এই সংসদ সদস্য নিজের বিশ্বাস থেকে বলুন বা হাততালি পেতে বলুন—কথাটা খাঁটি। আন্তর্জাতিকভাবে মানবিকতার সব দলিলে দুর্গত আর বিপন্ন মানুষের জন্য সহায়তাকে তাদের অধিকার হিসেবে দেখা হয়েছে।

যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর গণমাধ্যমে সবচেয়ে জনপ্রিয় শিরোনাম হয়ে ওঠে ‘ত্রাণের জন্য হাহাকার’। শিরোনাম না বলে স্লোগান বলাই ভালো। একযোগে প্রায় সবাই লিখতে থাকেন, ‘ত্রাণ নাই,’ ‘ত্রাণ অপ্রতুল’, ‘ত্রাণ পৌঁছায়নি’ ইত্যাদি।

পরিসংখ্যানপ্রীতিতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা আবার মোট বরাদ্দকে দুর্গত এলাকার মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে পিলে চমকানো একটি হিসাব বের করেন। সেই বেহিসাবি হিসাবের ওপর দাঁড়িয়ে বলতে থাকেন, ‘নাহ, ত্রাণ খুবই অকিঞ্চিৎ’। সস্তা আওয়াজ ওঠে, ‘এ ত্রাণ ঝুটা হ্যাঁয়, লাখো ইনসান ভুখা হ্যাঁয়।’ এবার ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়েও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সে রকমই একটি পরিসংখ্যান সামনে আনা হয়েছে। বলা হচ্ছে, মাথাপিছু ত্রাণ নাকি মাত্র ৪৭৫ গ্রাম চাল আর সাড়ে ৯ টাকা বরাদ্দ হয়েছে! এই ‘অদ্ভুতুড়ে’ হিসাবটা এল কোথা থেকে?

কোথা থেকে আসে এসব তথ্য

ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের শুরুতে ত্রাণের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, ঘূর্ণিঝড়ে সম্ভাব্য ঝুঁকির মুখে থাকা উপকূলীয় জেলাগুলোয় আগেভাগেই মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সেই সময় ঝুঁকির মুখে থাকা ১৯ জেলায় ৪৭৫ টন চাল, ৯৫ লাখ টাকা, ১৯ হাজার শুকনো খাবারের প্যাকেট, ৬ হাজার ৪১১ কার্টন ড্রাই কেক (প্রতি কার্টন ১.৫৬ কেজি), ৭ হাজার ৫৭৬ কার্টন বিস্কুট (প্রতি কার্টন ১.৩২ কেজি) বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

মাথার ভেতর পরিসংখ্যান ঘুরপাক খাওয়া সেই ব্যক্তিরা সরকারি এই মানবিক সহায়তা ধরেই হিসাব কষেছেন। তাঁরা বলছেন, আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত ধরা হলে সেই সংখ্যাও ১০ লাখ। সে হিসাবে মাথাপ্রতি বরাদ্দ পড়ে ৪৭৫ গ্রাম চাল আর সাড়ে ৯ টাকা।

এখানে বলতে হয়, ত্রাণের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ঘোষিত ওই ত্রাণ ছিল প্রাথমিক বরাদ্দ। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সংখ্যা, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দুর্গত এলাকায় আরও বরাদ্দ যাচ্ছে এবং যাবে। এসবই ঘটে রাষ্ট্রের ঘোষিত নীতিমালা ও নির্দেশনার আলোকে।

পরিসংখ্যানপ্রীতি থাকা ব্যক্তিদের এ ধরনের প্রচার সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একরকম চাপের মধ্যে ফেলে দেয়। চাপে পড়েছিলেন খোদ মন্ত্রী (বোধ করি, চাপ এখনো জারি আছে)। ঝড়ের ২৪ ঘণ্টা পার হয়েছি কি হয়নি। একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে কথা শিল্পীরা তাঁকে চেপে ধরলেন। তাঁরা মন্ত্রীকে বললেন, ‘এই দেখুন আমাদের মাঠের ক্যামেরা বলছে, মানুষ ত্রাণ পায়নি। আপনি বলেছেন ত্রাণ পাঠিয়েছেন। মাঠে আপনাদের লোক নেই? আপনার কোনো তদারকি নেই? কী করেন তাঁরা? কোথায় থাকেন তাঁরা?’

প্রশ্নকর্তাদের ‘কানেকশন’-এর কথা ভেবেই হোক বা বিতর্ক এড়ানোর জন্যই হোক—মন্ত্রী প্রশ্নকর্তাদের বলে দিলেন, ‘অনুষ্ঠান শেষ করেই আমি জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে আবার কথা বলব, নির্দেশনা দেব।’

প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় কাজের চাপে থাকা মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাঁদের কাজের স্বীকৃতি চান। ‘শাবাশ’ না হোক, হক কথাটা শুনতে চান তাঁরা। অনেক সময় লাগামছাড়া ‘ঋণাত্মক টিপ্পনী’ মাঠের তরুণ কর্মকর্তাদের হতাশ করতে পারে। যেটি করার কাজ নয়, সেটি করে বসার ইন্ধন জোগাতে পারে। বোধ করি, নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় তেমনটিই ঘটেছে। ত্রাণ কার্যক্রমকে দৃশ্যমান করার চাপ অনুভব করেছে দ্বীপের প্রশাসন। হাতিয়ার নলচিরায় সাংবাদিকের ক্যামেরার সামনে প্রথম দফার ত্রাণ বিতরণ শুরু করা হয়।

খবরটি শুনে হাতিয়ার উন্নয়নকর্মী বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল আলমকে ফোন করে জানতে চেয়েছিলাম, ‘আপনি দায়িত্বে থাকলে ত্রাণ কার্যক্রম কোথা থেকে শুরু করতেন?’ এককথায় তিনি জবাব দিলেন, ‘নিঝুম দ্বীপ থেকে।’ এই এলাকাটিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এখানে বলে রাখা ভালো, নলচিরা হাতিয়ার ঘাট এলাকা। যোগাযোগও ভালো। ঢাকা বা অন্য জেলা থেকে যাঁরা হাতিয়া যান, তাঁদের নলচিরাতেই নোঙর করতে হয়। সেখানে সিত্রাংয়ে খুব বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবে প্রচারের জন্য ত্রাণের ‘কাজ শুরু’র মোক্ষম জায়গা। হাতিয়ায় প্রথম দফায় ২৫ টন চাল ও ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অনুপাতে এই বরাদ্দ অনেক কম। সেই বিবেচনায় উত্তরের নলচিরার চেয়ে দক্ষিণের নিঝুম দ্বীপ, দমার চরের কাদাপানিতে আটকে থাকা মানুষ ত্রাণের জন্য অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা।

হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপ বা চর ফ্যাশনের চর নিজাম, ঢাল চর, চর সাকুচির মতো এলাকা ও চরাঞ্চল ৩ নম্বর সংকেত জারির পর থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এসব বেড়িবাঁধহীন এলাকা থেকে মানুষ আর কোথায় সরতে পারে না। নৌযোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কেউ চাইলেও মূল দ্বীপে এসে আশ্রয় নিতে পারে না। এসব নাজুক জায়গায় ২৭ অক্টোবর যেসব সংবাদকর্মী পৌঁছাতে পেরেছেন, তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন।

ঝড়-জলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কষ্ট আর দুর্দশার কথা তুলে এনেছেন। এসব এলাকার মানুষের প্রধান পেশা মাছ ধরা। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কারণে এমনিতেই আগে থেকে তাঁদের রোজগার ছিল না। এত দিন আধপেটা খেয়ে দিন কাটছিল তাঁদের। তারপর ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে ঘরবাড়ি ক্ষতি হয়েছে। কেউ জোয়ারের পানিতে ভেসে যাওয়া ঘরের জিনিস খুঁজে ফিরছেন। কেউ বিধ্বস্ত ঘরের ভিটায় পলিথিন টাঙিয়ে রাত কাটাচ্ছেন। গণমাধ্যমে খবরের শিরোনাম হচ্ছে—‘সরকারি ত্রাণের আশায় অভুক্ত শত শত মানুষ।’

কারা কখন অগ্রাধিকার পাবে

মানবিক সহায়তা বাস্তবায়ন নির্দেশিকা ২০১২-১৩-এ খুব পরিষ্কার করে ছক এঁকে বলে দেওয়া আছে, কে কতটা মানবিক সহায়তা পাবেন। মানবিক সহায়তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, ধরন, সহায়তার ক্ষেত্র, সহায়তা পাওয়ার যোগ্যতা, পরিমাণ—সবকিছুই মেপে দেওয়া হয়েছে এই নির্দেশিকায়। দুস্থ এবং অতিদরিদ্র পরিবার চিহ্নিত করার ১২টি তরিকা উল্লেখ করা আছে।

এর মধ্যে পরস্পর বিরোধী শর্তও আছে। বলা আছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়ে চরম খাদ্য ও অর্থ সংকটে পড়েছে, এমন পরিবার ত্রাণের হকদার হবে। তবে সেই পরিবার যদি ক্ষুদ্রঋণের গ্রাহক হয়, তাহলে তাকে ত্রাণের জন্য বিবেচনায় আনা যাবে না।

সরকারের এই নির্দেশিকা পড়ে মনে প্রশ্ন জাগছে, তবে কি ঢাল চরের যে জেলে অতি ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে মাছ ধরার একটা জাল বানিয়েছিলেন, ঘূর্ণিঝড়ে ভেঙে যাওয়া ঘরটা মেরামতের জন্য বা দুই বেলা খাওয়ার জন্য তিনি কোনো সহায়তা পাবেন না? এমন ঋণ নেওয়া পরিবারের মধ্যে গৃহনির্মাণসামগ্রী বিতরণের ক্ষেত্রেও শর্ত আছে। গত ১০ বছরে একবার এই সহায়তা পেলে তাদের দ্বিতীয়বার আর ঘর ওঠাতে সাহায্য করা যাবে না।

কী আশ্চর্য ব্যাপার! ঘূর্ণিঝড় কি ১০ বছরের নীতি মেনে আঘাত হানে?

এমন জেলে পরিবারের কত বিপদ। মাছ ধরার নিষিদ্ধ মৌসুম থেকে পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বেকার। তাঁর মাথায় ঋণের বোঝা। অথচ সরকারি সহায়তা পাবেন না তিনি। চলবেন কীভাবে?

সরকারি ত্রাণ পেতে গেলে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) একটি অত্যাবশ্যক শর্ত। প্রান্তিক আর দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী সব মানুষের যে এনআইডি নেই, সেটি আন্দাজ করতে আইনস্টাইন হওয়া লাগে না।

আবার এ ধরনের ঘূর্ণিঝড় বা সিলেট টাইপ বন্যায় এনআইডি ভেসে যাওয়ার অনেক নজির আছে। প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের এসব নানা তরিকা আর শর্ত মেনেই তালিকা করতে হয়, ত্রাণের দড়ি খুলতে-বাঁধতে হয়। কাজেই চাইলেই তাঁরা ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই ত্রাণের ডালা খুলে বসতে পারেন না।

তবে অনেক বিলম্বের কারণ নেই

মানবিক সহায়তা বাস্তবায়ন নির্দেশিকায় পরিষ্কার বলা আছে, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার অথবা দুর্যোগ বা দুর্ঘটনায় আহত বা নিহত ব্যক্তির অসচ্ছল পরিবারকে তাৎক্ষণিক কী পরিমাণ নগদ সাহায্য দিতে হবে। চিকিৎসার জন্য আহত ব্যক্তি কত পাবেন, সৎকারের খরচ পরিবার কীভাবে কত পাবে—সবকিছু নির্দেশিকায় বলা আছে। প্রশাসনের লোকজন কি সেটি মানছেন?

ভোলার ধনিয়া ইউনিয়নে ঘূর্ণিঝড়ে ঘরচাপায় নিহত মৃদুল হকের বড় ছেলে মো. মহসিন দুই দিন ধরে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। দাফনের খরচের জন্য দুই দিন ধরে দ্বারে দ্বারে ধরনা দেওয়ার শিকায়েত কেন করবে মানুষ? ঝড়ের দিনে সব মৃত্যু ঝড়ে বা বানে না-ও হতে পারে, সেটি যাচাই করা প্রশাসনের কাছে নস্যি। অথচ সেই কাজটিই সময়মতো হয় না। দুর্গত ব্যক্তি বা পরিবার সময়মতো ন্যূনতম সহায়তা পান না।

ত্রাণ কি শুধু সরকার দেয়

নোয়াখালীর হাতিয়া বা ভোলার মনপুরায় এমন অনেক সচ্ছল ব্যক্তি আছেন, যাঁরা চাইলে দুই বা চার হাজার মানুষকে সাত দিন দুই বেলা পেট ভরে খাওয়াতে পারেন। ১০-২০ হাজার ঘরবাড়ি দুই দিনে খাড়া করে দিতে পারেন। তাঁদের অনেকেই কর অবকাশ ভোগ করেন, সহজ শর্তে ব্যাংক থেকে গরিবের টাকা ঋণ পান। বছর বছর তীর্থে যান। কিন্তু মানুষের পাশে দাঁড়াতে তাঁদের ক্যামেরা লাগে কেন?

তবে গরিব মানুষের সেটা লাগে না। তাঁরা চোখের নিমেষে অসহায় দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে যান। মনপুরা থেকে ক্ষতিগ্রস্ত রাবেয়া জানান, ‘ঘূর্ণিঝড়ে তাঁদের ঘর-গোয়াল সব শেষ। পাশের বাড়ির চাচি তাঁদের এখন নুনভাত খাওয়াচ্ছেন।’ এটিই আমাদের সামাজিক পুঁজি। এই পুঁজি ঢাল চর, নিঝুম দ্বীপ, দমার চর, চর নিজাম, চর সাকুচির মানুষকে বেঁচে থাকার শক্তি জোগায়। সাহস জোগায় বাংলাদেশকে।

গওহার নঈম ওয়ারা

লেখক গবেষক

ই-মেইল: [email protected]