাগত শিশুর লিঙ্গপরিচয় প্রকাশ করতে পারবে না। রায়ে বলা হয়েছে, শুধু নীতিমালা যথেষ্ট নয়, এ ক্ষেত্রে নজরদারির দরকার আছে। শিশুর লিঙ্গপরিচয় প্রকাশ রোধে ডাটাবেজ তৈরি করে তা নিয়মিত হালনাগাদ করতে স্বাস্থ্য সচিবকে নির্দেশ দিয়েছেন। বিষয়টি চলমান তদারকিতে থাকবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে নির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আদালতও তদারক করতে পারেন।