দম্পতিদের বয়সের পার্থক্যের হার বাড়ছে, ৪ জনে ১ জনের স্বামী ১০ বছরের বড়
মো. সেলিম রেজার বয়স ৩০ বছর। তিনি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তাঁর স্ত্রী মোসা. খাদিজা খাতুনের বয়স ১৯ বছর। অর্থাৎ স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বয়সের পার্থক্য ১১ বছর।
চার বছর আগে কিশোরী অবস্থায় বাল্যবিবাহ হয় খাদিজার। এই দম্পতির সঙ্গে গত ৩ মে দেখা হয়েছিল সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার ঘোরজান ইউনিয়নে। তৃতীয়বার অন্তঃসত্ত্বা হওয়া স্ত্রীকে নিয়ে সেলিম রেজা এসেছিলেন ব্র্যাকের স্বাস্থ্যসেবা ক্লিনিকে। সেই সময় সেলিম রেজা এই প্রতিবেদককে তাঁর ও স্ত্রীর বয়স জানিয়েছিলেন।
চর এলাকাটিতে ১৪ থেকে ১৬ বছর বয়সী মেয়েদের বাল্যবিবাহের হার বেশি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিশোরী মেয়েদের স্বামীর সঙ্গে বয়সের পার্থক্য ১০ বছরের বেশি। অবশ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ পার্থক্য ৩ থেকে ৪ বছরের। যেমন এই প্রতিবেদক ঘোরজান চর থেকে নৌকা ঘাটে যেতে যে মোটরসাইকেলে চড়েছিলেন, সেই মোটরসাইকেলচালক মো. হৃদয়ের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী মরিয়মের বয়সের পার্থক্য ৪ বছরের।
হৃদয়ের বয়স ২০ বছর। কম বয়সে বিয়ের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, ‘একটু ঝামেলায় পড়ছিলাম। প্রেম ছিল। তাই দুই পরিবার গত বছর বিয়ে দিয়া দিল।’
বিবিএসের জরিপে আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী বিবাহিত কিশোরীদের ৪৫ শতাংশের স্বামী তাঁদের চেয়ে ৫ থেকে ৯ বছরের বড়। ২০ শতাংশের স্বামী শূন্য (সমবয়সী) থেকে ৪ বছরের বড়। মাত্র ১ শতাংশ ক্ষেত্রে স্বামী বয়সে স্ত্রীর চেয়ে ছোট।
দম্পতিদের বয়সের পার্থক্যের তথ্য পাওয়া যায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (মিকস) ২০২৫–এর প্রাথমিক প্রতিবেদনে। ওই প্রতিবেদন অনুসারে, বিবাহিত ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রায় ২৪ শতাংশ এবং ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী প্রায় ২৬ শতাংশ মেয়ের স্বামী তাঁদের চেয়ে বয়সে ১০ বছর বা তার বেশি বড়।
বিবিএসের জরিপে আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী বিবাহিত কিশোরীদের ৪৫ শতাংশের স্বামী তাঁদের চেয়ে ৫ থেকে ৯ বছরের বড়। ২০ শতাংশের স্বামী শূন্য (সমবয়সী) থেকে ৪ বছরের বড়। মাত্র ১ শতাংশ ক্ষেত্রে স্বামী বয়সে স্ত্রীর চেয়ে ছোট।
বিবিএসের স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২৩ প্রতিবেদন অনুসারে, প্রথম বিয়ের ক্ষেত্রে ছেলেদের গড় বয়স ২৪ বছরের বেশি। আর মেয়েদের ১৮ বছরের বেশি। অর্থাৎ ছেলে-মেয়ের প্রথম বিয়ের গড় বয়সের পার্থক্য প্রায় ৬ বছর। অতিদরিদ্র পরিবারে ছেলেদের প্রথম বিয়ের গড় বয়স ২২ বছর। মেয়েদের ক্ষেত্রে তা ১৭ বছর। ধনী পরিবারে ছেলেদের বিয়ের গড় বয়স ২৭ বছর। মেয়েদের ক্ষেত্রে তা ২১ বছর।
বিবিএসের উপপরিচালক (জনমিতি ও স্বাস্থ্য শাখা, অতিরিক্ত দায়িত্ব: ফোকাল পয়েন্ট স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস প্রকল্প ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-এসডিজি সেল) মো. আলমগীর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশে বিয়ের ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর বয়সের পার্থক্য নতুন কিছু নয়। আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের কারণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্ত্রীর চেয়ে স্বামী ৫ থেকে ১০ বছর বা এর বেশি বড় হয়ে থাকেন।
আলমগীরের মতে, দেশে একজন পুরুষ উপার্জন শুরু করার পর বিয়ের কথা ভাবেন। অন্যদিকে মেয়েদের কম বয়সে বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। একদিকে বাল্যবিবাহ হচ্ছে, অপরদিকে মেয়েরা উপার্জন করে বিয়ে করবে তেমনটা ভাবা হয় না। ফলে বিয়ের ক্ষেত্রে স্বামীর বয়স স্ত্রীর চেয়ে বেশি হয়ে যায়।
বয়সের পার্থক্যের হার বেড়েছে
কিশোরীর সঙ্গে বয়স্ক পুরুষের বিয়ের খবর প্রায়ই গণমাধ্যমে আসে। যেমন প্রথম আলোতে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে গোপনে ১২ বছরের এক কিশোরীকে বিয়ে করেন ৬০ বছরের এক ব্যক্তি। ঘটনাটি ফরিদপুর সদর উপজেলার। এ ঘটনায় বাল্যবিবাহের অপরাধে ভ্রাম্যমাণ আদালত ওই ব্যক্তি এবং কিশোরীর কয়েকজন স্বজনকে সাজা দেন।
তিনটি মিকস প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৫ থেকে ১৯ এবং ২০ থেকে ২৪ বছর—দুটো বয়স শ্রেণির মেয়েদের ক্ষেত্রে এক যুগের আগের তুলনায় বেশি বয়স পার্থক্যের স্বামীর হার বেড়েছে। অন্যদিকে ৭ বছর আগের তুলনায় কমেছে।
মিকস ২০১২-১৩ প্রতিবেদনে ১৫ থেকে ১৯ এবং ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী মেয়েদের ক্ষেত্রে ১০ বছর বা এর বেশি বয়সী স্বামীর হার ছিল যথাক্রমে ২০ শতাংশ ও প্রায় ২২ শতাংশ। অর্থাৎ ৪ শতাংশ করে বেড়েছে। অপরদিকে মিকস ২০১৯ প্রতিবেদন অনুসারে, দুটো বয়স শ্রেণির ১০ বছর বা এর বেশি বয়সী স্বামীর হার ছিল যথাক্রমে প্রায় ৩১ শতাংশ ও প্রায় ২৮ শতাংশ। এই বয়স পার্থক্য ধনী ও গরিব—সব ক্ষেত্রেই বেশি দেখা যায়।