জন্মদিনে কিবরিয়ার অদেখা কাজের প্রদর্শনী
দেশের আধুনিক চিত্রকলার অন্যতম পথিকৃৎ শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়ার একক শিল্পকর্মের বিশেষ প্রদর্শনী শুরু হলো বৃহস্পতিবার বছরের প্রথম দিনে। রাজধানীর লালমাটিয়ার ডি ব্লকের ৯/৪ বাড়ির কলাকেন্দ্রে এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে শিল্পীর ৯৭তম জন্মদিন উপলক্ষে। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জিকা অনুসারে পয়লা জানুয়ারি ১৯২৯ সালে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমে।
জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত এই প্রদর্শনীর কাজগুলো খুবই দুর্লভ। আগে এই শিল্পকর্মগুলো কোথাও প্রদর্শিত হয়নি। সে কারণেই খানিকটা লম্বা করেই নাম রাখা হয়েছে ‘মোহাম্মদ কিবরিয়া: স্বনির্বাচিত ৮৪টি অপ্রদর্শিত মৌলিক শিল্পকর্ম’ প্রদর্শনী। এই কাজগুলো শিল্পী করেছিলেন ১৯৮০ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে।
কলাকেন্দ্র শিল্পীদের উদ্যোগে পরিচালিত শিল্পকেন্দ্র। পরিচালক শিল্পী ওয়াকিলুর রহমান প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সূচনায় জানালেন, এই শিল্পকর্মগুলো শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়ার পরিবারের কাছে সংরক্ষিত ছিল। শিল্পী নিজেই এই ৮৪টি শিল্পকর্ম বাছাই করে একটি ফোল্ডার করে রেখেছিলেন। হয়তো কোনো প্রদর্শনী বা ফোলিও প্রকাশের পরিকল্পনা তাঁর ছিল। পরে আর করা হয়ে ওঠেনি। ফোল্ডারটির ভেতরে আরও কিছু কাগজপত্র ছিল। শিল্পীর ৯৭তম জন্মদিনে পরিবারের সহায়তায় কলাকেন্দ্র সেই ছবিগুলো নিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন করল তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে। প্রদর্শনী চলবে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকেল চারটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত প্রদর্শনী খোলা থাকবে। এই কাজগুলো নিয়ে প্রদর্শনীর মাঝামাঝি নাগাদ একটি বই প্রকাশ করা হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আলোচক ছিলেন শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়ার তিন ছাত্র ও খ্যাতনামা শিল্পী ইমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুন নবী, শিল্পী মনিরুল ইসলাম ও অধ্যাপক শিল্পী আবুল বার্ক্ আলভী। আলোচকেরা তাঁদের কিংবদন্তিতুল্য গুণী শিক্ষকের স্মৃতিচারণা করেন ও প্রদর্শনীর কাজগুলোর বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোকপাত করেন।
রফিকুন নবী বলেন, মোহাম্মদ কিবরিয়া সব সময় কাজের মধ্যে থাকতেন। প্রথম দিকে তাঁর কাজের বৈশিষ্ট্য ছিল অবয়বধর্মী। ভাঙা ভাঙা অবয়ব নির্মাণ করতেন। পরে জাপান থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে আসার পর তাঁর কাজের ধরন সম্পূর্ণ বদলে যায়। প্রকাশবাদী বিমূর্ত ধারায় তিনি কাজ করেছেন। বাংলাদেশের চিত্রকলায় এই ধারাটিকে তিনি মহত্ত্ব দিয়ে গেছেন। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষাদানের সময় ছাত্রদের তিনি বলতেন, চিত্রকলা কেবল চোখে দেখার জিনিস নয়। একে হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হবে, প্রয়োজনে হাত দিয়ে ছুঁয়ে স্পর্শের অনুভূতি নিতে হবে।
রফিকুন নবী বলেন, মোহাম্মদ কিবরিয়ার ছবি দর্শকদের মধ্যে এক গভীর মুগ্ধতা সৃষ্টি করে। তিনি নিজেও প্রথম থেকেই মোহাম্মদ কিবরিয়ার ছবির মুগ্ধ দর্শক। এই প্রদর্শনীর কাজগুলো দেখে সেই মুগ্ধতা আরও বাড়ল।
মনিরুল ইসলামও তাঁর শিক্ষকের স্মৃতিচারণা করেছেন। প্রদর্শনীর ছবিগুলো সম্পর্কে তিনি বলেন, এই কাজগুলো আকারে ছোট। তবে তাঁর মধ্যেই বিশালতা ও গভীরতা রয়েছে। কাজগুলোতে খুব সাধারণ উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু ছবিগুলো অত্যন্ত শক্তিমান। এই কাজগুলোকেই পরিবর্ধিত করে বড় আকারে সৃজন করা যায়। তাঁর অন্য কাজগুলোর মতো এই কাজগুলোতেও একধরনের সম্মোহনী শক্তি আছে। অনেকক্ষণ ধরে এই ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকা যায়। শিল্পকর্ম করার সময় তিনি অনেকটা গভীর আত্মমগ্ন অবস্থায় চলে যেতেন। ধ্যানের মতো। সে কারণে তাঁর কাছে মোহাম্মদ কিবরিয়াকে ‘সাধুসন্তের মতো’ নিষ্পাপ বলে মনে হয়।
আবুল বার্ক্ আলভী বলেন, তিনি খুবই মৃদুভাষী ছিলেন। সূক্ষ্ম রসবোধ ছিল। গভীর একাগ্রতা নিয়ে তিনি কাজ করতেন। তাঁর এতগুলো অদেখা কাজ দেখার সুযোগ পাওয়া খুবই বিরল। এই প্রদর্শনীতে দর্শকেরা সেই সুযোগ পাবেন।
প্রদর্শনীর এই শিল্পকর্মগুলোর আলাদা করে কোনো শিরোনাম নেই। বিমূর্ত রীতির কম্পোজিশন। অধিকাংশ কাজই করেছেন কোলাজে। পটভূমি হিসেবে কালো, ধূসর, বাদামি রঙের কাগজের ওপর বৈচিত্র্যময় নকশা ও টেক্সচারের কাগজ সাঁটিয়ে, কোথাও কোথাও তার ওপর কিছু রঙের ছোপ, কিছু রেখার আঁকিবুঁকি করে কোলাজগুলো করা। এ ছাড়া আছে বেশ কয়েকটি জল রং, কয়েকটি এচিং, তেল রং, প্যাস্টেল ও মিশ্র মাধ্যমের কাজ। এ ছাড়া যে ফোল্ডারটি তিনি তৈরি করেছিলেন, সেটি কিছু চিঠিপত্র, শিল্পী কামরুল হাসানের উপহার দেওয়া একটি রেখাচিত্রও তিনি রেখেছিলেন এই ফোল্ডারে, সেই রেখাচিত্রটি ২০০৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে যে চিঠি দিয়েছিল, সেই চিঠিও আলাদা করে রাখা আছে প্রদর্শনীতে।
শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া ১৯৫০ সালে কলকাতা আর্ট কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে ঢাকায় আসেন। পরের বছর তিনি নবাবপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে চারুকলার শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের গড়া ঢাকা আর্ট কলেজে যোগ দেন ১৯৫৪ সালে। জাপান সরকারের বৃত্তি নিয়ে ১৯৫৯ থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। অধ্যাপক হিসেবে ১৯৮৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ২০০৮ সালে ইমেরিটাস অধ্যাপক হন। তিনি স্বাধীনতা পদক ও একুশে পদকসহ দেশ-বিদেশের বহু পদক ও সম্মাননা পেয়েছেন। ২০১১ সালের ৭ জুন পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে গেলেও তাঁর গুণমুগ্ধরা শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণে রেখেছেন তাঁকে।