চব্বিশের রক্তাক্ত দিনরাত
২০২৪ সালের ৫ জুন জানতে পারি সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা পুনর্বহাল হয়েছে। খবরটি আমাকে ভীষণ নাড়া দেয়। কারণ, কোটা সংস্কারের আন্দোলনেই প্রথম রাজপথে মার খেয়েছিলাম এবং কোটা বাতিল হয়েছিল আমাদের রক্তের বিনিময়ে।
সেই কোটাব্যবস্থা পুনর্বহাল হওয়ার খবর যখন পাই, তখন আমরা আখতার হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। মেসেঞ্জার গ্রুপে আলোচনা শুরু করি, এর বিরুদ্ধে আমরা আবার আন্দোলনে নামব কি না। একই সময়ে ছাত্রলীগ ও সাধারণ শিক্ষার্থীর ব্যানারে ইসলামী ছাত্রশিবিরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছিলাম, দ্রুত উদ্যোগ না নিলে আন্দোলন হয় হাইজ্যাক হয়ে যাবে, নয়তো ‘শিবির’ তকমা দিয়ে আন্দোলন দমন করা হবে। অতীতে নিরাপদ ক্যাম্পাস আন্দোলন, হল খোলা আন্দোলনসহ বেশ কিছু ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের দ্বারা আন্দোলন স্যাবোটাজের তিক্ত অভিজ্ঞতাও ছিল আমাদের।
তাই সংগঠনের সিদ্ধান্তের আগেই সেদিন সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে আমি মানববন্ধনের ঘোষণা দিই। পরে সবাই আন্দোলনের পক্ষে একমত হয়। তারপর ‘কোটা পুনর্বহাল করা চলবে না’ নামে একটি গ্রুপ খুলে বিশ্ববিদ্যালয় ও চাকরিপ্রত্যাশীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিই। সন্ধ্যায় মানববন্ধন শুরুর আগেই প্রায় ১৫ হাজার সদস্যের কমিউনিটি গড়ে ওঠে। এই নেটওয়ার্কের ফলে ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের উদ্যোগের আগেই আন্দোলনের নেতৃত্ব ছাত্রশক্তির হাতে আসে এবং প্রতিদিন আন্দোলন আরও বিস্তৃত হতে থাকে।
আমরা নিজেদের মাঝে কাজ ভাগাভাগি করে নিয়েছিলাম। সোশ্যাল মিডিয়ার দিকটা মূলত আমি দেখতাম। সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আলাদা ফেসবুক গ্রুপও তৈরি করেছিলাম। তাদের সমন্বয়ে সেন্ট্রাল অনলাইন সমন্বয় করার দায়িত্বটা আমার ছিল। আসিফ মাহমুদ ভাই ও আমার ওপর দায়িত্ব ছিল ঈদের ছুটিতে আন্দোলন চলাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকার অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমন্বয় করা। আবু বাকের মজুমদার ও হাসিব আল ইসলাম অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় সমন্বয় করেছিলেন। হান্নান মাসউদের দায়িত্ব ছিল সারা দেশের মহানগর ও জেলাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা। আবদুল কাদের লজিস্টিকস ম্যানেজমেন্ট ও মিছিলের শৃঙ্খলার ব্যপারটা দেখতেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগের সিআর, প্রতিটি হলের প্রতিনিধিদের সংগঠিত করে ফেলায় ১ জুলাই আন্দোলন শুরু হওয়ার পর ক্রমেই বেগবান হয়। ৩ জুলাইয়ের মধ্যে ক্যাম্পাসে এত বড় নেটওয়ার্ক তৈরি করে ফেলি, যাতে মাঝরাতে একটা গ্রুপ কলেই পুরো ক্যাম্পাসে মিছিল নামিয়ে ফেলা সম্ভব হয়।
অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছিলাম, দ্রুত উদ্যোগ না নিলে আন্দোলন হয় হাইজ্যাক হয়ে যাবে, নয়তো ‘শিবির’ তকমা দিয়ে আন্দোলন দমন করা হবে। অতীতে নিরাপদ ক্যাম্পাস আন্দোলন, হল খোলা আন্দোলনসহ বেশ কিছু ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের দ্বারা আন্দোলন স্যাবোটাজের তিক্ত অভিজ্ঞতাও ছিল আমাদের।
আমরা সারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো চিহ্নিত করেছিলাম। স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো বড় নয়; কিন্তু স্ট্র্যাটেজিক্যালি গুরুত্বপূর্ণ (পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়) এমন বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলাগুলোকে (সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লা) বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখেছিলাম। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চাইলেই সারা দেশের প্রধান মহাসড়গুলোকে অচল করে দিতে পারে। ফলে ক্যাম্পাস থেকে সারা দেশের যোগাযোগব্যবস্থা আমরা একটি ফোন কলেই অচল করে দিতে পারতাম।
আমরা জানতাম আন্দোলন বড় করতে হলে আমাদের হলে বাধ্য হয়ে থাকা ছাত্রলীগের ছেলেমেয়েদের প্রয়োজন, যাতে আন্দোলনকে জাশি ট্যাগিং করে হামলা করতে না পারে। একই সঙ্গে ক্যাম্পাসে বড় আন্দোলন করতে হলে সব ছাত্রসংগঠনের ঐকমত্য জরুরি। নাহিদ ভাই ও আসিফ ভাই—এই দুজন বামপন্থী সব ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে বসছিলেন। ফ্যাসিবাদবিরোধী সব বাম সংগঠনই তখন কোটা আন্দোলনের পক্ষে থাকার ঘোষণা দেয়। আসিফ ভাইয়ের পক্ষ থেকে আহনাফ সাঈদ খান ছাত্রদলের মাসুম বিল্লাহ ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁর মাধ্যমে ছাত্রদলের প্রেসিডেন্ট রাকিব ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ হয় এবং পরে ছাত্রদলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন আসিফ ভাই।
ছাত্রশিবিরের সঙ্গে ছাত্রশক্তির একটি দ্বন্দ্ব হয়েছিল মার্চ ফর প্যালেস্টাইন কর্মসূচিকে ঘিরে; তাই ছাত্রশিবির আমাদের নেতৃত্বে তাদের নেতা–কর্মীদের সাংগঠনিক নির্দেশনায় পাঠায়নি। তখন ঢাবি ছাত্রশিবিরের ছাত্র আন্দোলন–বিষয়ক সম্পাদক জাহেদের (বর্তমানে সলিমুল্লাহ হলের ভিপি) সঙ্গে মিটিং করে আগের সমস্যার সমাধান ও আন্দোলনে তাদের সাংগঠনিকভাবে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান। মিটিং ফলপ্রসূ হলে ছাত্রশিবির সাংগঠনিকভাবে আন্দোলনে যুক্ত হয়।ছাত্রদলের জুনিয়র নেতৃত্ব, ছাত্রশিবিরের জনশক্তি এবং বামপন্থীদের কালচারাল ভাইব্রেন্সি আন্দোলনকে নতুন রূপ দেয়।
আমরা চেয়েছিলাম এমন একটি প্ল্যাটফর্ম নির্মাণ করতে, যাতে কোটা আন্দোলন শেষ হয়ে যাওয়ার পরও তার আবেদন না ফুরিয়ে যায়। আবদুল হান্নান মাসউদ নাম প্রস্তাব করেন ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’। সমন্বয়ক তালিকার ক্ষেত্রে ছাত্রশক্তির আমরা সবাই ছাত্রশক্তির মুখপাত্র হিসেবে সদস্যসচিব নাহিদ ইসলাম ভাইয়ের নাম প্রস্তাব করি। কিন্তু ছাত্রলীগের একাংশের আপত্তিতে সমন্বয়ক তালিকা করা হয় এবং সিনিয়রিটির ভিত্তিতে সমন্বয়কদের তালিকা দেওয়া হয়। দুই বছর পর আজ মনে হচ্ছে, এটি আমাদের ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। কারণ, এই সিনিয়রিটির ভিত্তিতে সমন্বয়কদের তালিকা তৈরি করার ফলে অনেক যোগ্য নেতৃত্ব পেছনে পড়ে গিয়েছে এবং জুলাইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেনি, এমনকি সরকারবিরোধী আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল এমন কেউ কেউ বড় নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বেশি পরিচিত হওয়ায় ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক আখতার হোসেনের নেতৃত্বে অরাজনৈতিক মোড়কের কোনো কমিটি করা সম্ভব ছিল না। তাই আখতার ভাই আন্দোলনের সম্মুখসারিতে আসতেন না, আন্দোলন বড় হয়ে গেলে আখতার হোসেনকে নেতৃত্ব হিসেবে হাজির করা আমাদের পরিকল্পনা ছিল। ১৭ জুলাই গায়েবানা জানাজার ইমামতি করানোর মাধ্যমে তাঁর নেতৃত্ব আমরা হাজির করতে চেয়েছিলাম; কিন্তু তার ঠিক আগমুহূর্তে তিনি গ্রেপ্তার হন।
চানখাঁরপুলে আমাদের একটি মেসবাসা ছিল। বাসাটা জুলাই ও তার আগের সব আন্দোলনের সময় আমাদের ঘাঁটি হিসেবে কাজ করেছিল। নাহিদ ইসলাম, আখতার হোসেন, আসিফ মাহমুদ, আবদুল কাদের, আবদুল হান্নান মাসউদ, আবু বাকের মজুমদার, হাসিব আল ইসলাম—আমরা সেই বাসায় থাকতাম। সেখানে থেকেই আন্দোলনের পরিকল্পনা ও স্ট্র্যাটেজি ঠিক করা হতো। পরিকল্পনায় আমাদের সহযোগিতা করতেন মাহফুজ আবদুল্লাহ (মাহফুজ আলম), ভূঁইয়া আসাদুজ্জামান, তুহিন খান প্রমুখ ভাই।
তাদের সমন্বয়ে সেন্ট্রাল অনলাইন সমন্বয় করার দায়িত্বটা আমার ছিল। আসিফ মাহমুদ ভাই ও আমার ওপর দায়িত্ব ছিল ঈদের ছুটিতে আন্দোলন চলাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকার অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমন্বয় করা। আবু বাকের মজুমদার ও হাসিব আল ইসলাম অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় সমন্বয় করেছিলেন। হান্নান মাসউদের দায়িত্ব ছিল সারা দেশের মহানগর ও জেলাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা। আবদুল কাদের লজিস্টিকস ম্যানেজমেন্ট ও মিছিলের শৃঙ্খলার ব্যপারটা দেখতেন।
১৬ জুলাই রাতে মশিউর ভাইয়ের বাসায় মিটিং
১৬ জুলাই রাতের ঘটনা। তত দিনে হাসিনা শিক্ষার্থীদের রাজাকারের নাতিপুতি বলেছে, নারীরা হলের তালা ভেঙেছে, ১৫ জুলাই ছাত্রলীগ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্মমভাবে হামলা চালিয়েছে, ১৬ জুলাই বিকেলের মধ্যে আবু সাঈদ, ওয়াসিমরা শহীদ। আমরা একত্র হয়েছিলাম যাত্রাবাড়ীতে তৎকালীন গণ অধিকার পরিষদের নেতা (বর্তমানে এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব) মশিউর ভাইয়ের বাসায়। সেখানে নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, আবদুল কাদের, আবু বাকের মজুমদার, হাসিব আল ইসলাম ও আমি উপস্থিত ছিলাম। আমরা সিদ্ধান্ত নিই শেখ হাসিনার পতন ঘটাতে হবে। আমার ভাইদের রক্তের বিনিময় কখনো কোটা সংস্কার হতে পারে না। সেদিন থেকে আমাদের কোটা সংস্কার আন্দোলন হাসিনা রেজিমের পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়।
১৬ জুলাই রাতে সব হলকে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসমুক্ত করা হলে হাসিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্র্যাকডাউন চালায়। প্রশাসন ক্যাম্পাস ও হলগুলো বন্ধ করেছিল তার আগেই। আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। সন্ধ্যায় আমরা একটা গ্রুপকলে মিলিত হই। সেখানে আমাদের পরবর্তী কর্মসূচি ও দফাগুলো কী হতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে বন্ধ ক্যাম্পাসের আন্দোলন কীভাবে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হবে, তা নিয়েও আলোচনা চলে। আমাকে আন্দোলনের দফাগুলো লেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়। আমি ১১ দফা খসড়া লিখে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে প্রকাশ করি। এর পরিপ্রেক্ষিতে হাসনাত ভাইকে একটি প্রেস রিলিজ লেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়। গ্রুপকলে সবাই ঐকমত্যে পৌঁছায় যে হাসিনার সঙ্গে আলোচনার দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। ডিজিএফআই আমাদের প্রেশার দিচ্ছিল, যেন আমরা হাসিনার সঙ্গে আলোচনায় বসি। আমাদের ডাকসুতে প্যানেল ধরে জিতিয়ে দেওয়া হবে, এমনকি নাহিদ ইসলাম ভাইকে প্রতিমন্ত্রী বানানোর অফারও করে ডিজিএফআই। হাসনাত ভাই একটি প্রেস রিলিজ লিখে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে আমাদের দেখিয়ে নেন। কিন্তু পরদিন খবরের কাগজগুলোতে ‘শিক্ষার্থীরা আলোচনায় বসতে রাজি’ এমন শিরোনামে হাসনাত ভাইয়ের দেওয়া প্রেস রিলিজের বরাতে খবর আসতে থাকে। আমরা এ বিষয়ে তাঁর জবাব চাইলে তিনি আমাদের বলেন, তিনি আমাদের দেখিয়ে নেওয়া প্রেস রিলিজটাই পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু ডিজিএফআই মিডিয়াকে দিয়ে নিউজ ম্যানুপুলেট করিয়েছে। কিন্তু আমরা মিডিয়া হাউসগুলোতে খোঁজ নিলে দেখা যায় যে হাসনাত ভাই শিক্ষার্থীরা আলোচনায় বসতে রাজি এমন লেখা–সংবলিত প্রেস রিলিজই মিডিয়া হাউসে পাঠিয়েছেন। এর ফলে হাসনাত ভাইয়ের সঙ্গে বাকি সমন্বয়কদের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। পরে ১১ দফা খসড়াটি নাহিদ ইসলাম ভাইয়ের ঘোষণা করার কথা ছিল, কিন্তু এর মধ্যে ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। আসিফ মাহমুদ কমপ্লিট শাটডাউনের ঘোষণা দেওয়ার পরই আমরা কানেক্টিভিটি হারাই।
সে সময় গ্রেপ্তার এড়াতে আমাকে বারবার আমার লোকেশন পরিবর্তন করতে হচ্ছিল। একবার ফোন অন করলেই সেই লোকেশনে আর থাকা সম্ভব হচ্ছিল না। টেলিভিশন মারফত জানতে পারি হাসনাত ভাই, সারজিস ভাই ও হাসিব আল ইসলাম রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় আইনমন্ত্রী, আইসিটি মন্ত্রীসহ বেশ কয়েকজনের সঙ্গে দেখা করে এসে ৮ দফা ঘোষণা করেন। সেখানে ১১ দফায় উল্লিখিত প্রথম দফা শেখ হাসিনাকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে, দ্বিতীয় দফা আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথ্য ও যোগাযোগমন্ত্রী, সড়কমন্ত্রী, আইজিপিসহ হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পদত্যাগ ও বিচারের দাবিসহ বেশ কিছু দাবির উল্লেখ ছিল না। এই ব্যাপারগুলো বাকি সমন্বয়কেরা প্রত্যাখ্যান করে। (পরে হাসনাত আবদুল্লাহ ও সারজিস আলম আমাদের বলেন, ডিজিএফআই তাঁদের হাতে ৮ দফা ধরিয়ে দিয়ে জোরপূর্বক তা পাঠ করিয়ে নেয়।) তখন আবদুল কাদের ৯ দফা প্রদান করেন। সেখানে ৮টি দফা ছিল আমাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে আসা ১১টি দফার সংক্ষিপ্ত সংস্করণ। অতিরিক্ত দফাটি ছিল ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি। আবদুল কাদের ভাই ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরসহ সবার সঙ্গে কথা বলেই ৯ দফা ফাইনাল করেছিলেন। নাহিদ ইসলামের কাছে ৯ দফার খসড়া পাঠান ঢাবি ছাত্রশিবিরের তখনকার সেক্রেটারি এস এম ফরহাদ। নাহিদ ইসলাম ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার দফাটিতে আপত্তি জানান। কাদের ভাইকে তিনি এ ব্যাপারে অবগত করলে ৯ দফার সপ্তম দফা হিসেবে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের বদলে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিটি স্থায়ী হয়। এক দফা ঘোষণার আগপর্যন্ত এই ৯ দফা আন্দোলনের লাইফলাইন হিসেবে কাজ করেছিল।
ইন্টারনেট শাটডাউনের সেই সময়ের স্মৃতি নিয়ে বলতে গেলে ফুরাবে না। আমি গ্রেপ্তার হওয়ার ভয়ে ধানমন্ডি, সায়েন্সল্যাব, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, সাভারসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় লোকেশন পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছিলাম। ডিবি পুলিশের তাড়া খাওয়া অবস্থায় লোকেশন যাতে চিহ্নিত করতে না পারে সে জন্য ফোনের সিমকার্ড ফেলে দিতে বাধ্য হই। নিউজে দেখতে পাচ্ছিলাম আমার নিখোঁজ সংবাদে আমার বাবা হাসপাতালের মর্গে মর্গে আমার লাশ খুঁজে বেড়াচ্ছেন; মা আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা–উদ্বেগে ভুগতে ভুগতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। কিন্তু এমন উপায় ছিল না যে আমি তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁদের আশ্বস্ত করব যে আমি বেঁচে আছি। আমার বড় ভাই হান্নান মাসউদ আমার নাম বলে কান্নায় ভেঙে পড়ছিল—এমন দৃশ্য দেখেছিলাম টিভিতে। আমি যেসব বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলাম, প্রতিটি বাড়িতেই পরে পুলিশ গিয়ে তল্লাশি চালিয়েছিল। ঘটনাগুলোর কথা মনে পড়লে এখনো আমার গায়ে কাঁটা দেয়। যেসব মানুষ আমাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন, তাঁদের ধন্যবাদ।
চানখাঁরপুলে আমাদের একটি মেসবাসা ছিল। বাসাটা জুলাই ও তার আগের সব আন্দোলনের সময় আমাদের ঘাঁটি হিসেবে কাজ করেছিল। নাহিদ ইসলাম, আখতার হোসেন, আসিফ মাহমুদ, আবদুল কাদের, আবদুল হান্নান মাসউদ, আবু বাকের মজুমদার, হাসিব আল ইসলাম—আমরা সেই বাসায় থাকতাম। সেখানে থেকেই আন্দোলনের পরিকল্পনা ও স্ট্র্যাটেজি ঠিক করা হতো। পরিকল্পনায় আমাদের সহযোগিতা করতেন মাহফুজ আবদুল্লাহ (মাহফুজ আলম), ভূঁইয়া আসাদুজ্জামান, তুহিন খান প্রমুখ ভাই।
২৬ জুলাই বাংলাদেশ–কুয়েত মৈত্রী, জাতিসংঘ, মুনতাসির ভাই
২৪ জুলাই আমি ও আবদুল হান্নান মাসউদ গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে গিয়ে নাহিদ ভাই ও আসিফ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করি। নাহিদ ভাই দুটো সেল গঠন করার পরামর্শ দেন: একটি মেডিক্যাল সেল, অন্যটি লিগ্যাল সেল। ২৬ জুলাই মেডিক্যাল সেলের পক্ষে হাসপাতালগুলো ভিজিট করার জন্য আমি, আবদুল হান্নান মাসউদ, মাহিন সরকার ও মেহেদী মোহাম্মদপুরে একত্র হই। সেখান থেকে আমরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ভিজিটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। তখন আমি মাহফুজ ভাইকে ফোন করে পরামর্শ চাই পরবর্তী সময়ে কী করা যায়। তিনি শুরুতে সময় দিতে না চাইলেও পরে ৫ মিনিট সময় দেবেন বলে আমাদের কাঁটাবন যেতে বলেন। আমরা কাঁটাবন গিয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি; ততক্ষণে তিনি ফোন বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
পরে ঢাকা মেডিকেলে যাওয়ার পথে সাংবাদিকদের কাছে জানতে পারি, ওই মুহূর্তে শেখ হাসিনা ঢাকা মেডিকেলে অবস্থান করছেন। তখন আমরা উত্তরা আধুনিক হাসপাতালে (বাংলাদেশ মেডিকেল) এবং সেখানে একটি সংবাদ সম্মেলন করি। আমাদের পরিকল্পনা ছিল বাংলাদেশ–কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল ভিজিট করা, তারপর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে গিয়ে প্রেস কনফারেন্স করে হাসপাতাল ভিজিটের পর্ব শেষ করা। কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে গিয়ে দেখি শুক্রবারের দোহাই দিয়ে হাসপাতাল বন্ধ করে রাখা হয়েছে। রেগুলার ডিউটি করা কিছু ডাক্তার ছাড়া আর কেউই হাসপাতালে ছিলেন না। আমরা ওই হাসপাতাল থেকে বের হতে গেলে বুঝতে পারি বাইরে সাদাপোশাকের ডিবি পুলিশ আমাদের ঘিরে রেখেছে। আমরা চেয়েছিলাম আমাদের গ্রেপ্তার করা হলে যেন খবরে সেটার প্রমাণ থাকে। নইলে আমাদের গ্রেপ্তার না দেখিয়ে গুম করে ফেলা হবে। তাই আমি সমন্বয়ক আহনাফ সাঈদ খানকে কল করি। আহনাফ সাঈদ খান তখন আমাকে মুনতাসির রহমান নামে একজনের ফোন নম্বর দেন। উনি হিউম্যান রাইটস নিয়ে কাজ করার সুবাদে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। আমি মুনতাসির ভাইকে কল দিয়ে আমাদের অবস্থা জানালে উনি শুরুতে আমাদের দূতাবাসগুলোতে আশ্রয় দেওয়া কি না, সেই চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সংগত কারণেই কোনো দেশের দূতাবাস আমাদের গ্রহণ করতে চায়নি। ততক্ষণে আমাদের সবার ফোনের চার্জ ফুরিয়ে বন্ধ হওয়ার পথে। ফোন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে গ্রেপ্তার হলে আমরা সেই খবর কারও কাছে পৌঁছাতে পারব না। হান্নান মাসউদ ভাই তখন তাঁর এলাকার বড় ভাই জাহাঙ্গীরনগর ছাত্রদলের গাফফার ভাইকে (জিসান) ফোন করে অ্যাম্বুলেন্স ও পাওয়ার ব্যাংকের ব্যবস্থা করতে বলেন। হান্নান মাসউদ ভাই আর বর্তমান ডাকসুর সাহিত্য সম্পাদক মোসাদ্দেক বাংলাদেশ–কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে এসে আমাদের হাতে একটি পাওয়ার ব্যাংক দিয়ে যান। মোসাদ্দেক চলে যান, গাফফার ভাই আমাদের সঙ্গেই থাকেন। তাঁর ডাকা অ্যাম্বুলেন্সে করে আমরা বাংলাদেশ–কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে মাহিন সরকার ভাইকে হার্টের রোগী হিসেবে দেখিয়ে বের হয়ে আসি। হাসপাতালের বাইরের গেটে আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়; তারপর আমাদের পিছু নেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে এটুকু বোঝাপড়া আমার ছিল যে যেহেতু কোনো দেশের দূতাবাসকে সেই দেশের টেরিটরি বিবেচনা করা হয়, তাই আমরা যদি কোনো একটা দেশের দূতাবাসের আশপাশে গিয়ে দাঁড়াতে পারি, তাহলে আমাদের গ্রেপ্তার করার সুযোগ কমে যাবে। আর গ্রেপ্তার করলেও তার দৃশ্য ওই কূটনৈতিক জোনের সিসিটিভিতে রেকর্ড করা থাকবে। তাই আমরা নতুনবাজার আমেরিকান দূতাবাসের পাশের রাস্তায় অ্যাম্বুলেন্স থামিয়ে অবস্থান করতে থাকি। তখন মুনতাসির ভাই একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার (সংগত কারণে সংস্থাটি বা তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করতে পারছি না) বাংলাদেশে নিযুক্ত প্রধানের ফোন নম্বর আমাকে দেন; বলেন যে তিনি আজকের রাতের জন্য আমাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে পারবেন। আমরা সে অনুযায়ী ওই ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং রাতে তাঁর ব্যবস্থা করা আশ্রয়ে অবস্থান করি।
পরদিন সকালে (২৭ জুলাই) মানবাধিকার সংস্থাটির ওই প্রধান ফটোসাংবাদিক শহিদুল আলমের সুপারিশে তাঁর এক বন্ধুর বোর্ডিং স্কুলে আমাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দেন। আমি, আবদুল হান্নান মাসউদ ও মাহিন সরকার সেখানে একটি অনলাইন প্রেস ব্রিফিংয়ে ঘোষণা দিই আন্দোলন আবারও কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় পরিচালিত হবে; এবং আমরা তিন দফা দাবি জানাই।
২৮ জুলাই আমরা যখন পরদিনের কর্মসূচি নিয়ে ভাবছিলাম, তখন নেত্র নিউজের সাংবাদিক তাসনীম খলিল আমাদের ফোন করে বলেন, ডিবি অফিসে আটক ছয়জন সমন্বয়ক আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। আমাদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল; এক মুহূর্তের জন্য ভেঙে পড়েছিলাম। অবশ্য পরের মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নিই, ডিবি অফিসে এই প্রত্যাহার মানি না, আন্দোলন চলবে।
আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ডিবি অফিসের ছয়জনকে দায়মুক্তি দেওয়ার কথাও মাথায় ছিল। তারা কী পরিস্থিতিতে প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে আমরা জানি না। তাই ফেসবুক পোস্টে মুষ্টিবদ্ধ হাতের ছবি পোস্ট করে জানান দিই যে আন্দোলন চলবে। ক্যাপশনে লিখে দিই—‘সিনিয়ররা আগেই নির্দেশনা দিয়েছিল’ যে যারা মাঠে থাকবে তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবে। সারা দেশের জনগণ ডিবি অফিসের আন্দোলন প্রত্যাহারকে বয়কট করে আমাদের ঘোষণার সঙ্গে একাত্মতা জানায়। পরদিন আমরা বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করি।
এ ক্ষেত্রে আমরা চারজন একটা সিস্টেম বিল্ডআপ করেছিলাম। আমি আইডিয়ার জায়গাটা দেখতাম, হান্নান মাসউদ ভাই ও কাদের ভাই কমিউনিকেশন দেখতেন। সাধারণত শুরুতে আমরা পরবর্তী দিনের কর্মসূচি কেমন হতে পারে তার একটা আইডিয়া নিয়ে নিজেরা আলোচনা করতাম। আমরা একমত হলে সেটা নিয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সঙ্গে আলাদা মিটিং করতাম। মিটিংয়ে তাদের ইনপুটগুলো নোট করতাম এবং আবার আমরা বসে কর্মসূচি চূড়ান্ত করতাম। তারপর তা সংবাদমাধ্যমে পাঠানোর আগে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও অন্যান্য সংগঠনের বাকিদের জানিয়ে পাবলিক করে দিতাম। সিদ্ধান্ত আমরা নিলেও পুরো প্রক্রিয়াটা গণতান্ত্রিক ছিল। ফলে সব স্টেকহোল্ডারের মতামত দেওয়ার সুযোগ ছিল।
আমরা ওই দিন হাসিনার শোক প্রত্যাখ্যান করে চোখেমুখে লাল কাপড় বেঁধে কর্মসূচি ঘোষণা করি। যাদের পক্ষে লাল কাপড় জোগাড় করা কঠিন তাদের ফেসবুকের ডিসপ্লে পিকচার (ডিপি) লাল করতে বলি। এই কর্মসূচির প্রতি সারা দেশের মানুষ ব্যাপকভাবে সাড়া দেয়। পুরো ফেসবুক লালে লাল হয়ে যায়। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া থেকে শুরু করে ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস পর্যন্ত সবাই প্রোফাইল পিকচার লাল করেন। সত্যিকার অর্থে এই দিনই ফ্যাসিস্ট ও জুলাইপন্থীদের আলাদা স্বরূপ মানুষের সামনে স্পষ্ট হয়ে যায়। ফ্যাসিস্টরা চিহ্নিত হয়ে পড়ে এই দিনেই।
আমার মাথায় ভাবনা ছিল, সারা দেশের দেয়ালগুলোতে হাসিনার পতনের আওয়াজ ফুটিয়ে তুলতে হবে। জুলাইয়ের শহীদের রক্তে রাঙিয়ে দিতে হবে শহরের অলিগলি রাজপথ। সাংস্কৃতিক কর্মীদের মাঠে নামাতে হবে। একটু সফট কালচারাল কর্মসূচি দেওয়ার মাধ্যমে তাঁদের মাঠে নামার উপলক্ষ তৈরি করা আমার পরিকল্পনায় ছিল। আমি গ্রাফিতি অঙ্কন, দেয়াললিখন কর্মসূচি দিতে চাইলে অনেকেই এ ধরনের সফট প্রোগ্রামে আপত্তি জানায়। ছাত্রশিবির এই কর্মসূচিতে সমর্থন দিলেও বাকিরা সেভাবে সমর্থন দেয়নি। তখন আমি দায়িত্ব নিয়ে কর্মসূচি ঘোষণা করি। সিদ্ধান্তটা ক্লিক করেছিল। সারা দেশ হাসিনাবিরোধী গ্রাফিতিতে ছেয়ে যায়। সেই গ্রাফিতিগুলো হয়ে ওঠে হাসিনার পতনের সাক্ষী ও হাসিনা–পরবর্তী বাংলাদেশের আশা-আকাঙ্ক্ষার ঐতিহাসিক দলিল। যে সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে আওয়ামী লীগ নিজেদের একচেটিয়া সম্পত্তি ভাবত, তারাও জনগণের পক্ষে মাঠে নামে। হাসিনার মসনদ কেঁপে ওঠে।
ডিজিএফআই আমাদের প্রেশার দিচ্ছিল, যেন আমরা হাসিনার সঙ্গে আলোচনায় বসি। আমাদের ডাকসুতে প্যানেল ধরে জিতিয়ে দেওয়া হবে, এমনকি নাহিদ ইসলাম ভাইকে প্রতিমন্ত্রী বানানোর অফারও করে ডিজিএফআই। হাসনাত ভাই একটি প্রেস রিলিজ লিখে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে আমাদের দেখিয়ে নেন। কিন্তু পরদিন খবরের কাগজগুলোতে ‘শিক্ষার্থীরা আলোচনায় বসতে রাজি’ এমন শিরোনামে হাসনাত ভাইয়ের দেওয়া প্রেস রিলিজের বরাতে খবর আসতে থাকে। আমরা এ বিষয়ে তাঁর জবাব চাইলে তিনি আমাদের বলেন, তিনি আমাদের দেখিয়ে নেওয়া প্রেস রিলিজটাই পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু ডিজিএফআই মিডিয়াকে দিয়ে নিউজ ম্যানুপুলেট করিয়েছে।
এত দিনে আমরা আরও দুটি শেল্টার বদল করে ফেলেছি। ২৯ জুলাই আমাদের আশ্রয় দেন আইইউবি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা আন্দালিব চৌধুরী। সেখান থেকে পরদিন আমাদের নিতে আসেন মানবাধিকারকর্মী রেজাউর রহমান লেনিন। তাঁরা শুরুতে আমাদের জন্য সদরঘাটের কাছে একটি সস্তা হোটেলে শেল্টারের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু আমরা সেখানে থাকতে না চাইলে জুলকারনাইন সায়ের খান রেজাউর রহমান লেনিন ভাইকে ঢাকা মহানগর বিএনপির নেতা ওয়াহিদ ভাইয়ের নম্বর দেন। তিনি ডিওএইচএস–এ আমাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন।
১ আগস্ট ডিবি হেফাজত থেকে সমন্বয়কেরা মুক্ত হন। আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার ছিল তাঁদের মুক্তি। তাঁরা বেরিয়ে আসার পর আমরা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিই কাদের ভাই, মাসুদ ভাই, মাহিন ভাই ও আমার নেতৃত্বেই আন্দোলন চলবে। ডিবি হেফাজত থেকে সদ্য ফিরে আসা সমন্বয়কদের ব্যাপারে জনগণের ধারণা তখন পরিষ্কার ছিল না। তাঁরা ইতিমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছেন কি না, এ বিষয়ে সতর্ক পাবলিকের পক্ষ থেকে আমাদের সতর্ক থেকে কর্মসূচি দিতে বলা হয়েছিল।
এর মধ্যে ২ আগস্ট দ্রোহযাত্রা হয়। দিনটা ছিল শুক্রবার। ঢাবি ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মেঘমল্লার বসু আমাকে দ্রোহযাত্রা আয়োজনের বিষয়ে জানালে আমরা জানাই আমাদের বিক্ষোভ মিছিলগুলোকে আমরা প্রেসক্লাবে পাঠাব। পরে আমি স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে মিটিংয়ে এই প্রস্তাব তুললে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির একমত হয়। এমনিতেই এ দেশে শুক্রবার জুমার সময়ে মসজিদে মসজিদে জমায়েত হয়, জুমা শেষে মসজিদ থেকে মিছিল বের হয়। সেদিন তারা ঢাকার পয়েন্টগুলোকে একত্র হয়। সেখান থেকে প্রেসক্লাবে। মিছিল শহীদ মিনারে যায়। সিনিয়র সিভিল সিটিজেনদের সামনে রেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস খুলে দেওয়া হয়; শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ হলগুলো দখল নেয়। আমাদের বোঝাপড়া ছিল, ঢাবি ক্যাম্পাসই আন্দোলনের মূল মঞ্চ। ঘোষণা এই ক্যাম্পাস থেকেই যেতে হবে। ২ আগস্ট তারিখ ক্যাম্পাস দখলের ফলে আবারও ক্যাম্পাস থেকে আন্দোলন পরিচালনার বাস্তবতা তৈরি হয়।
শেখ হাসিনার বাহিনী ২ আগস্ট রাতে ঢাকায় বাসায় বাসায় ঢুকে গুলি চালায়। আমরা সিদ্ধান্ত নিই অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হবে। আমি সেই রাতেই অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দিলাম। কিন্তু আমাদের সঙ্গে আরও যারা যোগাযোগ রাখছিল, তারা চেয়েছিল আমাদের পক্ষ থেকে এক দফার ঘোষণা দেওয়া হোক। আবদুল কাদের ভাই তখন গুলশানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মকর্তা তাইসির ভাইয়ের বাসায় শেল্টারে ছিলেন। আমি এক দফা ঘোষণা করব কি না, এ নিয়ে পরামর্শ করার জন্য আসিফ মাহমুদ ভাইকে ফোন করি। ফোনে তাঁকে না পেয়ে ফোন করি নাহিদ ইসলাম ভাইকে। নাহিদ ভাই আমাকে এক দফা ঘোষণা না করার পরামর্শ দেন। সেদিন একটা টেনশনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। সেই কাহিনি বলার পরিস্থিতি হয়তো এখনো আসেনি; ইতিহাস তার সঠিক সময়ে সেই ঘটনা খুঁজে নেবে।
৩ আগস্ট এক দফা, ৫ আগস্ট ঢাকামুখী লাখো মানুষের ঢল, হাসিনার পতন। সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, উনি আমাকে জীবদ্দশায় এমন দিন দেখিয়েছেন। এই কৃতজ্ঞতাতেই বুক ভরে ওঠে। মিছিল আমাদের জাতীয় সংসদে নিয়ে গেল, চারদিকে মানুষের উল্লাস। আমি সংসদ ভবন থেকে ফিরে ঢাবি ক্যাম্পাসে এলাম। টিএসসির এক কোণে গিয়ে বসে রইলাম অনেকক্ষণ। একা। তারপর আসিফ মাহমুদ ভাইয়ের ফোন এল, তিনি আমাকে বেসরকারি টিভি চ্যানেল ২৪–এর অফিসে যেতে বললেন। আমি গিয়ে দেখি ততক্ষণে সবাই সেখানে জড়ো হয়েছেন। সংবাদ সম্মেলন হলো, লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হলো।
সত্যিকার অর্থে জুলাইয়ের প্রাপ্তি–অপ্রাপ্তি নিয়ে লিখতে গেলে অনেক পৃষ্ঠা লাগবে। হয়তো অনেক সত্য লেখার সময়ও আসেনি। জুলাইয়ের পর শিখেছি কীভাবে ইতিহাস পাল্টায়, মিডিয়া ন্যারেটিভ দিয়ে জুলাইয়ের কত নায়ক–মহানায়কের উত্থান হলো। অথচ সমন্বয়কদের মধ্যে একমাত্র গুলি খাওয়া অয়নের কথা স্মরণ রেখেছে কজন? শহীদ পরিবারেরা এখনো সাহায্যের জন্য ঘোরে, আহত ব্যক্তিদের কতজনের শরীরের বুলেট এখনো বের হয়নি। জুলাই নিয়ে কত মারামারি, কত ক্রেডিট ভাগাভাগি! কত মাস্টারমাইন্ড, ইমাম, মহানায়কের আড়ালে জুলাই বিভক্ত। সেই জুলাইয়ে সবাই ছিল, বিএনপি-জামায়াত, ডান-বাম, ধনী–গরিব, বুর্জোয়া-প্রলেতারিয়েত, সমাজপতি থেকে সাবঅলটার্ন সবাই। জুলাইয়ে ছিল হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবাই। রিকশাওয়ালা, ভ্যানওয়ালা, মুটে, মজুর বেশ্যা, সমকামী—সবার অংশগ্রহণে জুলাই গণ–অভ্যুত্থান হয়েছিল। অথচ বিভাজন আমাদের সামনে এগোতে দেয়নি। দেশের খুব একটা সংস্কার হলো না; বানরের রুটি ভাগাভাগির মতো সবাই ক্ষমতা ভাগেই ব্যস্ত বোধ হয়।
তবে সুযোগ হারায়নি। সবচেয়ে বড় কথা, আমরা একটা নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি। এখানে মানুষ ভোট দিতে পারে, কথা বলতে পারে, সমালোচনা করতে পারে। এই ধারাটাই বাংলাদেশকে পথ দেখাবে। একটা নতুন প্রজন্ম তৈরি হয়েছে, যারা বুলেটের সামনে খালি হাতে বুক পেতে দাঁড়াতে পারে। এই প্রজন্ম পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় রক্ত দিয়েছে। এরা বাংলাদেশকে পাল্টাবে। এই প্রজন্ম এ দেশে আরও ৫০ বছর বেঁচে থাকবে। এরা বেঁচে থাকতে বাংলাদেশে আর ফ্যাসিবাদের ফেরার সুযোগ নেই। এই প্রজন্মের রাজনীতি ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বিলোপ করে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বিনির্মাণের রাজনীতি। বাংলাদেশকে আর পেছনে ফিরিয়ে নেওয়ার পুরোনো রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না। আগামীর দিনগুলো সম্ভাবনার।
রিফাত রশিদ: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদ্য সাবেক সভাপতি