ডেঙ্গু বাড়ছে, রোগী ৫৮ জেলায়, কোথায় বেশি
ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। ইতিমধ্যে ৫৮ জেলায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। বরিশাল বিভাগের জেলাগুলোতে ডেঙ্গুর রোগী বেশি দেখা যাচ্ছে।
গতকাল শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ১ জানুয়ারি থেকে ১৯ জুন পর্যন্ত দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। যে ছয়টি জেলায় ডেঙ্গু শনাক্ত হয়নি তার মধ্যে আছে ঢাকা বিভাগের শরীয়তপুর; সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার এবং রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলা।
অবশ্য ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা দুই–ই এখনো গত বছরের তুলনায় কম। গত বছর এই সময় পর্যন্ত; অর্থাৎ ১ জানুয়ারি থেকে ১৯ জুন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৭ হাজার ৭৭ জন রোগী। ওই সময় ডেঙ্গুতে মারা যান ৩০ জন। চলতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে ১৯ জুন পর্যন্ত হাসপাতালে ৪ হাজার ৬৮০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এই সময়ে মারা গেছেন ৭ জন।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও সময়–সময় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সিডিসি, আইইডিসিআর, এমআইএস ও হাসপাতাল শাখার পরিচালকদের নিয়ে একটি সেল গঠন করা হয়েছে।অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর মার্চ মাস থেকেই ডেঙ্গু প্রতিরোধের ওপর জোর দেয়। প্রতিষ্ঠান বা বাড়ি পরিদর্শন করে এডিস মশার লার্ভা শনাক্ত করার জন্য সরকার ভ্রাম্যমাণ আদালত গঠন করেছে। উপজেলা হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু কর্নার স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বেশি রোগীর চাপ সামাল দেওয়ার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মাঠে একটি ‘ফিল্ড হসপিটাল’ তৈরি রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে এ ধরনের হাসপাতাল আরও করা হবে বলে স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও সময়–সময় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে রোগনিয়ন্ত্রণ শাখা (সিডিসি), রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর), এমআইএস ও হাসপাতাল শাখার পরিচালকদের নিয়ে একটি সেল গঠন করা হয়েছে।
প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস আরও জানান, এক লাখ ব্যাগ স্যালাইন মজুত করা হয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে ১০ শতাংশ শয্যায় বিনা মূল্যে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দিতে এবং রোগনির্ণয় কেন্দ্রগুলোকে ডেঙ্গু ও ডেঙ্গু রোগ–সংক্রান্ত পরীক্ষায় ৮০ শতাংশ ছাড় দিতে বলা হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ মেডিসিন সোসাইটির সহায়তায় ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসার সমন্বিত গাইডলাইন হালনাগাদ করা হয়েছে। সেই গাইডলাইন ধরে সারা দেশের চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে। এই প্রশিক্ষণে সহায়তা দিচ্ছে ইউনিসেফ।
বর্ষা শেষ হওয়ার এক–দেড় মাস পর্যন্ত ডেঙ্গু বাড়তে পারে। সাধারণত জুলাই–আগস্ট মাসে ডেঙ্গু ‘পিকে’ থাকে বা সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ দেখা দেয়। তবে সরকার জোরালো কোনো কর্মসূচি না নিলে ডেঙ্গুর প্রকোপ অক্টোবরের পরও প্রলম্বিত হতে পারে।মুশতাক হোসেন, আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা
ডেঙ্গু বাড়ছে
সারা বছরই ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হতে দেখা যায়। তবে রোগতত্ত্ব ও কীটতত্ত্ববিদেরা বলেন, বর্ষা মৌসুমে ও বর্ষার শেষে ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। এপ্রিল থেকে অক্টোবর—এই মাসগুলোতে ডেঙ্গু রোগী বেশি হয়। ডেঙ্গু এপ্রিল থেকে বাড়তে থাকে এবং অক্টোবরের শেষ থেকে কমতে থাকে। তবে ডেঙ্গু এখন আর কোনো বিশেষ মাস বা মৌসুমের রোগ নয়, সারা বছরের রোগ।
এ বছর জানুয়ারিতে হাসপাতালে ১ হাজার ৮১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হন। ফেব্রুয়ারিতে রোগী কমে হয় ৪০৯ জন। মার্চ মাসে রোগী আরও কমে, ওই মাসে রোগী ভর্তি হন ৩৫৩ জন। এর পর থেকে রোগী বাড়তে থাকে। এপ্রিলে রোগী বেড়ে হয় ৬৪০, মে মাসে তা আরও বাড়ে। মে মাসে রোগী ভর্তি হয়েছিলেন ৭১৪ জন। আর চলতি জুন মাসের প্রথম ১৯ দিনে সারা দেশে রোগী ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৪৮৩ জন।
জনস্বাস্থ্যবিদেরা ধারণা করছেন, রোগী বৃদ্ধির এই প্রবণতা অক্টোবর পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বর্ষা শেষ হওয়ার এক–দেড় মাস পর্যন্ত ডেঙ্গু বাড়তে পারে। সাধারণত জুলাই–আগস্ট মাসে ডেঙ্গু ‘পিকে’ থাকে বা সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ দেখা দেয়। তবে সরকার জোরালো কোনো কর্মসূচি না নিলে ডেঙ্গুর প্রকোপ অক্টোবরের পরও প্রলম্বিত হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, এ বছর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ ঢাকা বিভাগে ১ হাজার ৬০১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বরিশাল বিভাগে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ২৪৩, চট্টগ্রাম বিভাগে ৯৫৬, খুলনা বিভাগে ৪৯০, রাজশাহী বিভাগে ১৭০, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৩৮ এবং সিলেট বিভাগে ৫৩।
বরিশালে ডেঙ্গু বেশি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঢাকা কার্যালয়ে হাম, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, ডেঙ্গু ও ডায়রিয়াবিষয়ক নিয়মিত সাপ্তাহিক (৮–১৪ জুন) বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ বরিশাল ও খুলনা বিভাগের জেলাগুলোতে বেশি দেখা যাচ্ছে।
পাশাপাশি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের দেওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে, এ বছর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ ঢাকা বিভাগে ১ হাজার ৬০১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বরিশাল বিভাগে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ২৪৩, চট্টগ্রাম বিভাগে ৯৫৬, খুলনা বিভাগে ৪৯০, রাজশাহী বিভাগে ১৭০, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৩৮ এবং সিলেট বিভাগে ৫৩। রোগী সবচেয়ে কম রংপুর বিভাগে। এই বিভাগে এ পর্যন্ত ২৯ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন।
মশা ও মশা বৃদ্ধির উপযুক্ত পরিবেশ, ভাইরাস এবং মানুষ—এই তিন বিষয়ের সংযোগ ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটায়। ধারণা করা যায় যে বরিশালে এটা ঘটছে।অধ্যাপক কবিরুল বাশার, মশাবিশেষজ্ঞ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক
বরিশাল বিভাগের ছয় জেলাতেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি দেখা যাচ্ছে। গত বছর এই বিভাগের বরগুনা জেলায় ব্যাপকভাবে ডেঙ্গু দেখা দিয়েছিল। সরকারি হিসাবে, গত বছর বরগুনা জেলার ৯ হাজার ৫৩৩ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন আর মারা গিয়েছিলেন ১৫ জন।
বরিশালের জেলাগুলোতে কেন ডেঙ্গু বেশি, এমন প্রশ্নের উত্তরে মশাবিশেষজ্ঞ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক কবিরুল বাশার প্রথম আলোকে বলেন, মশা ও মশা বৃদ্ধির উপযুক্ত পরিবেশ, ভাইরাস এবং মানুষ—এই তিন বিষয়ের সংযোগ ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটায়। ধারণা করা যায় যে বরিশালে এটা ঘটছে। যদি মশা নিধন করা যায় বা মশার বংশবিস্তার রোধ করা যায় অথবা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত মানুষকে পুরোপুরি আইসোলেশন করে রাখা যায়, তাহলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। শুধু বরিশালে নয়, যেকোনো এলাকায়।’