‘মাঝেমইধ্যে মুরগির মাংস কিনি, তাও আধা কেজি’

জোবেদা বেগম (বাঁয়ে), রশিদা বেগম (মাঝে), সুমী বেগম (ডানে)ছবি: কোলাজ

কড়াইল বস্তির বউবাজারে স্বামী ও ছেলেকে নিয়ে থাকেন গৃহকর্মী সুমী বেগম। বস্তির এক কক্ষের যে ঘরে তাঁরা তিনজন থাকেন, তার ভাড়া মাসে ৪ হাজার ৫০০ টাকা।

চল্লিশ পেরোনো সুমী বেগম মহাখালীর টিঅ্যান্ডটি কলোনির একটি ফ্ল্যাটে ধোয়ামোছা ও রান্নার কাজ করেন। মাসে পান আট হাজার টাকা। তাঁর স্বামী জোবায়েদ আলী প্যাডেল চালিত রিকশা চালান। এক বেলা রাস্তায় থেকে যা আয় হয়, তা থেকে ২০০ টাকা রিকশার মালিককে দিতে হয়। তাঁর হাতে থাকে ৪০০–৫০০ টাকা। স্বামী–স্ত্রী দুজনের আয় দিয়ে তিন সদস্যের এই পরিবারের মাসের খরচ জোগাতে কষ্ট হয়।

সুমী–জোবায়েদ দম্পতির একমাত্র ছেলে সুমন দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। তবে এসএসসি পাস করতে পারেননি। এখন নির্মাণশ্রমিকের কাজ করেন। তবে তিন মাস ধরে সেভাবে কাজ নেই। আগে নিজের খরচ নিজেই মেটাতেন। মাঝেমধ্যে মা–বাবাকেও কিছু সাহায্য করতেন। এখন নিজের হাতখরচের টাকাও তাঁদের কাছ থেকে নিতে হয়।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে কড়াইল বস্তির বউবাজারের কথা হয় সুমী বেগমের সঙ্গে। কথায় কথায় বললেন, ‘আগে ছেলের যখন কিছু কামাই–রোজগার ছিল, তখন মাসে একবার হইলেও গরুর মাংস খাওয়া হইছে। এখন গরুর মাংস আর কিনি না। এত টেকা দিয়া কেমনে আনমু? দুই-তিন মাস ধরে একবারে বাদই দিসি।’

‘প্রতিদিন হিসাব করে চলতে হয়’ জানিয়ে সুমী বেগম বলেন, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে খাবারের তালিকা থেকে আরও অনেক কিছুই বাদ দিয়েছেন। বাজারে কোনো কিছুর দাম একবার বাড়লে আর কমে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গরিব মাইনষের কষ্ট বাইড়া গেছে। মাঝেমইধ্যে মুরগির মাংস কিনি। তাও আধা কেজি। আগে তো আস্ত একটা মুরগি আইনা খাইসি। তাও কক মুরগি আনসি। এহন কক মুরগির দামও বেশি বাইড়া গেছে।’

রাজধানীর খুচরা বাজারে বেশ কিছুদিন ধরেই সবজি, মুরগি ও ডিমের দামে বাড়তি। এর প্রভাব পড়েছে সুমী বেগমের মতো সীমিত আয়ের মানুষের ওপর।

আগে ছেলের যখন কিছু কামাই–রোজগার ছিল, তখন মাসে একবার হইলেও গরুর মাংস খাওয়া হইছে। এখন গরুর মাংস আর কিনি না। এত টেকা দিয়া কেমনে আনমু? দুই-তিন মাস ধরে একবারে বাদই দিসি
সুমী বেগম

কম খরচে দিন পার করা

কড়াইল বস্তির আরেক বাসিন্দা রশিদা বেগম। তিনি গুলশানের একটি ফ্ল্যাটে গৃহকর্মীর কাজ করেন। তাঁর বেতন মাসে ১০ হাজার টাকা। রশিদার স্বামী সোহেল মিয়া কাঠমিস্ত্রি। যেদিন কাজ থাকে, সেদিন তাঁর আয় হয়। কাজ না থাকলেও আয়ও নেই। কাজ পেলে দিনে মজুরি নেন ৮০০ টাকা। তবে মাসের প্রায় অর্ধেক দিন কাজ থাকে না। স্বামীর অনিয়মিত আয় আর নিজের সামান্য আয়ে পাঁচ সদস্যের পরিবার কোনোরকমে চলছে বলে জানান রশিদা বেগম।

সোহেল–রশিদা দম্পতির তিন সন্তান। বড় ছেলে রকিবুল রাজধানীর একটি কলেজে পড়ে, তবে কোন কলেজ, সেটি মনে করতে পারেননি তিনি। দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে সুমাইয়া অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। আর ছোট মেয়ে সাদিয়ার বয়স পাঁচ বছর।

রশিদা বেগম জানান, আগে চার হাজার টাকা ঘরভাড়ার সঙ্গে গ্যাসের খরচ ধরা ছিল। এখন আলাদা করে রান্নার জন্য লাকড়ি কিনতে হচ্ছে।

শেরপুরের নালিতাবাড়ী থেকে জীবিকার তাগিদে রশিদা বেগম ঢাকায় আসেন। শুরু থেকেই মানুষের বাসা–বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করতেন। গতকাল বিকেলে কথা হয় তাঁর ঘরের সামনে। কথায় কথায় বললেন, বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন আলু আর ছোট মাছই ভরসা। মাংস তেমন খাওয়া হয় না।

শুধু খাবার নয়, সংসারের আরও অনেক প্রয়োজনীয় জিনিসও বাদ দিতে হয়েছে, জানিয়ে রশিদা বেগম বলেন, চিন্তা একটাই, কীভাবে কম খরচে দিন পার করা যায়।

রশিদা বেগম জানান, আগে চার হাজার টাকা ঘরভাড়ার সঙ্গে গ্যাসের খরচ ধরা ছিল। এখন আলাদা করে রান্নার জন্য লাকড়ি কিনতে হচ্ছে। লাকড়ি কেনার পেছনে মাসে ১০০০-১২০০ টাকা খরচ হচ্ছে। বস্তিতে গ্যাসের সংযোগ অবৈধ বলে ছয়–সাত মাস আগে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এর পর থেকে খরচ ও কষ্ট দুটোই বেড়েছে।

‘তারে তো খাওয়াইতে হয়’

রাজধানীর টিঅ্যান্ডটি কলোনির একটি বাসায় বাচ্চাকে স্কুলে আনা-নেওয়া এবং সপ্তাহে দুই দিন ঘর পরিষ্কার করার কাজ করেন জোবেদা বেগম। এ কাজ থেকে তাঁর আয় মাসে পাঁচ হাজার টাকা। এর মধ্যেই ৩ হাজার ৫০০ টাকা চলে যায় বস্তির ঘরভাড়ায়; হাতে থাকে মাত্র ১ হাজার ৫০০ টাকা।

কড়াইল বস্তির আরেক বাসিন্দা জোবেদা বেগমের জীবন ভীষণ কঠিন করে তুলেছে স্বামীর অসুস্থতা। তাঁর স্বামী মিজানুর মিয়া আগে ফেরি করে চানাচুর বিক্রি করতেন। হঠাৎ গলায় টনসিলের সমস্যা ধরা পড়ে। অস্ত্রোপচারের পর গত তিন মাস তিনি একপ্রকার ‘ঘরবসা’।

স্বামীর চিকিৎসা ও সংসারের খরচ সামলাতে প্রায় এক লাখ টাকা ঋণ করতে হয়েছে জোবেদাকে। এর মধ্যে ৮০ হাজার টাকা গ্রামের একটি সমিতি থেকে নিয়েছেন। বাকি ২০ হাজার টাকা বস্তির একজনের কাছ থেকে চড়া সুদে নিয়েছেন।

শ্বশুরবাড়ি থেকে কিছু দেয়, কিছু আনি বাপের বাড়ি থেকে। অন্যের ওপর ভরসা কইরা সংসার চালাইতে হচ্ছে। মাঝেমধ্যে ডিম কিনি, কম দামে মাছ পাইলে আনি। ঘরে ছোট মেয়ে আছে, তারে তো খাওয়াইতে হয়।
জোবেদা বেগম

মিজানুর–জোবেদা দম্পতির একমাত্র মেয়ে মেঘলা আক্তার বস্তির একটি স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে।

জোবেদা বলেন, ‘শ্বশুরবাড়ি থেকে কিছু দেয়, কিছু আনি বাপের বাড়ি থেকে। অন্যের ওপর ভরসা কইরা সংসার চালাইতে হচ্ছে। মাঝেমধ্যে ডিম কিনি, কম দামে মাছ পাইলে আনি। ঘরে ছোট মেয়ে আছে, তারে তো খাওয়াইতে হয়।’

স্বামী নতুন কোনো কাজে যুক্ত হলে পরিস্থিতি কিছুটা বদলাবে, এই আশা জোবেদা বেগমের। কড়াইল বস্তির যেসব নারী ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পেয়েছেন, তিনি তাঁদের একজন।

সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা করে উপকারভোগী পরিবারগুলো ভাতা পাবে। গত ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কড়াইল বস্তিসংলগ্ন টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে এ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। তখন সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, পরীক্ষামূলকভাবে জুন মাসের মধ্যে ৩৭ হাজার ৫৬৭টি পরিবারকে এই ভাতার আওতায় আনা হবে।

১০ মার্চ ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির উদ্বোধনের দিন মুঠোফোনে আড়াই হাজার টাকা ভাতা পান জোবেদা বেগমও। তবে চলতি এপ্রিল মাসে এখনো ভাতার টাকা পাননি তিনি।

জোবেদা বেগম বলেন, তাঁর সংসারের যে অবস্থা, তাতে ভাতার টাকা প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট তারিখে পেলে অনেক বড় উপকার হবে।