এক সপ্তাহে অপতথ্য ছড়িয়েছে বেশি ভিডিওতে ভর করে

কোলাজপ্রথম আলো গ্রাফিকস

বাংলাদেশে নারী-শিশুদের ওপর নির্যাতন এখন আলোচিত বিষয়। সংবেদনশীল বিষয়টিকে আশ্রয় করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্যও ছড়াচ্ছে বেশি। দেশের তথ্য যাচাইকারী প্ল্যাটফর্মগুলো গত এক সপ্তাহে যে শতাধিক অপতথ্য শনাক্ত করেছে, তার মধ্যে এমন ঘটনাই বেশি।

যেমন একটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে, ‘কিশোরগঞ্জে দিনে-দুপুরে তরুণীকে ধর্ষণের পরে নদীতে ফেলে দেয় দুর্বৃত্তরা। পরে কয়েকজন যুবকের সাহসিকতায় রক্ষা পায় মেয়েটি!’ যাচাইয়ে জানা যায়, গত মে মাসে খালে গোসল করতে গিয়ে ডুবে গিয়েছিল ওই কিশোরী। তখন তাঁকে উদ্ধার করেন কয়েকজন। সেখানে ধর্ষণের কোনো ঘটনা ঘটেনি।

এটিসহ মোট ১০২টি অপতথ্য শনাক্ত করে যাচাইকারী পাঁচটি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রিউমর স্ক্যানার ৬৬টি, বাংলা ফ্যাক্ট ১৫টি, ফ্যাক্ট ওয়াচ ৮টি, দ্য ডিসেন্ট ৭টি এবং ডিসমিসল্যাব ৬টি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

এই অপতথ্যের মধ্যে ৫৪টি ছড়িয়েছে কিশোরগঞ্জের ঘটনাটির মতো ভিডিওকে ভিত্তি করে। এর সঙ্গে রাজনীতির যোগসূত্রও রয়েছে। নির্যাতনের ঘটনাগুলোতে একটি রাজনৈতিক পক্ষকে নির্যাতনকারী এবং আরেকটি পক্ষকে নির্যাতিত হিসেবে দেখানোর প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়।

যেমন একটি ভিডিওতে দাবি করা হয়, ‘বাবাকে না পেয়ে আওয়ামী লীগ নেতার শিশু ছেলেকে পানিতে ছুড়ে ফেলে হত্যার দৃশ্য!’ যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওটি ৪ জুন কুমিল্লার শাসনগাছা এলাকায় লিচুগাছের ডাল ভাঙার অভিযোগে এক শিশুকে নির্যাতনের ঘটনার।

‘বাক্প্রতিবন্ধী যুবককে উল্টো করে নির্মম নির্যাতন করছেন বিএনপির একদল নেতা–কর্মী’ দাবিতে একটি ভিডিও প্রচার করা হয়েছে; অথচ যাচাইয়ে দেখা যায়, এর সঙ্গে বিএনপির কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। এটি মাদক বিক্রির অভিযোগ তুলে এক ব্যক্তিকে নির্যাতনের।

আরেকটি ভিডিওতে দাবি করা হয়, বাবা মুন্সিগঞ্জের আওয়ামী লীগের ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। তাই মেয়েকে তুলে নিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা করেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা–কর্মীরা। যাচাইয়ে জানা যায়, ভিডিওটি বাংলাদেশেরই নয়। এটি ৩ জুন ভারতের কোচবিহারের দিনহাটায় পাটখেত থেকে এক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধারের দৃশ্য।

এটির মতো বিদেশের ঘটনাকে বাংলাদেশের বলে প্রচারের আরও নজিরও রয়েছে। যশোরে চাঁদা না দেওয়ায় প্রবাসীর শিশুকে নির্যাতন করছেন বিএনপির সমর্থকেরা, এমন দাবিতে যে ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে, তা আসলে ফিলিপাইনের।

গত সপ্তাহে সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে একাধিক সাজানো ভিডিও ছড়িয়েছে বিভ্রান্তি। ‘ডিভোর্সের পর কেউ নিলেন না দায়িত্ব, ফুটফুটে সন্তানকে এতিমখানায় ফেলে গেলেন জন্মদাতা বাবা–মা’ এ রকম ক্যাপশনে একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়ায়। অথচ এটি ছিল তৈরি করা কনটেন্ট। এ ছাড়া লিফটের সামনে তরুণ–তরুণীর মারামারির ভাইরাল ভিডিওটিও সাজানো।

ভারত থেকে বাংলাদেশে পুশ ইন করা নিয়ে দেশের বিভিন্ন সীমান্তে উত্তেজনা চলছে। তা নিয়েও ছড়াচ্ছে অপতথ্য। যেমন ‘মাইন পাতার জন্য বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী বিএসএফের এক গুপ্তচরকে আটক করেছে বিজিবি’—এমন শিরোনামে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও যাচাই করে দেখা যায়, এ ঘটনা সীমান্তেরও নয়, এখানকারও নয়। এটি গত সংসদ নির্বাচনের দিন মুন্সিগঞ্জে সেনাসদস্যদের হাতে এক বাংলাদেশি আটকের ঘটনার।

পুরোনো ভিডিও–ছবি নতুন করে সামনে এনে বর্তমান কোনো ঘটনার সঙ্গে জুড়ে দিয়ে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর এমন প্রবণতা আরও দেখা গেছে। যেমন ভারত সীমান্তে বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক ট্যাংক মোতায়েন করেছে দাবিতে সামরিক বাহিনীর কুচকাওয়াজের পুরোনো ছবি প্রচার করা হয়েছে এক্স প্ল্যাটফর্মে।

এক ঘটনার দাবি করে অন্য ঘটনার ভিডিও প্রচারের উদাহরণ ফিলিপাইনের সাম্প্রতিক ভূমিকম্প। ৮ জুন দেশটির মিন্দানাও উপকূলে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন প্রোফাইলে এ সময় দুটি ভিডিও প্রচার করা হয়। একটি বহুতল ভবন ধসে পড়ার, আরেকটি সুইমিংপুলের পানি উপচে পড়ার। যাচাই করে দেখা যায়, এই দুটি ঘটনাই ভিন্ন দেশের ভিন্ন সময়ের। ভবনধসের দৃশ্যটি ২০২৪ সালের তাইওয়ানে ভূমিকম্পের এবং সুইমিংপুলের দৃশ্যটি ২০২৫ সালের তুরস্কে ভূমিকম্পের।

ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি যেমন আলোচনায় রয়েছে, তেমনি তা নিয়ে অপতথ্য ছড়াচ্ছে। ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরামের ব্যানারে কর্মসূচির ছবি দাবি করে একটি ছবি ছড়ানো হয়েছে, সেখানে এক ব্যক্তিকে দেখা যায়, ‘গ্রাহকদের স্বার্থে নয় জামাতের স্বার্থে আমরা আন্দোলন করছি’ লেখা একটি প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে। যাচাইয়ে দেখা যায়, ওই ব্যক্তির হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডের ছবিকে সম্পাদনা করে ভিন্ন বক্তব্য জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নামে ভুয়া উক্তি ছড়ানোর প্রবণতা আগের মতোই ছড়িয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনকে উদ্ধৃত করে বিএনপি সরকারের সমালোচনামূলক একটি মন্তব্য ছড়ায়। যাচাইয়ে দেখা গেছে, এমন কিছু তিনি বলেননি।

জাতীয় নাগরিক পার্টির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহকে উদ্ধৃত করেও প্রচার করা হয় যে তিনি বলেছেন, ‘সরকারি টাকাপয়সা, রাজস্ব একমাত্র জুলাই যোদ্ধা ও সমন্বয়কদের কাছে থাকলেই নিরাপদ।’ যাচাই করে দেখা যায়, এমন কথা তিনি বলেননি। এটি ছিল একটি স্যাটায়ার পেজের ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট।

সংবাদমাধ্যমের ফেসবুক ফটোকার্ডের আদলে ভুয়া ফটোকার্ড তৈরি করে মিথ্যা সংবাদ প্রচারও অব্যাহত ছিল গত সপ্তাহে। যেমন ‘ছাত্র–গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা আগামী মাসে ফিরছেন’, এই দাবিতে আরটিভির নামে একটি ফটোকার্ড ছড়ানো হয়। অথচ আরটিভি এমন কোনো ফটোকার্ড প্রকাশই করেনি।