এ কে খন্দকার স্মরণীয় থাকবেন মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য

এ কে খন্দকার বীর উত্তমের স্মরণানুষ্ঠানে বক্তব্য দেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান। (বাঁ থেকে) সারওয়ার আলী, ওয়ালিউল ইসলাম, হাসান মাহমুদ, আলমগীর সাত্তার ও মাতুনা খন্দকার মোস্তফা। সোমবার বিকেলে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনেছবি: প্রথম আলো

মুক্তিযুদ্ধের উপপ্রধান সেনাপতি, এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার ছিলেন একজন অসাধারণ মানবিক মানুষ। অসামান্য শালীনতা, বিনয় ও সততার প্রতীক। মুক্তিযুদ্ধে তিনি যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, সে জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবেন বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান।

সোমবার বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে সম্প্রতি প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা এ কে খন্দকার বীর উত্তম স্মরণানুষ্ঠানে এক আলোচনায় বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান এ মন্তব্য করেন। এ কে খন্দকারের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আয়োজিত অনুষ্ঠানটি শুরু হয়।

মহুয়া মঞ্জুরী সুনন্দার পরিবেশনায় ‘আছে দুঃখ আছে মৃত্যু’ গানটি দিয়ে নিবেদন করা হয় সংগীত শ্রদ্ধাঞ্জলি। এরপর মুক্তিযুদ্ধে এ কে খন্দকারের অবদান ও বিমানবাহিনী নিয়ে একটি প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শন করা হয়। গত ২০ ডিসেম্বর এ কে খন্দকার ৯৫ বছর বয়সে ঢাকায় ইন্তেকাল করেন।

অধ্যাপক রেহমান সোবহান দীর্ঘ স্মৃতিচারণা করে বলেন, এ কে খন্দকারের সঙ্গে তাঁর প্রথম দেখা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় লিটন হোটেলের একটি ছোট ঘরে। তাঁকে দেখে সামরিক ব্যক্তিত্বের চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের মতোই মনে হয়েছিল। তবে কয়েক ঘণ্টা তাঁর কথা শুনে বুঝেছিলেন, কীভাবে তিনি মুক্তিযুদ্ধকে একটি সত্যিকারের গেরিলা যুদ্ধভিত্তিক জাতীয় সংগ্রামে রূপ দিতে চেয়েছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, সংযত এবং অত্যন্ত স্বল্পভাষী। তাঁর অবদান কেবল উপপ্রধান সেনাপতির দায়িত্ব পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মুক্তিযুদ্ধ কীভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত, সে বিষয়ে একটি রাজনৈতিক ও সামরিক চেতনা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, ‘আমার ধারণা, তিনিই প্রথম ভারতীয় মিত্রদের এবং জেনারেল মানেক শকেও বোঝাতে সক্ষম হন, আমাদের সীমিত প্রশিক্ষণ ও সম্পদের কারণে মুক্তিযুদ্ধ কেবল গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমেই কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। জেনারেল ওসমানীর (জেনারেল এম এ জি ওসমানী, প্রধান সেনাপতি) যুদ্ধ-ভাবনা ও কৌশল ছিল তুলনামূলকভাবে প্রচলিত পদ্ধতির বা কনভেনশনাল। কিন্তু তিনি যুক্তি দেন গেরিলা যুদ্ধই ছিল একমাত্র অর্থবহ পথ। পরবর্তী সময়ে এই ধারণা সহসেনাপতিরা গ্রহণ করেন।’

রেহমান সোবহান বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পরেও এ কে খন্দকারের জীবন থেমে থাকেনি। তিনি বিমানবাহিনী গড়ে তোলেন। এয়ার চিফ অব স্টাফ হন। কূটনীতিক হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তী জীবনে তিনি সংসদ সদস্য, মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি তাঁর স্মৃতিকথা লেখার সময় অকপটে ইতিহাসের সত্য তুলে ধরেছিলেন। এ জন্য তাঁকে হয়রানি করা হয়, যা আমাদের জন্য লজ্জাজনক। সততা, সাহসী চরিত্রের তিনি প্রকৃষ্ট উদাহরণ।’ রেহমান সোবহান আক্ষেপ করে বলেন, ‘ইতিহাস বিকৃত করার প্রবণতা বাংলাদেশের এক বড় ট্র্যাজেডি। এখনো আমাদের একটি চূড়ান্ত ইতিহাস নেই।’

আমার ধারণা, তিনিই প্রথম ভারতীয় মিত্রদের এবং জেনারেল মানেক শকেও বোঝাতে সক্ষম হন, আমাদের সীমিত প্রশিক্ষণ ও সম্পদের কারণে মুক্তিযুদ্ধ কেবল গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমেই কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।
অধ্যাপক রেহমান সোবহান, অর্থনীতিবিদ

অনুষ্ঠানের সূচনায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারওয়ার আলী বলেন, এ কে খন্দকার ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ঘনিষ্ঠ সুহৃদ। মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি মুক্তিযোদ্ধা, প্রবাসী সরকার, ভারতীয় সরকার ও ভারতীয় সেনাবাহিনী—এই চারটি পক্ষের মধ্যে সমন্বয়কের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সবাইকে নিয়ে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করার অসাধারণ সক্ষমতা ছিল তাঁর।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন আলমগীর সাত্তার বীর প্রতীক বলেন, এ কে খন্দকার একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের উপপ্রধান সেনাপতি ও প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করেন। তবে তাঁর এই সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথা সেভাবে আলোচিত হয়নি। অথচ এ ভূমিকাটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মুজিবনগর সরকারের কর্মকর্তা সাবেক সচিব ওয়ালিউল ইসলাম বলেন, মুক্তিযুদ্ধকালে এ কে খন্দকার রণাঙ্গনের প্রকৃত অবস্থা উপাত্ত দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে বোঝাতে পারতেন। সমন্বয়ক হিসেবে বিভিন্ন পক্ষকে পরিস্থিতি বোঝানোর অসাধারণ দক্ষতা ছিল তাঁর।

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর পক্ষে এয়ার কমোডর হাসান মাহমুদ এ কে খন্দকারের জীবনীর গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, এ কে খন্দকারের অবদানকে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। ঢাকায় বিমানবাহিনীর একটি ঘাঁটির নাম তাঁর নামে করা হয়েছে।

পরিবারের পক্ষে এ কে খন্দকারের কন্যা মাতুনা খন্দকার মোস্তফা এই স্মরণানুষ্ঠান করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং অংশগ্রহণকারী সবাইকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, তাঁর আব্বা গভীরভাবে এই দেশকে ভালোবেসেছেন। দেশে যেন শান্তি বিরাজ করে, দেশবাসী ভালো থাকতে পারেন—সে জন্য কাজ করেছেন।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলাম ও গ্যালারি গাইড ইয়াসমিন লিসা।