প্রথম আলোর পোড়া ভবনে প্রদর্শনী
সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন ও সংহতি জানালেন বিদেশি কূটনীতিকেরা
উগ্রবাদীদের সুসংগঠিত হামলা ও আগুনে পুড়ে যাওয়া প্রথম আলো ভবনে শিল্প প্রদর্শনীতে এসে বিদেশি কূটনীতিকেরা সংবাদপত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের প্রতি তাঁদের সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। হামলার শিকার প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের প্রতি সংহিত জানিয়েছেন তাঁরা।
আজ বুধবার সকাল থেকে কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর অগ্নিদগ্ধ কার্যালয়ে শুরু হয়েছে শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘আলো’। বিশিষ্ট শিল্পী মাহ্বুবুর রহমান হামলার ভয়াবহতা এবং প্রথম আলোর ঘুরে দাঁড়ানোর সাহসিকতা নিয়ে এই ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম করেছেন। বেলা ১১টায় সংবাদপত্র মালিক, সম্পাদক ও সাংবাদিক নেতাদের উপস্থিতিতে এ প্রদর্শনী শুরু হয়। প্রচলিত অর্থে কোনো উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। অতিথিরা প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন। প্রদর্শনী ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার গুরুত্ব ও সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বক্তব্য দেন।
এই প্রদর্শনী চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে বেলা ১টা এবং বেলা ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রদর্শনী উন্মুক্ত থাকবে।
বিকেলে প্রদর্শনীটি ছিল বিদেশি কূটনীতিক ও আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য। তাঁদের মধ্যে ছিলেন যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারাহ কুক, ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে, ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা, ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো, স্পেনের রাষ্ট্রদূত গ্যাব্রিয়েল মারিয়া সিসতিয়েগা ওচহোওয়া দ্য চিনচিত্রু, নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত বোরিস ভ্যান বোমেল, কানাডার হাইকমিশনার অজিত সিং, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার, আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত মার্সেলো কার্লোস সেসা, সিঙ্গাপুরের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স মিচেল লি ও সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের কাউন্সেলর আলবার্টো জিওভানেতি। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান এবং ইউএনডিপি, ইউএন উইমেন ও জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের ঢাকা দপ্তরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
অতিথিদের মধ্যে আরও ছিলেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, সদ্য বিদায়ী উপদেষ্টা ফওজুল করিম খান ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান (মঞ্জু), আইনজীবী সারা হোসেন, লেখক খান মো. রবিউল আলম, ডা. তাসনিম জারা প্রমুখ।
বিদেশি কূটনীতিকেরা প্রথম আলোর প্রতি সংহিত প্রকাশ করেন এবং চারতলা ভবনজুড়ে প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন। যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারাহ কুক বলেন, ‘আমরা সবাই ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করতে এখানে উপস্থিত হয়েছি। গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন জানাতে এসেছি।’
ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেন, ‘প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের প্রতি সংহতি জানাতে ডিসেম্বেরও আমরা এসেছিলাম। আবারও ফিরে এসেছি, কারণ আমরা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, বাক্স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। আমরা এ–ও বিশ্বাস করি, সাংবাদিকেরাই গণতন্ত্রের ভয়হীন রক্ষক।’
কানাডার হাইকমিশনার অজিত সিং বলেন, ‘গণতন্ত্র কখনোই মুক্ত ও স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ছাড়া বিকশিত হতে পারে না। এই পথে অবিচল থাকার সাহসের জন্য আপনাদের ধন্যবাদ।’
ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা বলেন, ‘এই ধ্বংসযজ্ঞ দেখা ভীষণ হৃদয়বিদারক। তবে একই সঙ্গে এমন দৃঢ়তা ও শক্তি নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে দেখাও অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এ ধরনের হামলা আমাদের প্রত্যাশিত গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের যৌথ মূল্যবোধ ও আকাঙ্ক্ষাকে কোনোভাবেই প্রতিফলিত করে না।’
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মৌলিক অধিকার বলে উল্লেখ করেন ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে।
ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো বলেন, ‘তথ্যের স্বাধীনতা আমাদের মূল্যবোধের কেন্দ্রে রয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর প্রতি আমাদের পূর্ণ সংহতি জানাই।’
স্পেনের রাষ্ট্রদূত গ্যাব্রিয়েল মারিয়া সিসতিয়েগা ওচহোওয়া দ্য চিনচিত্রু বলেন, গণতন্ত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি পূর্ণ অঙ্গীকারবদ্ধ থাকতে হবে।
মুক্ত গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমাহীন বলে স্মরণ করিয়ে দেন নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত বোরিস ভ্যান বোমেল।
আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত মার্সেলো কার্লোস সেসা বলেন, যারা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা।
সিঙ্গাপুর প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের পাশে রয়েছে এবং সংহতি প্রকাশ করছে বলে উল্লেখ করেন দেশটির চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স মিচেল লি।
যুক্তরাষ্ট্র মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও বাক্স্বাধীনতার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ উল্লেখ করে মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র পূর্ণিমা রায় বলেন, ‘ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর পাশে আমরা দৃঢ়ভাবে আছি।’
গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি প্রতিফলিত হয় তখনই, যখন গণমাধ্যম ক্ষমতাবানদের সামনে সত্য তুলে ধরতে পারে বলে উল্লেখ করেন ইউএন উইমেনের বাংলাদেশ উপপ্রতিনিধি নবনীতা সিনহা। তিনি বলেন, ‘আমরা জোরালোভাবে বলতে চাই—আগামী দিনগুলোতেও প্রথম আলোর শক্তি আরও বাড়ুক।’
জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের ঢাকা দপ্তরের প্রতিনিধি জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আমার দিন শুরু হয় ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো পড়ে এবং এটি আগামীতেও চলবে। মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় থেকে রইল আন্তরিক শুভকামনা।’
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ বলেন, প্রথম আলোতে এই হামলা ছিল সুসংগঠিত। এই প্রদর্শনীতে হামলার ভয়াবহতা ও সাংবাদিকদের সাহস তুলে ধরা হয়েছে।
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে উগ্রবাদীদের আগুনে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া প্রথম আলোর ভবনে শৈল্পিক প্রতিবাদের ভাষা দেওয়া শিল্পী মাহ্বুবুর রহমান বলেন, দেশে সংবাদপত্র কার্যালয়ে এমন সহিংস হামলা আগে কেউ দেখেনি, কেউ প্রত্যাশা করেনি। এই ভয়াবহ হামলার শিকার প্রতিষ্ঠানটিতে ধ্বংসের কালো দাগের পাশাপাশি তিনি প্রাণশক্তি ও সাহসের প্রতীক হিসেবে উজ্জ্বল গোলাপি, হলুদ, সবুজ রং ব্যবহার করেছেন। বহু গাছপালা, পায়রাসহ বিভিন্ন জীবন্ত সত্তা ব্যবহার করে ধ্বংস ও সৃষ্টির বৈপরীত্যের দিকটি তুলে ধরেছেন।
ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান বলেন, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার—এই দুটি প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা ব্যক্তিগতভাবে তাঁর জন্য ছিল খুবই হৃদয়বিদারক। তবে সৌভাগ্যের বিষয়, সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হলেও কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। একটা বড় দুর্যোগের মধ্যে পড়লেও শেষ পর্যন্ত সবাই রক্ষা পেয়েছেন।
সিমিন রহমান বলেন, এত বড় বিপর্যয়ের মধ্যেও প্রথম আলো, ডেইলি স্টারের সাংবাদিকেরা প্রচণ্ড সাহসিকতার সঙ্গে দ্রুত কাজে ফিরে এসেছেন। নিষ্ঠার সঙ্গে সাংবাদিকতার পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁরা প্রমাণ করেছেন, কোনো হামলা–আক্রমণের কাছে তাঁরা মাথা নত করবেন না। সব প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রথম আলা–ডেইলি স্টার আপসহীনভাবে সাংবাদিকতা করে যাবে।
বিদেশি কূটনীতিকদের উদ্দেশে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘আজ আমি আপনাদের বন্ধু হিসেবে সম্বোধন করতে চাই। কারণ, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আপনারা গণমাধ্যমের বন্ধু হয়ে উঠেছেন। আজ এই আয়োজন বন্ধুদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।’
ওই হামলার ভয়াবহতার বিবরণ তুলে ধরে মাহফুজ আনাম বলেন, ডেইলি স্টারে সেদিন অগ্নিকাণ্ডকবলিত ভবনে ২৭ জন কর্মী আটকা পড়েছিলেন। তাঁরা ফোনে বলছিলেন, হয়তো তাঁরা আর ঘরে ফিরতে পারবেন না। অনুভব করুন, কী ভয়ানক ছিল তখন সেই পরিবেশ। তারপর সেখান থেকে ফিরে এসে তাঁরা পরদিনই কাজে যোগ দিয়েছেন। তাঁরা দমে যেতে চাননি।
এই হামলা হয়েছিল সংবাদপত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপরে উল্লেখ করে ডেইলি স্টার সম্পাদক বলেন, ‘কিন্তু হামলাকারীরা আমাদের দমাতে পারেনি। আমি বলতে চাই, এই ভবনগুলোতে যে আগুন জ্বালানো হয়েছিল, তা আমাদের ভেতরে সাংবাদিকতাকে আরও উচ্চ শিখরে নিয়ে যাওয়ার প্রেরণার আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে।’
প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান সবাইকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে উগ্রবাদীরা প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ওপর হামলা করেছিল। সেই দুঃসময়ে অনেকে আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে সাহস দিয়েছেন। সংহতি প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও গণমাধ্যম আমাদের পাশে ছিল। আমরা মনে করেছিলাম, সারা বিশ্ব আমাদের সঙ্গে আছে।’
মতিউর রহমান বলেন, ‘হামলাকারীরা আমাদের ভবন পুড়িয়ে দিয়েছে; কিন্তু আমাদের সাহস, মূল্যবোধ ও সাংবাদিকতার প্রতি আমাদের নিষ্ঠা ও দায়বদ্ধতাকে পোড়াতে পারেনি। আমরা এখন আরও প্রাণশক্তি ও উদ্দীপনা নিয়ে নিষ্ঠাবানভাবে আমাদের দায়িত্ব পালন করে যাব।’