‘বোকার জমি জলে ডোবে’
এ দেশে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার বাড়াতে একসময় আমাদের কৃষি দপ্তর জোরেশোরে প্রচার করত—‘বোকার ফসল পোকায় খায়’। সেই স্লোগান নকল করে কথাটা বললেন মেহেরপুরের মোহর শেখ। বললেন, ‘বোকার জমি জলে ডোবে।’ তিনি একসময় সরকারি দপ্তরে পানির লাইন স্থাপন ও মেরামতের কাজ করতেন। জুনের প্রথম সপ্তাহে তাঁর সঙ্গে কথা হচ্ছিল মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার দেবীপুর ডি জে এম সি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে জমে থাকা পানি নিয়ে।
সামান্য বৃষ্টিতেই বিদ্যালয়টির মাঠে পানি আটকে থাকে, সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতার। ব্যাহত হয় পাঠদান। বন্ধ হয় শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা। এ সমস্যা দীর্ঘদিনের। পানিনিষ্কাশন নিয়ে কারও কোনো হেলদোল নেই। শুধু এ বিদ্যালয়ে নয়, এই সমস্যা সারা দেশের অনেক জায়গায় দেখা যায়। উন্নয়নকর্মী এবং দেশের কিশোরী ও নারী ফুটবলের অন্যতম সংগঠক হাফিজুল ইসলাম মে মাসে বন্যা/বর্ষার আগে সুনামগঞ্জ গিয়েছিলেন; ফিরে এসে বলেছিলেন, ‘অনেক বিদ্যালয় দেখলাম, তাদের মাঠে পানি জমে আছে।’
বিদ্যালয়ের পাশের সড়ক উঁচু হওয়ায় বৃষ্টির পানি মাঠেই আটকে থাকে। নিষ্কাশনের পথ না থাকায় ফরিদপুর সদরের গোয়ালচামট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠেও পানি জমতে দেখা যায়। এই তালিকা অনেক দীর্ঘ।
গত জুনে শেরপুরে গিয়ে দেখি, ঝিনাইগাতী সরকারি মডেল পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে থই থই পানি। সামান্য বৃষ্টিতেই সেখানে পানি আটকে যায়। বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৬১ সালে। সরকারীকরণ হয় ২০১৮ সালে। সেখানে যেন জলভূতের রাজত্ব চলছে। বিদ্যালয়ে এখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫৪০, শিক্ষক-কর্মচারী ২৩ জন। বিদ্যালয়ের পাশেই বাজারের প্রধান সড়ক। সড়ক উঁচু হতে হতে এখন বিদ্যালয়টির মাঠ সড়ক থেকে প্রায় দুই ফুট নিচে। বিদ্যালয়ের তিন পাশে নতুন করে বাড়িঘর নির্মাণ করায় পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে। এ কারণে মাঠ দেখে এখন আর শুষ্ক ও বর্ষা মৌসুমের ফারাক বোঝা যায় না।
একই অবস্থা ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের খারুয়া বড়াইল উচ্চবিদ্যালয় ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির মাঠে এখন প্রায় সারা বছরই পানি আটকে থাকে। যে কেউ গেলে দেখতে পাবেন বিদ্যালয়ের মাঠে হাঁসের ঝাঁক সাঁতরে বেড়াচ্ছে। বিদ্যালয়ের পাশের সড়ক উঁচু হওয়ায় বৃষ্টির পানি মাঠেই আটকে থাকে। নিষ্কাশনের পথ না থাকায় ফরিদপুর সদরের গোয়ালচামট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠেও পানি জমতে দেখা যায়। এই তালিকা অনেক দীর্ঘ।
বিদ্যালয়ের পাশের রাস্তা বিদ্যালয়ের চেয়ে উঁচু হয়ে যাওয়ার ঘটনা এক দিন, এক রাতের ঘটনা নয়। বিদ্যালয়কে গাতায় (গর্তে) ফেলে রাস্তা বা বাড়ি নির্মাণকারীরা বিদ্যালয়ের ধার ধারে না। কিন্তু রাস্তার ধারে যে বিদ্যালয় আছে, তাকে বিপদে ফেলা কি তাদের ঠিক হয়েছে? যাঁদের এটা দেখার কথা ছিল, তাঁরা কেন দেখেননি?
কেউ কি কিছু করছেন
গাংনীর ইউএনও আনোয়ার হোসেন গত জুনে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে জলাবদ্ধতা দূর করার উপায় খুঁজে দেখা হবে। পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় এ ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। মেহেরপুর-২ (গাংনী) আসনের সংসদ সদস্য মো. নাজমুল হুদা একই মাসে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া গেলে এ সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ঝিনাইগাতী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া গত জুনে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, বিদ্যালয়ের মাঠ ভরাটসহ জলাবদ্ধতা দূরীকরণের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অবগত করা হবে।
বলা বাহুল্য, এসবই বোতলবুঝ (দায়সারা) শ্রেণির কথাবার্তা। মনে হবে টাকা (বরাদ্দ) যেন আলাদিনের চেরাগ; ওটা থাকলেই সব মুশকিল আসান হবে। বিদ্যালয়ের পাশের রাস্তা বিদ্যালয়ের চেয়ে উঁচু হয়ে যাওয়ার ঘটনা এক দিন, এক রাতের ঘটনা নয়। বিদ্যালয়কে গাতায় (গর্তে) ফেলে রাস্তা বা বাড়ি নির্মাণকারীরা বিদ্যালয়ের ধার ধারে না। কিন্তু রাস্তার ধারে যে বিদ্যালয় আছে, তাকে বিপদে ফেলা কি তাদের ঠিক হয়েছে? যাঁদের এটা দেখার কথা ছিল, তাঁরা কেন দেখেননি?
একটা ছোটখাটো কুয়ার মতো গর্ত করে সেই গর্ত ঝামা ইট (ভাটাওয়ালা বলে পিকেট) দিয়ে ভরে দিলে পানি পরিশোধিত হয়ে সরাসরি গভীর ভূস্তরে বা অ্যাকুইফারে চলে যাবে। এটাকে বলে রিচার্জ কূপ।
সহজ কোনো উপায় আছে কি
মাঠ ভরাট, ড্রেন নির্মাণ ইত্যাদি লক্ষ-কোটি টাকার প্রকল্প ছাড়া খেলার মাঠের এমন জলাবদ্ধতা দূর করার কোনো সহজ টেকসই ব্যবস্থা আছে কি না জানতে চাইলে মোহর শেখ হাসলেন। জানতে চাইলেন পড়াশোনা কত দূর? সায়েন্স পড়েছি কি না ইত্যাদি। এসব প্রশ্ন এখন গা সওয়া হয়ে গেছে।
আরেকটা পদ্ধতি আছে। পারকোলেশন পিট। এটি সাধারণত ছোট গর্ত, যার মধ্যে ইটের খোয়া, পাথর, নুড়ি ও বালু ভরা থাকে। বৃষ্টির পানি এতে জমে ধীরে ধীরে মাটির ভেতর প্রবেশ করে। এটার সুবিধা হচ্ছে, এর নির্মাণ খরচ কম। স্কুল, হল, আবাসিক ভবন বা ছোট ক্যাম্পাসে সহজে করা যায়।
বিদ্যালয়ের মাঠের মাঝখানে ফেলে রাখা ‘রাবিশ’ (পরিত্যক্ত ইট-খোয়া) দেখিয়ে মোহর শেখ বললেন, ‘চাইলে ওগুলো দিয়েই একটা কম খরচের প্রকৃতি বন্ধু ব্যবস্থা করা সম্ভব। বৃষ্টির পানি বের করার জন্য ড্রেনের দিকে তাকিয়ে থাকাটা অন্যায়। আসলে আমাদের উচিত পানিটা দ্রুত মাটির নিচে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা। বৃষ্টির পানি মাটির নিচে পাঠিয়ে দিলে জলাবদ্ধতা যেমন কমবে, তেমনি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনর্ভরণ (গ্রাউন্ড ওয়াটার রিচার্জ) করাও হবে। একটা ছোটখাটো কুয়ার মতো গর্ত করে সেই গর্ত ঝামা ইট (ভাটাওয়ালা বলে পিকেট) দিয়ে ভরে দিলে পানি পরিশোধিত হয়ে সরাসরি গভীর ভূস্তরে বা অ্যাকুইফারে চলে যাবে। এটাকে বলে রিচার্জ কূপ।
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ফোনে কথা বলি ইকবাল হাবিবের সঙ্গে। দূর দেশ থেকে ফোন ধরেন। সব শুনে বলেন, বাংলাদেশে মোহর শেখের অভাব নেই। আর দেরি নয়, দেশে ফিরেই নামতে হবে প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানগুলোকে জনপ্রিয় করে তোলার কাজ। শুরু হোক জলাবদ্ধতামুক্ত স্কুল তৈরির কাজ দিয়ে।
আরেকটা পদ্ধতি আছে। পারকোলেশন পিট। এটি সাধারণত ছোট গর্ত, যার মধ্যে ইটের খোয়া, পাথর, নুড়ি ও বালু ভরা থাকে। বৃষ্টির পানি এতে জমে ধীরে ধীরে মাটির ভেতর প্রবেশ করে। এটার সুবিধা হচ্ছে, এর নির্মাণ খরচ কম। স্কুল, হল, আবাসিক ভবন বা ছোট ক্যাম্পাসে সহজে করা যায়। বৃষ্টির পৃষ্ঠপ্রবাহ বা রানঅফ কমায়। গর্তফর্ত করতে না চাইলে ট্রেঞ্চ/নালা করা যায়, প্রকৌশলীরা বলেন ইনফিলট্রেশন ট্রেঞ্চ। এটি লম্বা সরু নালা বা ট্রেঞ্চ, যা পাথর, নুড়ি ও বালু দিয়ে ভরা হয়। বৃষ্টির পানি এই ট্রেঞ্চে প্রবেশ করে ধীরে ধীরে চারপাশের মাটিতে ছড়িয়ে যায়। এটা বড় ক্যাম্পাস ও খেলার মাঠের জন্য বেশ উপযোগী।
কথা বলতে বলতে মোহর শেখ বিদ্যালয়ের নতুন ইমারতের ছাদের দিকে ইশারা করলেন। এই ছাদের আর আশপাশের বাড়ির ছাদের পানি সব মাঠে এসে পড়ে। চাইলে ছাদের পানিও পাইপের মাধ্যমে সংগ্রহ করে রিচার্জ পিট, ট্রেঞ্চ বা কূপের মাধ্যমে মাটির নিচে পাঠানো যায় বা ফিল্টার করে ব্যবহার করা যায়।
গর্তফর্ত করতে না চাইলে ট্রেঞ্চ/নালা করা যায়, প্রকৌশলীরা বলেন ইনফিলট্রেশন ট্রেঞ্চ। এটি লম্বা সরু নালা বা ট্রেঞ্চ, যা পাথর, নুড়ি ও বালু দিয়ে ভরা হয়। বৃষ্টির পানি এই ট্রেঞ্চে প্রবেশ করে ধীরে ধীরে চারপাশের মাটিতে ছড়িয়ে যায়। এটা বড় ক্যাম্পাস ও খেলার মাঠের জন্য বেশ উপযোগী।
মোহর শেখের সঙ্গে কথা বলতে বলতে স্থপতি ও পরিবেশকর্মী ইকবাল হাবিবের কথা মনে পড়ে। এ রকম কথা তিনি অনেক দিন থেকে বলছেন। জলাবদ্ধতা প্রেক্ষাপটে নগর-পরিকল্পনা, স্পঞ্জ সিটি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং প্রকৃতিনির্ভর সমাধান নিয়ে তিনি সোচ্চার অনেক দিন থেকে।
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ফোনে কথা বলি ইকবাল হাবিবের সঙ্গে। দূর দেশ থেকে ফোন ধরেন। সব শুনে বলেন, বাংলাদেশে মোহর শেখের অভাব নেই। আর দেরি নয়, দেশে ফিরেই নামতে হবে প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানগুলোকে জনপ্রিয় করে তোলার কাজ। শুরু হোক জলাবদ্ধতামুক্ত স্কুল তৈরির কাজ দিয়ে।
গওহার নঈম ওয়ারা লেখক ও গবেষক, স্বাধীনতার ৫০ বছর: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের অর্জন গ্রন্থের প্রণেতা