মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরে প্রকল্প দরপত্র নিয়ে হট্টগোল

নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি নতুন প্রকল্পের দরপত্র নিয়ে কর্মকর্তা–কর্মচারীদের মধ্যে তর্কবিতর্ক ও হট্টগোল হয়েছে। আজ মঙ্গলবার দুপুরে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরে এই হট্টগোল হয়। নতুন প্রকল্পটির নাম ‘নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিকার ও প্রতিরোধে সমন্বিত সেবা জোরদারকরণ’ এবং ‘কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি)’।

‘নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রাম’ নামের পুরোনো প্রকল্পের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের কয়েকজন প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, ১০টি প্রতিষ্ঠানের দরপত্র নিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে নতুন প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক (ডিপিপি) রুবিনা গনি মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। দরপত্র বাইরে নেওয়ার কোনো নিয়ম নেই।

অপর দিকে ডিপিপি রুবিনা গনি প্রথম আলোকে বলেন, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির বৈঠকের উদ্দেশে তিনি দরপত্র নিয়ে যাচ্ছিলেন। দরপত্রের বৈঠক বাইরে হতে পারবে না, এমন কোনো নিয়ম কোথাও নেই। তাঁকে অহেতুক হেনস্তা করা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রাম প্রকল্পের মেয়াদ শেষের পর একই আদলে নতুন প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। এটা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পুরোনো প্রকল্পটির কর্মকর্তা–কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। কারণ, নতুন প্রকল্পে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নেওয়া হবে বলে তাঁদের জানানো হয়েছে। এতে করে প্রকল্পের কর্মকর্তা–কর্মচারীরা চাকরি হারানোর আশঙ্কা করছেন।

প্রকল্পটিতে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত ২৬২ জনসহ মোট জনবল ৩৮১ জন। প্রকল্পটি শুরু হয় ২০০০ সালের জুলাই থেকে। বাংলাদেশ ও ডেনমার্কের সরকারি সংস্থা ড্যানিশ ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সির (ডানিডা) যৌথ উদ্যোগে এই প্রকল্প শুরু হয়। প্রকল্পের চতুর্থ পর্ব ২০১৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত চলেছে। এর মধে৵ ২০২২ সালের জুনের পর ডানিডা প্রকল্প থেকে সরে গেলে ব্যয় কমিয়ে আনে সরকার। এ গ্রেডের ফ্ল্যাগশিপ (অতীব গুরুত্বপূর্ণ) থেকে প্রকল্পটি বি গ্রেডে নামিয়ে আনা হয়। দফায় দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে প্রকল্প চালু রাখা হয়। তবে প্রায়ই প্রকল্পে কয়েক মাসের বেতন বকেয়া পড়ে যাচ্ছে। এ বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত তাঁরা বেতন পাননি।

প্রকল্পের আওতায় ১৪টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওয়ান–স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি), জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৬৭টি ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেল (ওসিসি সেল), ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরি, ৮টি বিভাগীয় ডিএনএ স্ক্রিনিং ল্যাবরেটরি, ন্যাশনাল ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টার, ৮টি আঞ্চলিক ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টার, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ন্যাশনাল হেল্পলাইন সেন্টার ১০৯ এর কার্যক্রম রয়েছে।

ওই প্রকল্পের আদলে আরও বিস্তৃত পরিসরে কিউআরটি প্রকল্পটি নেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালা ২০২৫ অনুসারে নতুন প্রকল্পের জনবল আউটসোর্সিং ছাড়া অর্থ বিভাগ অনুমোদন দেয় না। ফলে নতুন প্রকল্পে জনবল নিয়োগ আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে হবে।

ফলে পুরোনো প্রকল্পের কর্মকর্তা–কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটিতে সরাসরি নিয়োগ পাওয়ার জন্য দেনদরবার করছেন।

প্রকল্পের এই সমস্যা নিয়ে ২৩ এপ্রিল ন্যাশনাল কেয়ার কনক্লেভ অনুষ্ঠানে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, প্রকল্পের সমস্যা নিয়ে তাঁকে কেউ অবহিত করেনি। তিনি খোঁজ করে জেনে নেওয়ার পর এটা নিয়ে কথা বলবেন।

পুরোনো প্রকল্পের কয়েকজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান, গত রোববার মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরে মন্ত্রী এসেছিলেন। তখন তাঁরা প্রকল্পের সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁরা আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে কোম্পানির পরিবর্তে বর্তমান জনবলকে নতুন প্রকল্পে সরাসরি নিয়োগ দেওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। বকেয়া বেতন–ভাতা পরিশোধ করতে বলেছেন। এ ছাড়া নতুন কিউআরটি প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রামে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ‘ইনক্লুসিভ সার্ভিসেস অ্যান্ড অপরচুনিটিজ ফর হিউম্যান ক্যাপিটাল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড লাইভলিহুড প্রজেক্ট (আইএসও)’ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগে পুরোনো প্রকল্পের কার্যালয়গুলোতে আইএসও প্রকল্পের জনবলকে জায়গা দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। এটা নিয়েও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

মন্ত্রী তাঁদের সব সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। এর মধ্যে দরপত্র নিয়ে নতুন সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ইতিমধ্যে দুইবার দরপত্র বাতিল হয়েছে। এটা ছিল তৃতীয় দফা দরপত্র। দরপত্র নিয়ে উপপ্রকল্প পরিচালক বেরিয়ে যাওয়ার সময় তাঁরা তাঁকে আটকান। তখন তিনি জানান, তিনি এসব নিয়ে সচিবালয়ে বৈঠক করতে যাচ্ছেন। এরপর তাঁরা মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) শায়লা শার্মিন জামানের কাছে যান। তিনি তাঁদের প্রকল্প পরিচালক (ডিপি) মোহাম্মদ ইফতেখার হোসেনের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।

এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ ইফতেখার হোসেনের মুঠোফোনে কল করলে তিনি ধরেননি। পরে তাঁকে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে মন্তব্য চাওয়া হয়। তিনি বার্তা ‘সিন’ (দেখা) করলেও কোনো মন্তব্য করেননি।