স্বস্তিতে বই কিনছেন পাঠক
অমর একুশে বইমেলার দৃশ্যপট এবার বেশ আলাদা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মাঠে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো প্যাভিলিয়ন নেই। মূলত মাঠের উত্তর-দক্ষিণে লম্বা করে স্টলের সারি। বরাবরের মতো আলাদা করে শিশুচত্বরও করা হয়নি। মেলার পরিসরও আগের তুলনায় কমেছে। তবে এ কারণে দর্শনার্থীদের কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। বরং রমজান মাস বলে পরিবেশ কিছুটা নিরিবিলি। প্রকৃত ক্রেতারা বেশ স্বস্তিতে বই যাচাই–বাছাই করে পছন্দ করতে পারছেন।
গতকাল রোববার মেলার চতুর্থ দিনের সন্ধ্যায় মাওলা ব্রাদার্সের সামনে কথা হচ্ছিল চন্দন মণ্ডলের সঙ্গে। তাঁর বাড়ি ঢাকার নবাবগঞ্জে। এখান থেকে তিনি সরদার ফজলুল করিমের অনুবাদ করা প্লেটোর রিপাবলিক বইটি কিনেছেন। এটি অবশ্য অনেক আগে প্রকাশিত একটি বই। রাজধানীর তিতুমীর কলেজ থেকে এবার অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর পরীক্ষা দিয়ে বিসিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। চন্দন বললেন, না পড়া থাকলে পাঠকের কাছে সব বই নতুন। দর্শন তাঁর পছন্দের বিষয়। নিরিবিলি পরিবেশ থাকায় স্টলগুলোতে বেশ খানিকটা সময় নিয়ে বই দেখা যাচ্ছে।
বিভিন্ন স্টলের বিক্রেতারা জানালেন, আগের দিন শনিবারে লোকসমাগম বেশ ভালোই ছিল। ঐতিহ্যর ব্যবস্থাপক আমজাদ হোসেন বললেন, তাঁদের স্টলে অনেক নতুন বই এসেছে। বেশ দ্রুত মেলার স্টল নির্মাণ ও পথে ইট–বালু বিছানোর কাজ শেষ হয়েছে। এবার ভিন্ন পরিস্থিতিতে মেলা হচ্ছে। সে কারণে ছুটির দিন শনিবার লোক আগের বছরগুলোর তুলনায় কিছু কম হবে, এটা তাঁরা ধরেই নিয়েছিলেন। তবে লোক একেবারে কমও হয়নি। ফলে বড় স্টলগুলোতে বেশ বিক্রি হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে বেচাকেনা ভালোই হবে বলে তাঁর আশা।
গতকাল বিকেলে স্বপ্ন-’৭১ প্রকাশনের স্টলের সামনে মোড়ক উন্মোচন হলো ভ্রমণলেখক এলিজা বিনতে এলাহীর বই দেশে দেশে ঐতিহ্য ভ্রমণ। বইটিতে এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ১৯টি ঐতিহ্যবাহী স্থানের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন লেখক। মোড়ক উন্মোচন করলেন লেখক–গবেষক সারওয়ার মোর্শেদ ও ভ্রমণ সংগঠক আবু জাফর। এলিজা বিনতে এলাহী বললেন, এবার রোজার মধ্যে বইমেলা হচ্ছে বলে লোকসমাগম কিছু কম মনে হলেও গ্রন্থানুরাগীদের জন্য এটা একটা বিশেষ সুযোগও এনেছে। এবারের ঈদে প্রিয়জনদের অন্য উপহারসামগ্রীর সঙ্গে একটি-দুটি করে বইও উপহার দিতে পারেন। এতে যেমন প্রথাগত উপহারের বৈচিত্র্য আসবে, তেমনি বই বিক্রিও বাড়বে, নতুন পাঠক সৃষ্টিতে সহায়ক হবে।
প্রথমা প্রকাশনের স্টলের সামনে কথা হলো নির্মাণ প্রতিষ্ঠান মাদানী হাউজিংয়ের মহাব্যবস্থাপক (হিসাব) সৈয়দ শাহিনূর রহমানের সঙ্গে। স্ত্রী ও দুই মেয়ে সাদিকা রহমান, সাফরিন রহমান ও ছেলে সৈয়দ হাসিবুর রহমানকে নিয়ে এসেছিলেন তিনি। তাঁর মেয়েরা ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের আজিমপুর শাখার শিক্ষার্থী। ছোট ছেলে মাদ্রাসায় কোরআন হিফজ করছে। তিনি জানালেন, সন্তানদের ধ্রুপদি সাহিত্যের শিশুতোষ বইগুলো কিনে দিয়েছেন। তাঁর নিজেরও বই পড়ার আগ্রহ স্কুলজীবন থেকেই। সন্তানদের মধ্যেও যেন সেই আগ্রহ থাকে, সে জন্য প্রতিবছরই তাদের নিয়ে বইমেলায় আসেন। আজিমপুরে থাকেন। মেলা থেকে বই কিনে কোথাও সপরিবার ইফতার করে বাসায় ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।
প্রথমা প্রকাশনের স্টলের ব্যবস্থাপক সনাতন বড়াল জানালেন, ছুটির দিনের মতো না হলেও বিক্রি মন্দ নয়। গতকাল আলী রীয়াজের বাংলাদেশের সংবিধান: ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য ও ভবিষ্যৎ এবং মাসউদ আহমাদের উপন্যাস লাবণ্যর মুখ ভালো বিক্রি হয়েছে। আগের বইয়ের মধ্যে শাহাদুজ্জামানের উপন্যাস একজন কমলালেবু, বাদল সৈয়দের কিশোর উপন্যাস মিশন ৩৭০–এর কাটতি ভালো ছিল। গতকাল আরও এসেছে আল মাহমুদের ভ্রমণবিষয়ক
বই তিন শহর তিন আকাশ: প্যারিস, ম্যানচেস্টার, ভোপাল।
আমার কথা কইবে পাখি
প্রয়াত হওয়ার আড়াই দশক পেরিয়ে গেলেও এখনো আলোচনায় আছেন লেখক–চিন্তক আহমদ ছফা। জীবনাচরণে ও লেখাজোখায় তিনি স্বতন্ত্র। ছফাকে নিয়ে জনে জনে অভিজ্ঞতাও ভিন্নতর। ব্যক্তি ছফার চেয়ে সাহিত্যের ছফাকে চেনেন বেশি মানুষ। তিনি না ছিলেন গৃহী, না ছিলেন বিবাগি। প্রথমা প্রকাশনের আহমদ ছফা: আমার কথা কইবে পাখি নামের বইটিতে ছফাকে স্মৃতি থেকে তুলে এনেছেন লেখক মহিউদ্দিন আহমদ। এটি ছফার জীবনীগ্রন্থ নয়, নয় তাঁর সাহিত্যকর্মের মূল্যায়ন।
মহিউদ্দিন আহমদ সমসাময়িক ইতিহাস ও রাজনীতি নিয়ে অনেক দিন ধরে লিখছেন। জন্ম ঢাকায়। পড়াশোনা গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে।