‘ভাইরাল মিজান’কে কারা এত পরিচিত করল

রাজধানীর আগারগাঁওয়ের ফুটপাতে গড়ে ওঠা ‘মিজানের ভাতের হোটেল’ ও আশপাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। মঙ্গলবার দুপুরেছবি: প্রথম আলো

মঙ্গলবার দুপুর ১২টা। রাজধানীর আগারগাঁওয়ের তালতলার ফুটপাতে চুলা বসিয়ে রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মিজান। ঠিক তখন সেখানে হাজির ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উচ্ছেদকারী দল। নিমেষেই গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো তাঁর রান্নার চুলা আর স্তূপ করে রাখা জ্বালানি কাঠ। মাস দেড়েকের ব্যবধানে এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো উচ্ছেদ হলেন তিনি।

ফুটপাত দখল করে এভাবে খাবার বিক্রির জেরে আগে জেল খেটেছেন মিজান; কিন্তু জেল থেকে ছাড়া পেয়ে গলায় ফুলের মালা পরে তিনি যখন আবারও ফুটপাতে ফিরলেন, তখন তাঁর পরিচিতি আরও বেড়ে যায়। তিনি তখন আর দশজন ফুটপাতের সাধারণ হকারের মতো থাকেননি। মিজান তত দিনে ‘ভাইরাল মিজান’।

মূলধারার কোনো সংবাদপত্র বা টেলিভিশন চ্যানেল মিজানকে নিয়ে বড় কোনো প্রতিবেদন করেনি। বিজ্ঞাপন দিয়ে কোনো প্রচারও তিনি চালাননি। তবে প্রশ্ন উঠছে, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রচার ছাড়া ফুটপাতের একজন সাধারণ ভাত বিক্রেতাকে কারা এতটা পরিচিত করল?

যেসবে পরিচিত হয়ে ওঠেন মিজান

তালতলার ফুটপাতে মিজানের দোকানের পরিচিতি পাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে শত শত স্মার্টফোনের ক্যামেরা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই দোকানের সামনে ভিড় জমান ফেসবুক পেজ, ইউটিউব চ্যানেল আর টিকটকের কনটেন্ট নির্মাতারা। কেউ ক্রেতাদের অনুভূতি লাইভ করেন, কেউবা রান্নার চুলার কাছে গিয়ে মিজানের মুখের সামনে মাইক্রোফোন ধরেন।

কারণ একটাই—অনলাইনে মিজানকে নিয়ে বানানো ভিডিও মানেই লাখ লাখ ‘ভিউ’ আর সেই সঙ্গে রয়েছে নিশ্চিত অর্থ উপার্জনের গ্যারান্টি। কনটেন্ট নির্মাতাদের এই ভিড়ের এক নিয়মিত মুখ ‘জাকির জ্যাক’। স্যুট-টাই পরে এই নির্মাতা সব সময় দোকানের আশপাশে লাইভ ও ভিডিও করেন।

মিজান নিজেও এখন বোঝেন, তাঁকে ঘিরে এই কনটেন্ট বাণিজ্য চলছে। রান্নার হাঁড়ির সামনে ক্যামেরার অতিষ্ঠ উপস্থিতিতে প্রায়ই তিনি নির্মাতাদের ওপর চড়াও হন, কটুকথাও শোনান। তাঁর ভাষায়, ‘আমার কাছে আইতে অইলে এসব হুনতেই অইব।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দর্শকেরা তাঁর এই রাগ ও খিস্তিখেউড়কেও উপভোগ করেন। এ বিষয়টি ভিডিওগুলোর কাটতি আরও বাড়িয়ে দেয়।

প্রথমবার আগারগাঁওয়ের ফুটপাতে গড়ে ওঠা ‘মিজানের ভাতের হোটেল’ ও আশপাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের দৃশ্য। ১৭ আগস্ট, ২০২৬
ছবি: প্রথম আলো

মাংস-ভাতের বাস্তবতা

কনটেন্ট নির্মাতারা শুধু ক্যামেরা নিয়ে হাজির হয়েছিলেন; কিন্তু সেই ভিডিওগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে কেন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল? উত্তর লুকিয়ে আছে গরুর মাংসের চড়া দামে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালেও ঢাকায় প্রতি কেজি গরুর মাংসের গড় দাম ছিল ৩০০ টাকা। সরকারি সংস্থা টিসিবির তথ্য বলছে, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮০ থেকে ৮৫০ টাকায়। আগারগাঁও ও তালতলার মধ্যমানের রেস্তোরাঁগুলোতে এক বাটি গরুর মাংসের দাম ১৮০ থেকে ২২০ টাকা। ভাতসহ পেট ভরে খেতে খরচ হয় কমপক্ষে ২৫০ টাকা।

সেখানে মিজান এক বাটি মাংস আর পেট পুরে ভাত তুলে দেন মাত্র ১০০ টাকায়। নির্মাণশ্রমিক রাসেল হোসেন বলেন, ‘এক কেজি গরুর মাংস কেনার সামর্থ্য আমাদের মতো দিনমজুরদের নেই। তাই কম টাকায় মাংস-ভাত খাওয়ার একমাত্র ভরসা ছিল এই দোকান।’ নিম্নবিত্তের এই খাদ্যের হাহাকারই সামাজিক মাধ্যমে তীব্র কৌতূহল ও সহানুভূতির জন্ম দেয়।

রিকশার গ্যারেজ থেকে ফুটপাত

ছোটবেলায় মায়ের হাত ধরে বরিশালের গ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছিলেন মিজান। বড় হয়েছেন এই তালতলাতেই। চরম অভাবের সংসারে মা মানুষের বাসায় ও পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। ফুটপাতে তরকারি আর রান্না করা ভাত বিক্রি করেও সংসার টেনেছেন মা।

মায়ের হাত ধরেই শ্রমের জগতে ঢোকেন মিজান। কখনো রিকশা চালিয়েছেন, কখনো বিক্রি করেছেন মৌসুমি ফল। তালতলার ফুটপাতেই ছিল তাঁর রিকশার একটি গ্যারেজ। সেটি ছেড়ে বছর দুয়েক আগে শুরু করেন ফুটপাতে ভাত বিক্রি। গত বছর ১০০ টাকায় গরুর মাংস-ভাত দেওয়া শুরুর পর ক্রেতারাই প্রথম তাঁর ভিডিও করে অনলাইনে ছড়ান। সেখান থেকেই রাতারাতি তাঁর ‘ভাইরাল’ জীবনের সূচনা।

জেলযাত্রা, ফুলের মালা ও কোটি ভিউ

গত ৯ আগস্ট মিজানের জীবনে বড় মোড় নেয়। কাফরুল থানার ওসি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, অবৈধ বিদ্যুৎ–সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে যাওয়া ভ্রাম্যমাণ আদালতের ওপর চড়াও হয়েছিলেন মিজান। সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাঁকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেন। এরপর ১৬ আগস্ট প্রথমবার তাঁর দোকানটি উচ্ছেদ করে ডিএনসিসি।

২৩ আগস্ট কারাগার থেকে বের হওয়ার পর দেখা যায় এক নজিরবিহীন দৃশ্য। একদল মানুষ ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন মিজানকে। সেদিনই তালতলায় এসে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে তিনি ঘোষণা দেন, দোকান আবার চালু হবে। ‘বিডিলাইভ’ নামের একটি ফেসবুক পেজে তাঁর মুক্তি পাওয়ার ভিডিওটি ১ কোটি ৩০ লাখের (১৩ মিলিয়ন) বেশি বার দেখা হয়। কারামুক্তিতে পাওয়া এই ‘নায়কোচিত’ ভাবমূর্তি তাঁকে সোশ্যাল মিডিয়ায় আরও বেশি জনপ্রিয় করে তোলে।

জনপ্রিয়তা কি সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা

গণযোগাযোগ ও গণমাধ্যমবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ফাহমিদুল হকের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তা এখন একধরনের ‘সামাজিক পুঁজি’। মিজানের ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটেছে। ভিডিও ভাইরাল হওয়ার মাধ্যমে পাওয়া পরিচিতি তাঁকে একটি শক্তিশালী সমর্থনভিত্তি দিয়েছে। এমনকি প্রথমবার দোকান ভাঙা ও জেল খাটার পরেও আবার ফুটপাতে ফিরে আসার সাহস জুগিয়েছে এই জনপ্রিয়তা।

উচ্ছেদের আগের দিন, সোমবারও তালতলায় কথা হয়েছিল মিজানের সঙ্গে। তখন তিনি জানিয়েছিলেন, প্রথমবার দোকান ভাঙার আগে দিনে ৮০ থেকে ৯০ কেজি চালের ভাত বিক্রি হতো; আর ভাইরাল হওয়ার পর বিক্রি বেড়ে দাঁড়ায় ১২০ কেজিতে।

তবে এই অন্ধ জনপ্রিয়তার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেন অধ্যাপক ফাহমিদুল হক। তিনি বলেন, জনপ্রিয়তা মানেই তা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বা ন্যায্যতা নয়। অ্যালগরিদম সত্য বা নীতি বিচার করে না, এটি কেবল মানুষের প্রতিক্রিয়া ও আবেগকে পুঁজি করে ছড়ায়। তিনি মনে করেন, মূলধারার গণমাধ্যমের উচিত এমন ঘটনায় কেবল ভেসে না গিয়ে এর পেছনের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও সামাজিক কারণগুলো বিশ্লেষণ করা।