প্রকল্প অনুমোদনের আগে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) পাঠাতে হবে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। তিনি বলেন, সব সংস্থা ও কোম্পানিকে চিঠি দিয়ে এটা জানানো হয়েছে। আগের কমিশন এটা করেনি। ক্যাপাসিটি চার্জের (বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া) জন্যই ভর্তুকি বেড়েছে, জাতির ক্ষতি হয়েছে। অথচ কোনো বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) বিইআরসি দেখে দেয়নি।
প্রকল্পের খরচ ভোক্তার কাছ থেকে নেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানালে এসব কথা বলেন বিইআরসি চেয়ারম্যান। তাঁর কাছে প্রকল্পের বিষয়ে জানতে চান ভোক্তারা। তাঁরা অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সংস্থা হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেয়, এরপর সেই খরচ সমন্বয় করতে বিইআরসির কাছে আসে: অথচ প্রকল্পের বিষয়ে কিছুই জানে না কমিশন।
ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে আয়োজিত গণশুনানিতে এসব আলোচনা উঠে এসেছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে এ শুনানির আয়োজন করে বিইআরসি। চেয়ারম্যান বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে যেকোনো প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর আগে বিইআরসিতে পাঠাতে হবে। এটা নিশ্চিত করা হবে।
সরকারি-বেসরকারি সব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে চুক্তি অনুসারে নির্ধারিত দামে বিদ্যুৎ কিনে নেয় পিডিবি। এরপর তারা উৎপাদন খরচের চেয়ে কিছুটা কমে সরকার নির্ধারিত পাইকারি দামে ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার কাছে বিক্রি করে। ঘাটতি মেটাতে পিডিবি সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি নেয়। তবে বিতরণ সংস্থাগুলো কোনো ভর্তুকি পায় না। তারা খুচরা দামে ভোক্তার কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করে কোম্পানি চালায়।
সকালে ছয়টি বিতরণ সংস্থা একের পর এক তাদের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব উপস্থাপন করে শুনানিতে। এতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) গড়ে ৩ দশমিক ২৪ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। দেশের গ্রামীণ অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে থাকা পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) আওতাধীন ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি গড়ে ৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে। ঢাকার একাংশে বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা ডিপিডিসি গড়ে ৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির আবেদন করেছে। গড়ে ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব পেশ করেছে ঢাকার আরেক অংশের বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থা ডেসকো। দেশের পশ্চিমাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে থাকা ওজোপাডিকো সাড়ে ৯ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। উত্তরাঞ্চলের বিদ্যুৎ বিতরণকারী কোম্পানি নেসকো সাড়ে ১৮ শতাংশ দাম বাড়ানোর কথা বলেছে।
ছয়টি বিতরণ সংস্থা বিদ্যমান পাইকারি দাম ধরে ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। একই সঙ্গে তারা বলেছে, পাইকারি দাম ও সঞ্চালন চার্জ বাড়লে আনুপাতিক হারে তাদেরও দাম বাড়াতে হবে। আগের দিন বুধবার পিডিবির প্রস্তাবিত পাইকারি দাম ও পিজিবি পিএলসির সঞ্চালন চার্জ বাড়ানোর আবেদন মূল্যায়ন করে বাড়ানোর সুপারিশ করেছে বিইআরসি গঠিত কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি। যদিও দুই দিনেই দাম বাড়ানোর তীব্র বিরোধিতা করেছেন ভোক্তা প্রতিনিধিরা।
দাম বাড়ানোর পক্ষে কারিগরি কমিটি
খুচরা দামের প্রস্তাব নিয়ে কারিগরি কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রি করে পিডিবির ঘাটতি হতে পারে ৭৫ পয়সা। আরইবির ঘাটতি ১ টাকা ৩৯ পয়সা, ডিপিডিসির ঘাটতি ১ টাকা ১৮ পয়সা, ডেসকোর ১ টাকা ১৬ পয়সা, ওজোপাডিকোর ১ টাকা ৩৩ পয়সা, নেসকোর ঘাটতি হবে ১ টাকা ৪৩ পয়সা। এ ঘাটতি মেটাতে হলে গড়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম প্রায় ১৪ শতাংশ বাড়াতে হবে। এতে প্রতি ইউনিটে বাড়বে ১ টাকা ২৫ পয়সা।
আবাসিক গ্রাহকদের ধাপ (স্ল্যাব) পরিবর্তনের প্রস্তাব নিয়ে কোনো সুপারিশ করেনি কারিগরি কমিটি। তারা বলেছে, ৭৫ ইউনিটের বেশি ব্যবহারকারীদের জন্য প্রথম ধাপ তুলে দিলে গ্রাহকের বিল বেড়ে যাবে। এ বিষয়টি কমিশন বিবেচনা করবে। এ ছাড়া গ্রাহকের লোড পরিবর্তনের প্রস্তাব বিবেচনায় নেওয়া যাবে না। কাঠামোগত পরিবর্তন হঠাৎ করা যায় না। গবেষণা করে গ্রাহকের ওপর প্রভাব যাচাই করতে হবে। বেসরকারি হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ বিল বাণিজ্যিক করার প্রস্তাব খারিজ করে দিয়েছে কমিটি। তারা বলেছে, সরকারি হোক বা বেসরকারি হোক, এগুলোকে হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। বাণিজ্যিক করা যাবে না। দাম বাড়ানো হলে বাড়তি বিল তারা মানুষের কাছ থেকেই আদায় করবে।
শুনানি শেষে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, সবার মতামত, প্রস্তাব, পরামর্শ বিবেচনায় নিয়েই কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে। তবে অবশ্যই ভোক্তার স্বার্থ অগ্রাধিকার পাবে।
ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের বিরোধিতা
দাম বাড়ানোর তীব্র বিরোধিতা করেছে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। লিখিত বক্তব্যে তারা দাম না বাড়ানোর দাবি জানায়। তারা বলেছে, দাম বাড়ানো হলে মাসের খরচ বাড়বে, একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের আয়ের তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়েছে, তাদের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি হবে।
নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিনা পয়সায় বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তাব করেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন (প্রিন্স)। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ সাংবিধানিক অধিকার। এটি সেবা খাত, লাভজনক বিবেচনা করার সুযোগ নেই। মানুষের পকেট কেটে টাকা নেওয়ার নতুন নতুন প্রস্তাব নিয়ে এসেছে পিডিবি। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের বোবা কান্না দেখার কেউ নেই, ধাপ বদল করে আরও টাকা নিতে চায়। এমন প্রস্তাব যারা দেয়, তাদের মধ্যে জনস্বার্থ নেই। তাই দাম বাড়ানোর প্রস্তাবটাই অনৈতিক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা বলেন, কী কী করলে বিদ্যুতের দাম কমানো যেতে পারে, এ পরিকল্পনা কেন নেই। সংকটের অজুহাত দেখিয়ে দাম বাড়ানো হয়। ক্যাপাসিটি চার্জ কমানোর কথা বলে না। ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, সরকার যেন মুনাফাখোর না হয়, সেটাই জনগণের প্রত্যাশা। কল্যাণের অর্থনীতি থেকে বিবেচনা করলেও বিদ্যুতের দাম কমানো যায়। দাম বাড়ানোর প্রস্তাব বর্জন করেছে ভোক্তা।
সাংবাদিক শুভ কিবরিয়া বলেন, দেশের প্রধানমন্ত্রী মানুষকে স্বস্তি দিতে চান, আর এখানে হচ্ছে উল্টোটা। সরকার মুনাফাভোগী হতে পারে না, ব্যবসা করতে পারে না। বিইআরসির আইন সংশোধন করতে হবে। লুটপাটের বাংলাদেশ থেকে বের হতে হবে। দাম কমানোর গণশুনানি করতে হবে।
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন সাত দফা দাবি লিখিতভাবে জমা দিয়েছে কমিশনের কাছে। এতে বলা হয়, ভারী শিল্প বিশেষ করে স্টিল মিলগুলোকে সচল রাখতে কোনো অবস্থাতেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো যাবে না। ২০২০ সাল থেকে স্টিল খাতে অচলাবস্থা চলছে। এখন দাম বাড়ালে এ শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের অলস বসে থাকার পেছনে যে বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে, তা ধাপে ধাপে পুরোপুরি প্রত্যাহার করতে হবে।