আবাসন বা রিয়েল এস্টেট খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি স্তম্ভ। এ খাত যদি সংকটে পড়ে, তাহলে পুরো অর্থনীতিই বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে। বর্তমানে আমরা নানা কারণে এই মন্দার সম্মুখীন হচ্ছি। নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে, যেমন—রড ও সিমেন্টের মূল্য প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে।
বর্তমানে একটি ফ্ল্যাট বা বিল্ডিং নির্মাণের খরচ প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। রাজউকের নতুন বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা—ড্যাপের নীতিমালাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) কমে যাওয়ায় আগে যেখানে ৮-৯ তলা দালান নির্মাণের সুযোগ ছিল, এখন সেটি ৫-৬ তলায় সীমিত। ফলে জমির মালিকেরা তাঁদের জমি নির্মাতা বা ডেভেলপারদের কাছে হস্তান্তর করতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। ডেভেলপাররা যখন দেখছেন যে নতুন প্রকল্পগুলো লাভজনক হবে না, তখন তাঁরা বিনিয়োগে অনাগ্রহী হচ্ছেন। বেশির ভাগ কোম্পানি পরিচালন ব্যয় কমানোর চেষ্টা করছে, কর্মী ছাঁটাই করছে, এমনকি বেতনও কমিয়ে দিচ্ছে। বিক্রি কমে যাওয়ায় কোম্পানিগুলো টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করছে প্রতিনিয়ত।
সরকারের সঙ্গে আবাসন ব্যবসায়ীদের একটি সমন্বিত বৈঠক জরুরি। রাজউক এ পর্যন্ত প্রায় ৪০টি আবাসন প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে, আর জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ এখনো একটি বেসরকারি প্রকল্পও অনুমোদন দেয়নি। আমার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো, একটি ‘হাউজিং প্রকল্প অনুমোদন ভবন’ তৈরি করা হোক, যেখানে অনুমোদনের সব প্রক্রিয়া একই ছাদের নিচে সম্পন্ন হবে। এ ছাড়া অনুমোদন দেওয়ার আগে কোম্পানিগুলোকে গ্রেডিং (এ, বি, সি) পদ্ধতি প্রণয়ন করে গ্রাহকদের জন্য স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যেতে পারে।
সরকার কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বন্ধ করেছে, যা একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একদিকে এটি টাকা পাচার বাড়িয়ে দিতে পারে, যা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। অন্যদিকে যদি এই টাকা দেশেই বিনিয়োগ হয়, সে ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে।
আবাসন খাতের সঙ্গে ৪০০টির বেশি উপখাত জড়িত। যেমন সিমেন্ট, রড, টাইলস, প্লাস্টিক, বিদ্যুৎসামগ্রী ইত্যাদি। এ খাত মন্দায় পড়লে সংশ্লিষ্ট সব শিল্পই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমাদের টিকে থাকতে হলে সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন। আমি ২০১৩ সালে দেশের প্রথম প্রফেশনাল রিয়েল এস্টেট ট্রেনিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করি, যাতে এ খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হয়। এ ছাড়া করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটির অংশ হিসেবে আমরা গুণীজনদের সম্মাননা দিয়ে থাকি, যা আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার একটি অংশ। সরকারকে রিয়েল এস্টেট খাতের গুরুত্ব বুঝতে হবে এবং নীতিমালা সহজীকরণ, করপোরেট লোনের সুবিধা বৃদ্ধি ও বিকেন্দ্রীকরণের দিকে জোর দিতে হবে। তবেই আমরা এ সংকট কাটিয়ে উঠতে পারব বলে বিশ্বাস রাখি।
ড. মো. সাদী-উজ-জামান: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নতুনধরা এসেটস্ লিমিটেড ও নতুনধরা রিয়েল এস্টেট লিমিটেড