বাবুবাজার থেকে ডেমরা, ডেমরা থেকে বাবুবাজার। এ পথেই ঘুরপাক খায় মারুফের জীবন। একটি মিনিবাস চালকের সহযোগী সে। বয়স ১২ বছর। অল্প বয়সেই সংসারের হাল ধরতে জীবনযুদ্ধে নেমে পড়তে হয়েছে তাকে।
গত সোমবার দুপুরে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী মোড়ে দেখা হয় মারুফের সঙ্গে। তখন সে বাবুবাজারগামী যাত্রী ডাকছিল। পরিচয় দিয়ে কথা বলতে চাইলে প্রথমে লাজুক হেসে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিল। পরে একটু স্বাভাবিক হলে জানায়, তিন মাস ধরে এ কাজ করছে। ভোর ছয়টায় কাজ শুরু হয়, শেষ হতে হতে কখনো রাত দশটা, কখনো এগারোটা।
কাজ শেষে কোথায় যায়, জিজ্ঞাসা করতেই ছোট্ট করে উত্তর, ‘বাড়ি নাইক্কা, গাড়িতেই থাকি।’
মারুফের বাবা নেই। মা আগে ঢাকাতেই পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন। এখন তিনি বরিশালে গ্রামে তাঁর মায়ের সঙ্গে থাকেন। কাজ করতে পারেন না। ফলে সংসার চালাতে মারুফকেই কাজ করতে হয়। মারুফ বলে, ‘গ্রামে মায়ে আর নানি থাকে। তিন শ, চার শ যা আয় হয়, সবই পাঠায়া দেই।’
নিজের খরচ চলে কীভাবে, জানতে চাইলে ভিন্ন এক আয়ের কথা জানায় মারুফ। তার ভাষায় এটি হলো ‘গেটের ধান্দা’। বাসের ফটকে যেসব লোক দাঁড়িয়ে যাতায়াত করেন, তাঁদের ভাড়াটা সে পায়। ‘ওস্তাদকে’(বাসচালক) দিতে হয় না। মারুফ জানায়, দিনে ৫০, ৬০; আবার কপাল ভালো থাকলে এভাবে ১০০ টাকাও আয় হয় কোনো কোনো দিন।
‘চলে আরকি’
মারুফের জীবন এখনো শুরুই হয়নি। অথচ ছোট্ট কাঁধেই সংসারের ভার তুলে নিতে হয়েছে তাকে। অন্যদিকে ৬০ পেরোনো জয়নাল আবেদীন দীর্ঘ শ্রমজীবনের শেষ প্রান্তে এসেও থামতে পারছেন না। পেশায় তিনি মিন্তি। জীবনের প্রায় অর্ধেক সময় ধরে কারওয়ান বাজারে মাথায় করে মালামাল বহনের কাজ (মিন্তি) করছেন তিনি।
জয়নাল আবেদীনের সঙ্গে কথা হয় সোমবার বিকেলে। কাঁচাবাজারের সামনে ঝুড়ি হাতে অপেক্ষা করছিলেন কারও ডাক পাওয়ার আশায়। জানালেন, স্ত্রীকে নিয়ে কারওয়ান বাজার রেলগেটের কাছেই থাকেন তিনি। দুই ছেলে থাকলেও তাঁদের সংসার আলাদা। তাই নিজেদের খরচ চালাতে তাঁকেই আয় করতে হয়। জয়নাল আবেদীনের জন্ম ময়মনসিংহে।
জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘দিনে ৪০০-৫০০ টেকার বেশি আয় হয় না। ঘরভাড়াই তো লাগে মাসে ছয় হাজার টেকা।’ সংসার কীভাবে চলছে, জানতে চাইলে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষটি। কিছুক্ষণ থেমে বললেন, ‘কিরম-ইরম চলে আরকি কাকা। যা আয় হয়, খায়ে কিছু থাহে না।’
‘অনেক কষ্টে আছি’
কারও কারও জীবনে অনিশ্চয়তা শুরু হয় শৈশবেই। কারও জীবনে তা থেকে যায় বার্ধক্য পর্যন্ত। আবার কেউ কেউ জীবনের শেষ ভাগে এসে হঠাৎ করেই পড়ে যান অনিশ্চয়তার চক্রে। মুন্সিগঞ্জের আবদুল হালিমের গল্পটা তেমনই।
বছরখানেক আগেও রাজধানীর একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন প্রায় ৬০ বছর বয়সী আবদুল হালিম। তবে হঠাৎ করেই কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে সংসার নিয়ে পড়েন বিপাকে। এখন বাধ্য হয়ে ঘুরে ঘুরে পান-সিগারেট বিক্রি করেন। সোমবার বিকেলে কারওয়ান বাজার এলাকায় কাঁধে ছোট একটি ব্যাগ ঝুলিয়ে পান-সিগারেট বিক্রি করছিলেন তিনি। ঘামে ভেজা মুখ, ক্লান্ত চোখ।
হাঁটতে হাঁটতেই কথা হয় আবদুল হালিমের সঙ্গে। বলেন, ‘পোলাডারে বিদ্যাশে পাঠাইছিলাম দালালের মারফতে। তখন তো বুঝি নাই। পোলা ওইখানে ধরা খাইয়া ছয় মাস জেল খাটছে। ওরে ছাড়াইতে বাড়ি থেইকা টেকা ধার কইরা পাঠাইতে হইছে পাঁচ লাখ। এই অবস্থা পোলার আর আমার গেল চাকরি। মাথার উপরে পাঁচ লাখ টেকা ধার।’
কারওয়ান বাজারেরই একটি ভবনের সিঁড়ির নিচে একা থাকেন আবদুল হালিম। তাঁর ভাষায়, কোনোরকমে রাত কাটানো। তিনি বলেন, ‘অনেক কষ্টতে আছি। দুই-তিন শ টেকা যা আয় হয়, এ–ই দিয়াই চলি। কাজকাম নাই। এই কাজে আর কী হয়?’
রাজধানীর ব্যস্ত এই শহরে প্রতিদিন হাজারো মানুষের ভিড়ে মিশে থাকে মারুফ, জয়নাল আবেদীন কিংবা আবদুল হালিমের মতো মানুষ। জীবনের ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও তাঁদের লড়াই প্রায় একই; টিকে থাকা, কোনোমতে বেঁচে থাকা।