আইইডিসিআরের পরিচালককে মারধর
ড্যাব নেতা জাহিদের নাম উল্লেখ করে মামলা, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান জনস্বাস্থ্য–বিশেষজ্ঞরা
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালককে মারধরের ঘটনায় বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ড্যাবের নেতা জাহিদ হাসানের নাম উল্লেখ করে বনানী থানায় মামলা করা হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, এ ঘটনায় কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। জনস্বাস্থ্য–বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা বন্ধ হবে না।
এ হামলার সুষ্ঠু তদন্ত এবং হামলাকারীদের বিচারের দাবিতে আজ বৃহস্পতিবার সকালে মানববন্ধন করেছেন আইইডিসিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। রাজধানীর মহাখালীর পুরোনো স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সামনে এই মানববন্ধন হয়।
মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক কাজী আহমেদ জাকী সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনায় জাহিদ হাসান, বাসেদসহ অজ্ঞাতনামা ১৫ থেকে ২০ জনকে আসামি করে বনানী থানায় মামলা করা হয়েছে। বনানী থানা জানিয়েছে, আইইডিসিআরের পরিচালক নিজেই এ মামলা করেছেন।
জাহিদ হাসান ড্যাবের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-আইনবিষয়ক সম্পাদক। ড্যাব বুধবারই তাঁর প্রাথমিক সদস্য পদ স্থগিত করে চিঠি দিয়েছে। কেন তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়েছে সংগঠনটি। এই চিঠির উত্তর দিতে ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়েছে ড্যাব। অন্যদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি করেছে। কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন আজ ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, এ ঘটনায় কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। অপর এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেন, সরকারি অফিসে বহিরাগতরা ঢুকে আক্রমণ করেছেন, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। ওই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক একজন চিকিৎসক। চিকিৎসকের ওপর এ হামলা মেনে নেওয়া যায় না।
‘অতীতে স্বাচিপ বা এখন ড্যাবের অনেক সদস্য নিজেদের ক্ষমতা দেখাতে চান। ফ্যাসিস্ট সরকার বিদায় নিয়েছে, কিন্তু মঙ্গলের কিছু তো দেখা যাচ্ছে না। সরকারি প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ব্যক্তিকে মারধরের ঘটনায় বিচার না হলে স্বাস্থ্য খাতে বা অন্য মন্ত্রণালয়ে ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। আমরা আরও নিচের দিকে নামতে থাকব।’
গতকাল বুধবার আইইডিসিআরের পরিচালকের কার্যালয়ে ঢুকে ৮-৯ জন বহিরাগত প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক কাজী আহমেদ জাকীকে হেনস্তা ও মারধর করেন। প্রথম আলোর কাছে আসা সিসি ক্যামেরার ফুটেজে এ ঘটনা স্পষ্ট দেখা যায়। ঘটনার কিছু পর পরিচালক প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ড্যাবের লোকেরা মব সৃষ্টি করে এ ঘটনা ঘটিয়েছে।
আজ আইইডিসিআরের পরিচালক প্রথম আলোকে বলেন, হামলাকারীদের মধ্যে জাহিদ হাসান ও বাসেদ নামের দুজন ছাড়া অন্য কেউ তাঁর পরিচিত নন। এই দুজন চিকিৎসক।
ঘটনার সময় পরিচালকের কক্ষে একটি সভা চলছিল। তাতে অন্যদের সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
ড্যাব ও চিকিৎসকদের সূত্রে জানা গেছে, জাহিদ হাসান একসময় আইইডিসিআরের একটি প্রকল্পে কাজ করতেন। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনি নতুন প্রকল্পে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ নিয়ে পরিচালকের সঙ্গে কিছু টানাপোড়েন চলছিল। বিষয়টি ড্যাবের উচ্চ পর্যায়ের নেতারা জানতেন। তবে দিনেদুপুরে সরকারি কার্যালয়ে ঢুকে তিনি সভা চলাকালে দেশি-বিদেশি মানুষের সামনে এক চিকিৎসক অন্য এক চিকিৎসককে লাঞ্ছিত করবেন, মারধার করবেন—এটা কেউই সহজভাবে নিচ্ছেন না।
আইইডিসিআরের সাবেক তিন কর্মকর্তার সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়েছে। ঘটনার জন্য তাঁরা প্রত্যেকেই দুঃখিত, মর্মাহত। জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ এ প্রতিষ্ঠানে সাত বছর চাকরি করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘অতীতে স্বাচিপ বা এখন ড্যাবের অনেক সদস্য নিজেদের ক্ষমতা দেখাতে চান। ফ্যাসিস্ট সরকার বিদায় নিয়েছে, কিন্তু মঙ্গলের কিছু তো দেখা যাচ্ছে না। সরকারি প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ব্যক্তিকে মারধরের ঘটনায় বিচার না হলে স্বাস্থ্য খাতে বা অন্য মন্ত্রণালয়ে ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। আমরা আরও নিচের দিকে নামতে থাকব।’