জবানবন্দিতে সাবেক র্যাব সদস্য
‘গলফ অপারেশনের’ কথা বলে দেওয়ায় আলকাছ মাঝিকে শেষ করে দিতে বলেছিলেন জিয়াউল আহসান
‘গলফ অপারেশন’-এর কথা ‘বলে বেড়ানোয়’ আলকাছ মাঝিকে এলিমিনেট বা হত্যা করতে বলেছিলেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান—আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দিতে এ কথা বলেছেন মেজর (অব.) সাব্বির রহমান ওসমানী। জবানবন্দিতে সাব্বির রহমান বলেন, অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে তিনি জিয়াউলের নির্দেশে আলকাছকে ‘এলিমিনেট’ (হত্যা) করতে রাজি হননি। তবে এর সপ্তাহখানেকের মাথায় জানতে পারেন, আলকাছ মাঝিকে খুঁজে পাচ্ছে না তাঁর পরিবার।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ বৃহস্পতিবার জবানবন্দিতে মেজর (অব.) মো. সাব্বির রহমান ওসমানী এ কথা বলেন। বিগত সরকারের সময় শতাধিক ব্যক্তিকে গুম ও হত্যার ঘটনায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এদিন তিনি ১৩তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন।
২০০৯ সালের অক্টোবরে সাব্বির রহমান র্যাব-৮ বরিশালে উপ–অধিনায়ক হিসেবে যোগ দেন। তখন র্যাবের মহাপরিচালক ছিলেন হাসান মাহমুদ খন্দকার এবং গোয়েন্দা শাখার পরিচালক ছিলেন তৎকালীন লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান। ২০১৩ সাল পর্যন্ত সাব্বির র্যাবে দায়িত্ব পালন করেন। উল্লেখ্য, কোনো ব্যক্তিকে হত্যার পর পেট কেটে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে বা সাগরে ফেলে দিয়ে লাশ গুম করাকে ‘গলফ অপারেশন’ বলা হতো।
জবানবন্দিতে মেজর (অব.) সাব্বির রহমান ওসমানী বলেন, ২০১১ সালের জুন মাসে জিয়াউল আহসান তাঁকে ফোন করেন। ফোনে ‘গলফ কাজে’ নিয়োগপ্রাপ্ত মাঝিদের অন্যতম আলকাছ মাঝির বিষয়ে তাঁর কাছে জানতে চান। উত্তরে তিনি জানান, এই মাঝির ব্যাপারে তাঁর কিছু জানা নেই। এতে জিয়াউল আহসান কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘আলকাছ মাঝি গলফ অপারেশনসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য চরদুয়ানী বাজারে বলে বেড়াচ্ছে, যা র্যাবের জন্য নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করেছে।’ এ কথা বলে জিয়াউল আলকাছ মাঝিকে ‘এলিমিনেট’ করার নির্দেশ দেন।
বিষয়টি শোনার পর শারীরিক অসুস্থতার অজুহাত দিয়ে এই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেতে তিনি অনুনয়-বিনয় করতে থাকেন বলে জানান সাব্বির রহমান। একপর্যায়ে জিয়াউল বলেন, ‘থাক, লাগবে না।’ পরে ঘটনাটি তিনি নিজের অধিনায়ককে জানান।
জিয়াউল গলফ অপারেশন পরিচালনার সময় যেসব মাঝি নৌকা বা ট্রলার চালাতেন, তাঁদের মধ্যে আলকাছ অন্যতম ছিলেন উল্লেখ করে সাব্বির রহমান বলেন, জিয়াউলের সঙ্গে যে কয়েকবার তিনি অভিযানে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, অধিকাংশ সময় আলকাছকেই মাঝি হিসেবে দেখেছিলেন। এর সপ্তাহখানেক পর হঠাৎ অধিনায়ক তাঁকে অফিসে ডেকে পাঠান। সেখানে যাওয়ার পর অধিনায়কের সামনে বসা ব্যক্তিদের আলকাছের পরিবার বলে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। সে সময় আলকাছের স্ত্রী জানান, চার-পাঁচ দিন আগে আলকাছকে ফোন করে ডেকে নিয়ে গেছেন জিয়াউল। এর পর থেকেই তাঁর আর কোনো সন্ধান মিলছে না।
‘বিডিআর সদস্যসহ একে একে চারজনকে হত্যা’
জবানবন্দিতে সাব্বির রহমান বলেন, ২০১০ সালের মে মাসের এক সন্ধ্যায় খবর পান জিয়াউল আহসান বরিশাল আসছেন। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই জিয়াউল তাঁর সরকারি গাড়ি ও দুটি মাইক্রোবাস নিয়ে ব্যাটালিয়ন সদরে উপস্থিত হন। আধা ঘণ্টা পর অধিনায়ক ও জিয়াউল অফিস থেকে বের হয়ে গাড়ির কাছে আসেন এবং সাব্বিরকে সঙ্গে যেতে বলেন। সাব্বির জিয়াউলের গাড়ির পেছনে বসেন। ওই গাড়িতে জিয়াউলের সঙ্গে অধিনায়কও ছিলেন। ব্যাটালিয়ন সদর থেকে তাঁদের গাড়ির পেছনে ঢাকা থেকে আসা র্যাবের গোয়েন্দা শাখার মাইক্রোবাস দুটিও চলতে থাকে। প্রায় দুই ঘণ্টা চলার পর তাঁরা চরদুয়ানী ঘাটে পৌঁছান। সেখানে আগে থেকেই প্রস্তুত একটি মাছ ধরার ট্রলার দেখতে পান।
র্যাবের গোয়েন্দা শাখার সদস্যরা মাইক্রোবাস থেকে নেমে ট্রলারে ওঠেন উল্লেখ করে জবানবন্দিতে সাব্বির রহমান বলেন, র্যাব সদস্যদের সঙ্গে চারজন ব্যক্তিকে মাথায় কালো টুপি পরা ও হাত পেছনে বাঁধা অবস্থায় ট্রলারে উঠতে দেখেন তিনি। এই চারজনকে ট্রলারের মাছ রাখার খোলে ঢোকানো হয়। এরপর জিয়াউল, অধিনায়ক ও সাব্বিরও ট্রলারে ওঠেন।
জিয়াউল আহসান ট্রলারটিকে মোহনার দিকে নিয়ে যেতে বলেন উল্লেখ করে সাব্বির রহমান বলেন, সেদিন আবহাওয়া প্রতিকূল ছিল। প্রায় দেড় ঘণ্টা চলার পর সামনে এগোনো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলে বিষয়টি জিয়াউলকে জানানো হয়। তখন জিয়াউল তাঁকে পানির গভীরতা মাপার নির্দেশ দেন। সুকানির সহকারীকেও ট্রলারের সামনে গিয়ে পানির গভীরতা মাপতে বলেন। তাঁরা কয়েকবার পানির গভীরতা জানানোর পর জিয়াউল গতি কমিয়ে দিতে বলেন।
এরপর জিয়াউলের ইশারায় র্যাবের গোয়েন্দা শাখার সদস্যরা খোল থেকে প্রথম ব্যক্তিকে হাত বাঁধা ও মুখ ঢাকা অবস্থায় পাটাতনে তুলে আনেন। তাঁর গলা ও পায়ে দুটি সিমেন্টভর্তি বস্তা বাঁধা হয়। এরপর র্যাবের এক সদস্য মাথায় কুশন ঠেকিয়ে পিস্তল দিয়ে একটি গুলি করেন। পরে অন্য এক সদস্য নাভি বরাবর পেট কেটে ফেলেন এবং পেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে কাটার সঠিকতা নিশ্চিত করেন।
জিয়াউল তখন সুকানিকে ইঞ্জিনের শব্দ বাড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন উল্লেখ করে সাব্বির রহমান বলেন, এরপর আবার পানির গভীরতা মাপা হয়। গভীরতা জানানোর পর জিয়াউল ইশারা করলে র্যাব সদস্যরা গুলিবিদ্ধ দেহটি সিমেন্টের বস্তাসহ পানিতে ফেলে দেন। একই প্রক্রিয়ায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় ব্যক্তিকেও হত্যা করে পানিতে ফেলা হয়।
চতুর্থ ব্যক্তিকে ট্রলারের খোল থেকে বের করার সময় বেশ বেগ পেতে হয়েছিল উল্লেখ করে সাব্বির বলেন, বাইরে আনা হলে আগের তিনজনের তুলনায় তাঁকে বেশ সুঠামদেহী বলে মনে হয়। তাঁকেও একইভাবে হত্যা করে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়।
এ ঘটনার দু-তিন দিন পর সাব্বির গোয়েন্দা সূত্রে জানতে পারেন, শরণখোলা রেঞ্জের বলেশ্বর নদে মুখ ঢাকা, পেট কাটা ও শরীরে সিমেন্টের বস্তা বাঁধা অবস্থায় একটি মরদেহ ভেসে উঠেছে। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি অধিনায়ককে জানান।
অধিনায়ক বিষয়টি জিয়াউলকে জানাতে বললে তিনি জিয়াউলকে জানান। এর দু-তিন মাস পর গোয়েন্দা তথ্যে জানা যায়, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে মরদেহটি বিডিআরের সাবেক সদস্য নজরুলের বলে শনাক্ত হয়েছে।