সমালোচনার মুখে গণমাধ্যম ও সম্প্রচারমাধ্যমের জন্য আলাদা কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। এখন ‘জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন’ নামে একটি কমিশনই হবে। তবে আইন থাকবে দুটি। কমিশনটি হবে ‘স্বাধীন সংস্থা’।
জাতীয় নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ কর্মদিবসে গত মঙ্গলবার এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। একই সঙ্গে সংশোধিত দুটি অধ্যাদেশের খসড়া মতামতের জন্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এমন সময়ে এটি করা হয়েছে, যখন এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ নেই। ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মতামত দেওয়ার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। তখন অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বকাল শেষ হয়ে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকবে। ফলে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে নতুন সরকারকে।
অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গত বছরের মার্চে প্রতিবেদন জমা দেয়। কিন্তু ১০ মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এত দিনে তাদের কোনো সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। মেয়াদের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে গত মাসের শেষ সপ্তাহে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ‘জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৬’ এবং ‘সম্প্রচার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৬ ’-এর খসড়া প্রকাশ করে।
প্রস্তাবিত ওই দুটি অধ্যাদেশে দুটি কমিশন গঠনের কথা ছিল। আর গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন সংবাদপত্র ও বার্তা সংস্থার জন্য বিদ্যমান প্রেস কাউন্সিল এবং সম্প্রচার ও অনলাইন গণমাধ্যমের জন্য পূর্বের প্রস্তাবিত সম্প্রচার কমিশনকে সমন্বয় করে ‘বাংলাদেশ গণমাধ্যম কমিশন’ গঠনের সুপারিশ করেছিল। প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, এটি হবে সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত একটি স্বাধীন গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
কিন্তু তথ্য মন্ত্রণালয় ‘জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন’ ও ‘সম্প্রচার কমিশন’ নামে আলাদা কমিশন গঠনের পরিকল্পনা করে। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান, সম্পাদক পরিষদসহ বিভিন্ন মহলের আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার এখন একক কমিশনের পথে হাঁটছে। মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, আগের খসড়া নিয়ে সমালোচনা হওয়ায় সেগুলো সংশোধন করে নতুন খসড়া করা হয়েছে।
স্বাধীন কমিশন
সম্প্রচার মাধ্যমের জন্য প্রথম খসড়ার নাম ছিল ‘সম্প্রচার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৬’। বলা হয়েছিল, সম্প্রচার কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদমর্যাদা, পারিশ্রমিক-ভাতা সরকার নির্ধারণ করবে।
সংশোধিত খসড়া অনুযায়ী অধ্যাদেশের নাম ‘সম্প্রচার অধ্যাদেশ, ২০২৬’। এতে আলাদা কমিশনের কথা নেই। বরং অনেক ক্ষমতা ও দায়িত্ব জাতীয় গণমাধ্যম কমিশনের অধীন ন্যস্ত করা হয়েছে। সম্প্রচারকারী হিসেবে লাইসেন্স প্রদানের বিষয়ে সরকারকে সুপারিশ করার কাজও করবে এ কমিশন।
জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশের চূড়ান্ত খসড়ায় বলা হয়েছে, অধ্যাদেশ কার্যকর হলে ‘জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন’ নামে একটি কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হবে। এটি হবে সংবিধিবদ্ধ ‘স্বাধীন সংস্থা’। বিতর্কিত প্রথম খসড়ায় ‘স্বাধীন’ শব্দটি ছিল না। কমিশনের প্রধান কার্যালয় থাকবে। প্রয়োজনে সরকারের অনুমোদন নিয়ে দেশের যেকোনো স্থানে শাখা কার্যালয় করা যাবে।
এমন সময়ে খসড়া চূড়ান্ত করা হলো, যখন এ সরকারের পক্ষে তা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। এতে অধ্যাদেশও হলো না, কমিশনও হলো না
একজন চেয়ারম্যান ও আটজন সদস্য নিয়ে কমিশন হবে ৯ সদস্যের। চেয়ারম্যান ও একজন নারীসহ তিনজন সদস্য হবেন সার্বক্ষণিক ও বৈতনিক। বাকি সদস্যরা অবৈতনিক। পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ সম্পন্ন হবে। কমিশনের চেয়ারম্যান সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারকের সমমানের বেতন-ভাতা ও সুবিধা পাবেন। সার্বক্ষণিক সদস্যরা পাবেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকের সমমানের সুবিধা। অবৈতনিক সদস্যরা কমিশন নির্ধারিত সম্মানী ও ভাতা পাবেন।
প্রস্তাবিত কমিশনকে আর্থিক স্বাধীনতাও দেওয়া হয়েছে। খসড়ায় বলা হয়েছে, সরকার প্রতি অর্থবছরে কমিশনের ব্যয়ের জন্য নির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ করবে। অনুমোদিত ও নির্ধারিত খাতে করা অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক হবে না। অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে কমিশনই চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ হবে।
কমিশনের ক্ষমতা-কাজ
খসড়া অনুযায়ী, সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ সমুন্নত রাখতে সাংবাদিকতা ও সাংবাদিকদের সুরক্ষা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা কমিশনের অন্যতম দায়িত্ব। স্বনিয়ন্ত্রণ বিষয়ে প্রয়োজনীয় মানদণ্ড প্রণয়ন ও তা প্রতিপালন নিশ্চিত করার কাজও করবে কমিশন।
সম্প্রচার অধ্যাদেশে প্রদত্ত ক্ষমতাও প্রয়োগ করবে জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন। এ কমিশন সম্প্রচারকারী হিসেবে লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়ে সরকারকে সুপারিশ করবে। সম্প্রচার কার্যক্রম ও বিষয়বস্তুকে বস্তুনিষ্ঠ, স্বচ্ছ ও জনমুখী করতে আচরণবিধি, প্রবিধান, মানসম্মত পরিচালনসংক্রান্ত এসওপি প্রণয়ন করবে কমিশন। বিজ্ঞাপন ও অন্যান্য অনুষ্ঠানের ওপর আদায়যোগ্য ফি ও সেবা শুল্ক নির্ধারণও করবে কমিশন। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারনির্ধারিত সীমা অতিক্রম করা যাবে না এবং সরকারের অনুমোদন লাগবে।
এখন আশা নতুন সরকারের কাছে
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান ছিলেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কামাল আহমেদ। সংশোধিত খসড়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবের অনেকটাই শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করা হয়েছে। আলাদা সম্প্রচার কমিশন গঠনের উদ্যোগ পরিত্যাগ করায় তিনি স্বাগত জানান। তাঁর ভাষ্য, গণমাধ্যম কমিশনকে পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে তাঁরা যে কাঠামোতে দেখতে চেয়েছিলেন, অনেকটা সে রকমভাবেই খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে।
তবে কামাল আহমেদ প্রশ্ন তোলেন, এমন সময়ে খসড়া চূড়ান্ত করা হলো, যখন এ সরকারের পক্ষে তা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। এতে অধ্যাদেশও হলো না, কমিশনও হলো না। সময়মতো পদক্ষেপ না নেওয়ায় গণমাধ্যমের ভোগান্তি চলতেই থাকবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। তবে নতুন সরকার গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে বলে আশা করেন তিনি।