সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীদের হামলার শিকার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো ভবনে দ্বিতীয় দিনের মতো চলছে ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘আলো’। প্রথম আলোর আক্রান্ত ও অগ্নিদগ্ধ ভবন নিয়ে এই শিল্প-আয়োজনে দর্শনার্থীরা দেখছেন পুড়ে যাওয়া কম্পিউটার, যন্ত্রাংশ, টেবিল, চেয়ার, বই, নথিপত্র ইত্যাদি।
আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় এই শিল্প-আয়োজন শুরু হয়। চলে বেলা একটা পর্যন্ত। আবার বেলা তিনটায় শুরু হয়ে চলবে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত। ‘আলো’ নামের এই শিল্প-আয়োজন গতকাল বুধবার উদ্বোধন করা হয়। এই আয়োজন চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। শিল্প-আয়োজনটি সবার জন্য উন্মুক্ত।
আজ সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান, মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম কাদের প্রমুখ প্রদর্শনী দেখতে আসেন।
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে প্রতিহিংসায় উন্মত্ত একদল উগ্রবাদী প্রথম আলো কার্যালয়ে হামলা চালায়। তারা ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের পর প্রথম আলো ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। হামলার শিকার ভবনটিতে শিল্পকর্ম করেছেন বিশিষ্ট শিল্পী মাহ্বুবুর রহমান।
হামলার শিকার প্রথম আলোর ভবনটিতে প্রবেশ করতেই এখনো পোড়া গন্ধ আসে। প্রবেশ করে বাঁ দিকে গেলে কিছু চিত্রকর্ম। একটি চিত্রকর্মে দেখা যায়, পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া একটি ভবন। আরেকটি চিত্রকর্মে ফুটে উঠেছে পোড়া ভবনের সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দাঁড়িয়ে আছে—আরেকটি চিত্রকর্মে এমনটি উঠে এসেছে।
চারজন মানুষ পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে—এমন স্থাপত্যও রয়েছে সেখানে। চিত্রকর্ম ও স্থাপত্যের পাশাপাশি সেখানে রাখা হয়েছে প্রথম আলোর পুড়ে যাওয়া কম্পিউটারসামগ্রী ও আসবাব।
এসব স্থাপত্য ও পুড়ে অঙ্গার বিভিন্ন জিনিসের ছবি তুলছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রোর স্ত্রী পাওলা বেলফিউরে। পাওলা আড়াই বছর ধরে বাংলাদেশে আছেন। তিনি ব্যতিক্রমী এই শিল্প-আয়োজন দেখতে এসেছেন।
পাওলা বেলফিউরে প্রথম আলোকে বলেন, গত বছরের ডিসেম্বরে যা ঘটেছিল, তা স্মরণে রাখা, স্মৃতিকে ধরে রাখার খুব সুন্দর উপায় এই প্রদর্শনী। সেটি খুব ভালোভাবে করা হয়েছে। প্রদর্শনীর পেছনে অনেক ভাবনাচিন্তা ও ধারণাগত কাজ আছে। এটি খুবই প্রভাবশালী একটি প্রদর্শনী। একই সঙ্গে এটি খুব স্পর্শকাতর।
প্রদর্শনীর দোতলায় পোড়া বই প্রদর্শন করা হয়েছে। আগুনে যেসব বই পোড়েনি, সেগুলোই প্রদর্শন করা হয়েছে। অক্ষত বইয়ের প্রদর্শনীতে লেখা—‘এই মহাসাগরে স্নান করে জাগোরে’। দোতলার নথিপত্র, বই, আসবাব, যন্ত্রাংশসহ যাবতীয় ধ্বংসস্তূপের ওপর রয়েছে সাদা কফিন।
দোতলায় কথা হয় প্রদর্শনীতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মো. সাদ্দাম প্রামাণিকের সঙ্গে। ধ্বংসস্তূপ দেখে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সবই পুড়ে গেছে, কিছু অবশিষ্ট নেই। ভবনে আগুন দেওয়াটা খুবই খারাপ কাজ হয়েছে। এভাবে হামলা করা নিন্দনীয়। যারা এই কাজ করেছে, তাদের বিচার হওয়া উচিত।
সাদ্দাম প্রামাণিক বলেন, এই প্রদর্শনীও সুন্দর হয়েছে, যার মাধ্যমে সেই ধ্বংসযজ্ঞ তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে।
তৃতীয় তলায় পুড়ে যাওয়া লোহালক্কড় প্রদর্শন করা হয়েছে। পাশাপাশি এই ফ্লোরের পোড়া বৈদ্যুতিক তার এবং অন্যান্য জিনিসও আছে। ওই সময় প্রথম আলোর যেসব কর্মী ভবন পুড়তে দেখেছেন, তাঁদের বক্তব্যও প্রদর্শিত হচ্ছে।
ছেলেকে নিয়ে এই শিল্প-আয়োজন দেখতে আসেন ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সাংবাদিক এনামুল হক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এটি একটি বিভৎস ও ধ্বংসাত্মক ঘটনা। দেশের ইতিহাসে সংবাদপত্রের ওপর এ ধরনের ঘটনা আগে ঘটেনি। এই ঘটনা প্রতিরোধ করার জন্য সে সময়ের সরকার যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। গণমাধ্যমকর্মীরা ঐক্য ধরে না রাখতে পারলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।
চতুর্থ তলায় প্রদর্শন করা হচ্ছে প্রথম আলো ভবনে হামলার ভিডিও চিত্র। সেই সঙ্গে চতুর্থ তলায় উগ্রবাদীরা যে লুটপাট ও ভাঙচুর করেছে, তা–ও প্রদর্শিত হচ্ছে। ভাঙচুর করা ও এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা জিনিসপত্রের ওপর রয়েছে একঝাঁক কবুতর। সেখানেই কথা হয় দীপ্ত টিভির সাংবাদিক কামাল শামসের সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রদর্শনীতে এসে তাঁর রোমহর্ষ অনুভূতি। হামলার চমৎকার উপস্থাপনা হয়েছে এখানে।
দেশে এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সেই প্রত্যাশা রেখে কামাল শামস বলেন, ‘মব জাস্টিস’ আসলে ‘জাস্টিস’ (ন্যায়বিচার) নয়। এর সঙ্গে জড়িত সবার বিচার করতে হবে, তাহলে এ ধরনের ঘটনা রোধ করা সম্ভব হবে।
সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শাহরিয়ার ও আল মামুন নামের দুজন প্রদর্শনী দেখতে আসেন। এর মধ্যে শাহরিয়ার প্রথম আলোকে বলেন, প্রত্যেকের মতপ্রকাশের অধিকার আছে। অন্যের মতকে চেপে ধরার জন্য এ ধরনের ধ্বংসলীলা চালানো ঠিক হয়নি।